ইসি কি দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিল?

রবিবার, ২২ মার্চ ২০২০


গোটা বিশ্ব করোনার মরণ ছোবলে বিপর্যন্ত। উন্নত দেশগুলো লণ্ডভণ্ড। বাংলাদেশেও আঘাত এসে লেগেছে। স্মরণকালের এই ভয়াবহ ভাইরাস আক্রমণে ইতোমধ্যে বৈশি^ক মহামারি ঘোষণা দিয়েছে বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা। বাংলাদেশের জনগণ করোনার মৃত্যু ভয়ে কাঁপছে। অথচ করোনা নিয়ে অস্থিরতায়ও ভোট করল তিনটি আসনে ইসি। অবশ্যই চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন গতকাল স্থগিত ঘোষণা করেছেন। এছাড়া বগুড়া ও যশোরে দুট আসনে উপনির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। একটা দেশের নির্বাচন কমিশনে বিজ্ঞজন, বুদ্ধিওয়ালা, দায়িত্বশীল দেশপ্রেমিক থাকেন এমনটাই জানতাম। বাংলাদেশের কপাল খারাপ, নাকি বাংলাদেশ পদে পদে ভুল করতেই অভ্যস্ত বুঝতে পারি না। নির্বাচন কমিশনকে কেন দেশ, জাতির স্বার্থ অনুক‚লে রাখার মতো বিচক্ষণ ব্যক্তিদের খুঁজে পাওয়া যায় না, প্রশ্নটা ইতোপূর্বে ক্ষীণ থাকলেও এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। সারা বিশ^ যেখানে করোনা ভাইরাসের জন্য মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে, যেখানে বিশে^র উন্নত দেশগুলো হিমশিম খাচ্ছে প্রতিনিয়ত, যেখানে কোয়ারেন্টাইন, আইসোলেশনের বিষয়গুলো প্রতিটি মুহূর্তে উচ্চারিত হচ্ছে, প্রতিনিয়ত সতর্ক করা হচ্ছে সমবেত না হতে সেখানে ভোট নিয়ে ইসির এমন গোয়ার্তুমি, কাণ্ডজ্ঞানহীন সর্বনাশা অভিব্যক্তি কেন! করোনা মহামারি পর্যায়ে গেলে উপনির্বাচন নিয়ে ইসি ভাবতেন। এটা খুব ভালো বুঝলেন। কিন্তু এটা বুঝলেন না যে, এই ইভিএম পদ্ধতিতে করোনার ঝুঁকি আছে, জনগণের উপস্থিতিতে করোনার ঝুঁকি আছে। এই ঝুঁকিই বাংলাদেশে করোনার মহামারির রূপ নিয়ে আসতে পারে। করোনার মহামারি এখনো দেখছেন না বলে ভোট পেছাবে না ইসি আর এই ভোটের কারণে করোনা ভাইরাস মহামারির রূপ নিলে তার দায় কে নেবে। নিশ্চয়ই ইসিকে নিতে হবে। কোয়ারেন্টাইনে না থাকার দায়ে যদি বিদেশফেরত বাংলাদেশিদের শাস্তি ভোগ ও জরিমানা দিতে হয়, তাহলে জনগণকে ভোটের দোহাইতে করোনা ঝুঁকির দিকে ঠেলে দেয়ার জন্য ইসিরও সর্বোচ্চ শাস্তি পাওয়ার যৌক্তিকতা চলে আসে।

জনবিমুখ ছিল গেল ঢাকা সিটি নির্বাচন। নির্বাচন ও নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতাকেন্দ্রিক আচরণের জন্যই এই নির্বাচন জনবিমুখতা। আস্থা, বিশ্বাস, স্বচ্ছতার বিশ^াস হারিয়ে ফেলছে সাধারণ মানুষ। একদিকে সাধারণ জনগণের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সুশাসনের অভাব, এক শ্রেণি মানুষের আকাশ ছোঁয়া দুর্নীতি, দায়িত্বশীলদের জবাবদিহিতা না থাকা ইত্যাদির কারণে এই আস্থাহীনতা। এর সঙ্গে যুক্ত হতে যাচ্ছে করোনা ভাইরাসের মতো ভয়াবহ প্রাণনাশক ব্যাধির ভয়ের মাঝে ভোট প্রদানে জনগণের অংশগ্রহণে ইসির পাঁয়তারার ফলে সৃষ্ট আর এক নির্মম আস্থাহীনতা। ভোট প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে হয় নির্বাচন কমিশনের ব্যক্তিদের, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের, নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহের জন্য সাংবাদিকদের, প্রার্থীর সমর্থকদের এবং সর্বোপরি ভোটারদের। ভোটার মানে জনগণ। কতগুলো মানুষ ঝুঁকির সম্মুখীন হয়ে গতকাল শেষ করল ঢাকা ও ঢাকার বাহিরে তিনটি উপনির্বাচন। অথচ করোনার ভয়াবহতার হাত থেকে জাতিকে রক্ষা করার জন্য শ্রীলঙ্কার আগামী মাসের নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। শ্রীলঙ্কা নিজেদের রক্ষা করার বিষয়টি সর্বাগ্রে বিবেচনায় এনেছে। একটা দেশের জনগণের সুস্থতা, নিরাপত্তা এবং তাদের অস্তিত্বের ঊর্ধ্বে কোনো কিছু গুরুত্ব পাওয়ার অর্থ দাঁড়ায় স্বার্থান্বেষী মহলের ভিন্ন উদ্দেশ্য হাসিলের পাঁয়তারা এবং অবিবেচকের মতো দেশকে সংকটের দিকে ঠেলে দেয়া। জনগণ যদি মরেই যায় তাহলে জনপ্রতিনিধির অস্তিত্ব থাকারও দরকার পড়ে না। যে জনগণের জন্য জনপ্রতিনিধি হতে চাইছেন যারা, তাদেরও বোধোদয় ঘটা উচিত ছিল এই উপনির্বাচন নিয়ে। নিজ এলাকার জনগণকে নিরাপদ করে রাখার ন্যূনতম দায় দেখাতে পারতেন উপনির্বাচন পেছানোর সুপারিশের মধ্য দিয়ে। কিন্তু এলাকার জনগণকে সুরক্ষিত করার দায় তারা দেখাননি, আমরা দেখিনি। হয়তো প্রার্থীরা আতঙ্কিত ছিলেন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ক্ষমতার পদটি আবার আইসোলেশনে চলে যায় কিনা। সোজাসাপ্টা কথা, রাজনীতিকদের কাছে ক্ষমতার পদটাই মুখ্য, জনগণের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি একেবারেই গৌন। চারপাশে প্রচারিত এত পরিবর্তনের ভেতরেও এই সত্যের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। কখনো ঘটে না।

ভোটগ্রহণের পর ইসি প্রেস কনফারেন্স করে হয়তো বলবেন, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছতার মাধ্যমে স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে ভোটাররা ভোট দিয়েছেন। আরো বলবেন হয়তো, করোনা ভোটকেন্দ্রে এসে আক্রমণ করেনি। বরং কঠোর হস্তে করোনাকে প্রতিহত করা হয়েছে। দক্ষতা ও যোগ্যতা বলে সশস্ত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী করোনাকে প্রতিহত করেছেন। বাজার থেকে উধাও হলেও ভোটকেন্দ্রে হ্যান্ড স্যানিটাইজার, টিস্যু ছিল পর্যাপ্ত। ফলে সবার আশঙ্কা, আতঙ্ককে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে উপনির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। সফলতার সঙ্গে নির্বাচন কমিশন নির্বাচন বাস্তবায়ন করেছেন। এমন আবোলতাবোল, অযৌক্তিক বিবৃতি জনগণ দায়িত্বশীলদের কাছ থেকে প্রায়ই শোনেন। জনগণ অভ্যস্ত শুনতে। কিন্তু বর্তমান সময় ভিন্ন। কথা হলো করোনার ভয়াবহতা নিয়ে। ইসি কি নির্বাচনের দিন দেখতে পেলেন করোনা জনগণকে কতটা ছুঁয়ে গেল। ভোটকেন্দ্রে তো করোনা শনাক্তের কিট নেই যে ভোটারদের নমুনা সংগ্রহ করে তাৎক্ষণিক পরীক্ষার মাধ্যমে তারা বুঝতে সক্ষম হলেন যে করোনামুক্ত ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলো। কেননা করোনা তো খালি চোখে দেখা যায় না। নাকি বাংলাদেশ ইসির সেই দাবিও আছে তারা করোনা ভাইরাসকে খালি চোখে দেখতে পান। সরি, ইসি! একজন অতি সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমরা আপনার বিচক্ষণতা দেখতে চাইতেই পারি।

করোনার ঝুঁকি থেকে জনগণকে নিরাপদ করার জন্য ইসি পারতেন নির্বাচন পিছিয়ে দিতে। এমন সিদ্ধান্ত ঝুঁকি থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রস্তুতিমূলক একটা বড় পদক্ষেপ হতে পারত। আইইডিসিআর উপনির্বাচনের কয়েক ঘণ্টা আগেও বলেছে যে, ইভিএম পদ্ধতিতে করোনার ঝুঁকি আছে। কান দিল না ইসি। তাহলে কী এমন দাবি অযৌক্তিক হবে যে, যেসব এলাকায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো সেসব এলাকায় করোনা আক্রান্তদের জন্য ইসিকেই দায় নিতে হবে? গোটা বিশ^ মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। সময় এসেছে সব ভেদাভেদ ভুলে, রাজনৈতিক দলাদলি বিসর্জন দিয়ে একসঙ্গে কাজ করার। করোনা ভাইরাস কিন্তু কারোর জন্যই নিরাপদ নয়।

স্বপ্না রেজা : কথাসাহিত্যিক ও কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
ড. মো. তাসদিকুর রহমান

আসুন সরকারের নির্দেশনা মানি

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

ব্যক্তিগত আক্রমণ গ্রহণযোগ্য নয়

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ঐক্যের বিকল্প কিছু নেই

বিভুরঞ্জন সরকার

আমরা কথা ও কাজে এক হব কবে?

শরদিন্দু ভট্টাচার্য্য টুটুল

করোনায় গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা

মুহম্মদ জাফর ইকবাল

করোনার জন্য প্রস্তুতি

Bhorerkagoj