‘আমার প্রতিটা চরিত্র সামাজিক তাড়না এবং দায়বদ্ধতারই ফল’

শনিবার, ২১ মার্চ ২০২০

টলিউডের একজন অন্যতম শক্তিমান অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষ। সম্প্রতি তিনি হইচই-এর ‘রহস্য রোমাঞ্চ ২’ সিরিজে অভিনয় করে সাড়া ফেলেছেন। এছাড়াও ‘চ্যাপলিন’, ‘ভিঞ্চি দা’সহ বেশ কয়েকটি সিনেমায় তার অনবদ্য অভিনয় তাকে জায়গা করে দিয়েছে দর্শক হৃদয়ে। কলকাতা থেকে হোয়াটস অ্যাপে মেলার সঙ্গে কথা হয় রুদ্রনীলের। কথা বলেছেন শাকিল মাহমুদ

সম্প্রতি ‘রক্ত রহস্য সিরিজ ২’তে অভিনয় করেছেন। গল্পটি পছন্দ করার ক্ষেত্রে কোন বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছেন?

একটি বাড়ি বানানোর আগে জমি ঠিকঠাক আছে কিনা সেটা দেখে নেয়া হয়। এখন জমি যদি ঠিক না হয়, তুমি যত বড়ই বিল্ডিং তোলো না কেন- একদিন সমস্যা হবেই। আমি সব সময় গল্পের পটভূমিটা আগে গুরুত্ব দিয়ে দেখি। তারপর সে পটভূমিতে কেমন চরিত্র উপযোগী এবং দর্শক নতুন কিছুর স্বাদ পাবে কিনা সেটা বের করি। তবে দর্শক যেহেতু মুখ্য চরিত্রকে ধরেই পটভূমিতে ভ্রমণ করে, তাই আমি গল্প এবং চরিত্র দুটোকেই গুরুত্ব দেই। এক্ষেত্রেও আমি সেটাই করেছি।

‘ভিঞ্চি দা’ সিনেমার গল্পটি একজন মেকআপ আর্টিস্টকে নিয়ে লিখেছেন। কোন বিষয়টি মাথায় রেখে গল্পটি লেখা?

টলিউডে ‘প্রস্থেটিক’ মেকআপ করার জন্য লাখ লাখ টাকা খরচ করে বলিউড থেকে মেকআপ আর্টিস্ট আনা হতো। অথচ আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতেই সোমনাথ কুণ্ডু নামের একজন মেকআপ আর্টিস্ট বেশ ভালো ‘প্রস্থেটিক’ মেকআপ করতে পারে এবং বলিউডের চেয়েও অনেক কম খরচে। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রিতে এটা কেউ বিশ্বাস করত না। তো একবার সে আমার বডিতে একজন ব্লুাস্ট হয়ে যাওয়া মানুষের ‘প্রস্থেটিক’ মেকআপ করে। কিন্তু সেন্সর বোর্ডের সেন্সেটিভ বিষয়ে কড়াকড়ি মনোভাবের জন্য পরিচালক সেদিন সে দৃশ্যটি লং শটে নেয়। যেখানে ঠিকঠাক কিছু দেখা যাচ্ছিল না। পরে যখন সোমনাথ কুণ্ডু আমার মেকআপ তুলছিল তখন তার চোখে আমি জল দেখতে পাই। এই যে একজন মেকআপ আর্টিস্ট সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে একটি রিয়েলিস্টিক মেকআপ করল এবং তার ঠিকঠাক মূল্যায়ন হলো না- তার ফলে চোখে জল। এই যে একজন শিল্পীর শিল্পকে ফুটিয়ে না তোলার কষ্ট, কান্না এটা যদি কোনো দুষ্টু লোক ভুল কাজে ব্যবহার করে! তাহলে কী ঘটতে পারে? এমন একটি ধারণা থেকে গল্পটি লেখা।

আপনি যে চরিত্রগুলো প্লে করেন তার মধ্যে সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকে বলেই কী চরিত্রগুলো বেছে নেয়া?

এক প্রকার তেমনই বলতে পারো। আমি একজন অভিনেতা। আমার কাজ মানুষকে বিনোদন দেয়া। কিন্তু যে গল্প মানুষের ভেতর কুসংস্কার তৈরি করে, অন্ধত্ব তৈরি করে- আমি সে কাজ করতে চাই না। যেমন ধরো, চ্যাপলিন। একটা মানুষ চ্যাপলিন সেজে খেলা দেখায়। অত্যন্ত কম টাকায় এরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে। আদতে এরা খেতে পায় কি পায় না তা কেউ খবর রাখে না। ‘চ্যাপলিন’ সিনেমায় পদ্মনাভ দাস গুপ্ত একজন শিল্পী জীবনের যন্ত্রণাকে দেখিয়েছেন। আবার তুমি যদি ‘রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজ’ দেখো, সেখানেও সমাজের রিফ্ল্যাকশন পাবে। সিরিজটির ‘ঝন্টু দা’, যাকে বাইরে থেকে দেখে বুঝার উপায় নেই আসলে মানুষটি কেমন! এমন অনেক চরিত্র আমাদের সমাজে আমাদেরই চোখের সামনে ঘুরছে। সুতরাং আমার ‘চ্যাপলিন’ থেকে ‘রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজ’ অবধি কাজগুলো সামাজিক তাড়না এবং দায়বদ্ধতারই ফল বলতে পারো।

তরুণ প্রজন্মের প্রতি আপনার কোনো

পরামর্শ আছে?

পরিশ্রম ছাড়া কেউ বড় হতে পারে না। যেমন ধরো, আমি একটি স্টার পরিবার থেকে আসার ফলে সুযোগ পেয়ে গেলাম। কিন্তু আমাকে টিকে থাকতে হবে আমার পারফরমেন্স দিয়ে। সুতরাং আমাকে টিকে থাকতে হলে আমার পারফরমেন্সকে দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে হবে, আমার চরিত্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে হবে। আর তার জন্য আমাকে পরিশ্রম করতে হবে। স্ট্রাগলে অনেক কষ্ট। আমার কথাই যদি বলি, আমি আর রাজ চক্রবর্তী- আমরা এক বাড়িতে থাকতাম। আমাদের ভাত খাওয়ার জন্য একটি থালা ছিল। যার একপাশে আমি অন্য পাশে রাজ বসে খেতাম। কিন্তু আজ আমরা একটা ভালো অবস্থানে আছি। সেটা সম্ভব হয়েছে কিন্তু পরিশ্রমের কারণে। দোকানে টাকা দিমু আর খাবার খামু, পেট ভরে যাবে!’ ক্যারিয়ার কিন্তু সেটা নয়।

সিনেমা পরিচালনায় আসবেন কবে?

আমার পরিচালক বন্ধুদের কাছ থেকে শিখছি। যখন এই শেখাটার ওপর আমার ভরসা তৈরি হবে তখনই সিনেমা পরিচালনা করবো। সম্ভবত সেটা আগামী এক বছরের মধ্যে হতে পারে।

বাংলাদেশের কোন কোন সিনেমা দেখা হয়েছে এবং কোন কোন অভিনেতাদের অভিনয় আপনার পছন্দ?

বাংলাদেশের সব সিনেমা না দেখতে পারলেও বেশ কিছু সিনেমা দেখেছি। যেমন ‘মাটির ময়না’, ‘আয়নাবাজি’, ‘ঢাকা অ্যাটাক’। এ সিনেমাগুলো ভালোভাবে মনে থাকবে। আমার মোশাররফ করিম, চঞ্চল চৌধুরী, আরফান নিশো, নুসরাত ইমরোজ তিশার অভিনয় ভালো লাগে। মোশাররফ ভাই, চঞ্চল ভাইয়ের সঙ্গে আমার স্ক্রিন শেয়ার করার খুব ইচ্ছে রয়েছে। আরফান নিশোর সঙ্গেও কাজ করার ইচ্ছে আছে। ছেলেটা খুব সাবলীল অভিনয় করে। এছাড়াও জয়া, নুসরাত ফারিয়া- এদের অভিনয়ও ভালো লাগে।

বাংলাদেশের সিনেমায় অভিনয়ের ক্ষেত্রে কোন বিষয়কে গুরুত্ব দেবেন?

দেখো, আমার কাছে গল্পটা হচ্ছে বাস আর বাসের ব্রেক যদি খারাপ হয় তার ড্রাইভার যত দারুণ ড্রাইভ করুক না কেন এক্সিডেন্ট হবেই। আবার বাস খুব ভালো সার্ভিস দিচ্ছে কিন্তু ড্রাইভার খুব একটা স্পেশালিস্ট নয়। সেক্ষেত্রেও এক্সিডেন্ট ঘটতে পারে। তবে পরিচালক যখন আমাকে তার গল্পটা শুনিয়ে সিনেমাটাকে আমার সামনে ভিজ্যুয়ালাইজেশন করতে পারবে তখন আমি বুঝব পরিচালক তার সিনেমা দর্শককে বুঝাতে পারবে। তখন আমার চিন্তাটা কমবে। সুতরাং কোনো পরিচালক যদি আগে ভালো কাজ করে এবং সেটার খোঁজ পাই তাহলে আমি কাজ করতে রাজি হবো। তবে গল্পের ক্ষেত্রে একটু সিরিয়াস গল্প হয়ে গেলে বেশি পছন্দ করব। বাংলাদেশের ভালো অভিনেতা, পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করার ১০০ শতাংশ ইচ্ছে তোমার মাধ্যমে জানালাম।

মেলা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj