করোনায় বিলুপ্তির ঝুঁকিতে বন্যপ্রাণী

শনিবার, ২১ মার্চ ২০২০

কাগজ ডেস্ক : বিজ্ঞানীদের ধারণা, চীনের উহান শহরের সামুদ্রিক খাবারের বাজার থেকেই করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব হয়েছে, যাতে এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বুনো প্রাণীর অবৈধ কেনাবেচার জন্যও ওই বাজারের পরিচিতি রয়েছে, যেখানে সাপ, র?্যাকুন (উত্তর আমেরিকার একটি প্রাণী), বা সজারুর মতো প্রাণী খাঁচায় রেখে খাবার অথবা ওষুধ হিসাবে বিক্রি করা হতো। তবে পুরো প্রদেশটি কোয়ারেন্টিন করে ফেলার পর সেই বাজার বন্ধ হয়ে যায়। বিশ্বের মধ্যে চীনেই সবরকম বৈধ ও অবৈধ বুনো প্রাণীর সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে।

সাময়িক নিষেধাজ্ঞা : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, করোনা ভাইরাসের প্রাথমিক উৎস বাদুড় থেকে হয়েছে বলে তারা ধারণা করছেন। কিন্তু তাদের ধারণা, ভাইরাসটি অন্য আরেকটি প্রাণীর শরীরে প্রথমে স্থানান্তরিত হয়েছে, যদিও সেই প্রাণীটি এখনো শনাক্ত করা যায়নি। তারপরে সেটি মানুষের শরীরে এসেছে। ঐতিহ্যগতভাবে বুনো পণ্যের বিশাল চাহিদা রয়েছে চীনে। কিছু প্রাণী খাওয়া হয় সেগুলো সুস্বাদু বলে, আবার কিছু প্রাণী খাওয়া হয় সেগুলোর প্রাচীন ঔষধি গুণ রয়েছে বিবেচনা করে। চীনের অনেক প্রদেশের রেস্তোরাঁয় বাদুড়ের সুপ (যেখানে পুরো একটি বাদুড় দেয়া হয়), বাঘের অণ্ডকোষ দিয়ে অথবা গন্ধগোকুলের (পাম সিভেট) শরীরের অংশ দিয়ে তৈরি করা সুপ বিক্রি করা হয়। অনেক রেস্তোরাঁয় খাদ্য তালিকায় গোখরা সাপের ভাজা, অল্প আঁচে রান্না করা ভালুকের পা, বাঘের মেরুদণ্ড দিয়ে তৈরি করা ওয়াইনও থাকে। অনেক নীরব এলাকার বুনোপ্রাণীর বাজারে ইঁদুর, বিড়াল, সাপ এবং পাখির অনেক প্রজাতি বিক্রি হয়, যার মধ্যে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা অনেক প্রাণীও রয়েছে।

‘দ্য নোশন অফ ইয়েওয়ি’ (চীনা ভাষায় যার অর্থ বুনো স্বাদ) হচ্ছে চীন জুড়ে প্রচলিত একটি পারিবারিক পরিভাষা, যার মধ্যে সংস্কৃতিগতভাবে দুঃসাহসিক কাজ, সাহস, কৌতূহল ইত্যাদির মিশ্রণ রয়েছে,- বলে মন্তব্য করেছেন চীনে বুনো প্রাণীর বাণিজ্য নিয়ে অনুসন্ধানকারী আন্তর্জাতিক একটি সংস্থার একজন কর্মকর্তা। চীনের অনেক ঐতিহ্যগত ওষুধের প্রাথমিক উপকরণ হিসাবে বন্যপ্রাণী পণ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয় এই বিশ্বাসে যে, এর মধ্যে পুরুষত্বহীনতা, বাত এবং গেঁটেবাতের মতো বিভিন্ন রোগ নিরাময়ের ক্ষমতা রয়েছে।

বিলুপ্তির হুমকি : প্যাঙ্গোলিনের (এক ধরনের স্তন্যপায়ী প্রাণী, যার শরীর খোলসে ঢাকা থাকে) অসম্ভব চাহিদার কারণে এর মধ্যেই এই প্রাণীটি চীন থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বিশ্বের অন্যান্য অংশেও এই প্রাণীটি এখন সবচেয়ে বেশি পাচার হওয়া বুনো প্রাণী। চীনের ঐতিহ্যগত ওষুধে গণ্ডারের শিংয়ের ব্যাপক ব্যবহার আরেকটি উদাহরণ, যার ফলে এই প্রজাতিও এখন বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে। এসব কিছুই এমন সময়ে ঘটছে যখন ধারণা করা হচ্ছে যে, মানব শরীরে সংক্রমণের ৭০ শতাংশই আসছে প্রাণী থেকে, বিশেষ করে বন্যপ্রাণী থেকে। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ফলে চীনের বন্যপ্রাণী বাণিজ্যের ওপর নতুন করে সবার চোখ পড়েছে, যার বিরুদ্ধে বিশ্বের সংরক্ষণ গ্রুপগুলো দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনা করে আসছে, কারণ এর ফলে অনেক প্রাণীর প্রজাতি হুমকির মুখে পড়েছে। সর্বশেষ প্রাদুর্ভাবের ফলে চীনের কর্তৃপক্ষ বন্যপ্রাণী বাণিজ্যের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, যাতে ভাইরাসটি আর ছড়িয়ে না পড়ে। তবে সংরক্ষণবাদীরা এই সুযোগ ব্যবহার করে স্থায়ী একটি নিষেধাজ্ঞার দাবি জানিয়েছেন।

চীন কী শুনবে : করোনা ভাইরাসের এই প্রাদুর্ভাবের ফলে অবৈধ বন্যপ্রাণীর বাণিজ্য বন্ধ আর জনস্বাস্থ্য রক্ষার প্রয়াসে ভূমিকা রাখতে পারে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা চ্যালেঞ্জিং, কিন্তু একেবারে অসম্ভব নয়। সার্স ও মার্স ভাইরাসও বাদুড় থেকে সংক্রমিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, সেগুলো মানব শরীরে এসেছিল ক্যাভেট ক্যাট আর উটের মাধ্যমে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা বিভাগের ডক্টর বেন এমবারেক বলছেন, বন্যপ্রাণীর অনেক প্রজাতি এবং তাদের আবাসস্থলের খুব কাছাকাছি চলে আসছি আমরা, যা আগে কখনো আসিনি। এ কারণে আমাদের অনেকগুলো নতুন ধরণের রোগ দেখা যাচ্ছে, যার অনেকগুলোয় এমন সব ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া এবং পরজীবীর সংস্পর্শে হচ্ছে, যা আগে কখনো হয়নি। সা¤প্রতিক একটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পাঁচ হাজারের বেশি প্রজাতির স্তন্যপায়ী, পাখি, সরীসৃপ এবং উভচর প্রজাতির প্রাণী বিশ্ব বাজারে বৈধ বা অবৈধভাবে কেনাবেচা হচ্ছে। বিশ্বে অবৈধ বুনো প্রাণীর বাজার প্রায় দুই হাজার কোটি ডলারের। মাদক ব্যবসা, মানব পাচার আর জাল ব্যবসার পরেই এই বন্যপ্রাণীর ব্যবসার অবস্থান।

সতর্কতার আহ্বান : ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার (ডব্লিউডব্লিউএফ) একটি বিবৃতিতে বলেছে যে, এই স্বাস্থ্য সংকটের বিষয়টিকে বিলুপ্তপ্রায় পশু ও তাদের শরীরের অংশের অবিরাম ব্যবহার বন্ধের একটি সতর্কবার্তা হিসাবে দেখতে হবে, যাতে এগুলো খাবার বা ওষুধ হিসেবে আর ব্যবহার করা না হয়। তবে চীনের সরকার পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, এই নিষেধাজ্ঞাটি সাময়িক। জাতীয় প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি শেষ হয়েছে, এরকম ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত বন্যপ্রাণী সংগ্রহে রাখা, বহন বা বিক্রি করা নিষিদ্ধ থাকবে। চীনের সরকারি ঘোষণায় বলা হয়েছে। ২০০২ সালে সার্স ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার পর একই রকম ঘোষণা দিয়েছিল বেইজিং। তবে চীনের সংরক্ষণবাদীরা বলছেন, সেবার ওই ঘোষণার কয়েক মাস পরে কর্তৃপক্ষ শিথিলতা দেখাতে শুরু করে এবং চীনে বন্যপ্রাণীর বাজার আবার চালু হয়ে যায়।

যাচাই-বাছাইয়ে কড়াকড়ি : গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে প্রাকৃতিক ও জৈব সম্পদ নিয়ে একটি বৈশ্বিক সভার আয়োজন করেছিল বেইজিং, যেটি কনভেনশন অন বায়োলজিক্যাল ডাইভারসিটি নামে পরিচিত। আন্তঃসরকার প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে দশ লাখ প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে- যা মানব জাতির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের পরে চীনের অনিয়ন্ত্রিত বন্যপ্রাণীর বাজারের বিষয়টি অস্বীকার করা হয় চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলোয়। ‘এই সুযোগটিকে আমরা বন্যপ্রাণী রাখা, প্রজনন বা ব্যবহার বন্ধে একটি স্থায়ী পদক্ষেপ হিসাবে দেখতে চাই, যাতে এগুলো খাবার বা ওষুধ হিসেবে আর ব্যবহার করা না হয়,’- বলছেন ডেবি ব্যাঙ্কস, লন্ডন ভিত্তিক একটি পরিবেশ তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তা, যিনি চীনের বন্যপ্রাণীর ব্যবহার নিয়ে বড় ধরনের অনুসন্ধান চালিয়েছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যাভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড ফ্লুর মতো রোগের প্রাদুর্ভাবে বিশ্বজুড়ে পাখির অনেক প্রজাতি রক্ষা পেয়েছিল। চীনে হাতির দাঁতের আমদানি নিষিদ্ধ হওয়ার পর বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা হাতিও রক্ষা পেয়েছে। তবে তারা এটাও গুরুত্ব দিয়ে বলছেন, বন্যপ্রাণীর ব্যবহার বন্ধের পদক্ষেপ সারা বিশ্বজুড়েই নিতে হবে শুধু চীন নিলেই হবে না। কিন্তু চীনে যেহেতু বন্যপ্রাণীর সবচেয়ে বড় বাজার রয়েছে, সে কারণে তারা এ ক্ষেত্রে অগ্রগামী ভূমিকা রাখতে পারে।

দূরের জানালা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj