বধূ মিছে মান ‘করো না’

শনিবার, ২১ মার্চ ২০২০


করোনা ভাইরাস নিয়ে বিশ্ব এখন করোনাময়! অন্য সব সংবাদ গৌণ হয়ে গেছে। ভালো সংবাদ হচ্ছে, চীন আরোগ্যের পথে। ইরানের অবস্থা এখনো খারাপ। ইতালি প্রথমে অবহেলা করেছিল, এখন লাগাম টেনে ধরতে চাইছে, মানুষ মরছে, আরো একটু সময় হয়তো লাগবে। ইউরোপে নতুন নতুন এলাকা আক্রান্ত হচ্ছে। ট্রাম্প কোভিড-১৯ পরীক্ষা করিয়েছেন। নেগেটিভ। কানাডায় প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর বৌ কোরোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। রবিবার আমেরিকায় প্রার্থনা দিবস পালিত হয়েছে। আল-আরাবিয়া সূত্র জানাচ্ছে, কুয়েতে দুই সপ্তাহ ছুটি ঘোষণা হয়েছে, আজান সামান্য পরিবর্তিত হয়েছে। বলা হচ্ছে, মসজিদে আজান হবে, নামাজ পড়তে হবে বাসায়। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী পরামর্শ দিয়েছেন, মসজিদে কম যেতে! মন্দির-মসজিদে ভিড় কমেছে। হাসপাতালে ভিড় বেড়েছে।

করোনা মানুষকে ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছে। মানুষ ঘরে বসে বসে গান শুনছে, ‘বধূ মিছে মান করো না…’। অথবা ‘অভিমান করো না, তুমি কিছু বুঝো না…’। ভাবছিলাম, চীনের সেই ডাক্তার যদি ‘করোনা ভাইরাসের’ সংবাদ না ছড়াতেন, তাহলে কী হতো? তবে করোনার টেনশনে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মানচিত্র পাল্টে যেতে পারে। মিডিয়া বড়সড় অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা ব্যক্ত করছে। নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জে ধস নেমেছে। প্রশাসন স্টক মার্কেটে দেড় ট্রিলিয়ন ডলার ইনজেক্ট করেছে। আরো ৭শ বিলিয়ন করবে বলে শোনা যাচ্ছে! ইন্টারেস্ট রেট কমিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় টুইট করেছে, ‘মার্কিন সেনা হুয়ান প্রদেশে এই ভাইরাস এনেছে’। ওয়াশিংটনে চীনা রাষ্ট্রদূতকে ডেকে আমেরিকা বাঁশ দিয়েছে। করোনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক অবনতির সম্ভাবনা আছে। যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপ থেকে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করলে ইইউ অসন্তোষ প্রকাশ করেছে।

করোনা নিয়ন্ত্রণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির যৌথভাবে কাজ করার আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন দুই প্রতিবেশী বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ইমরান খান। সার্কভুক্ত দেশগুলোতে একসঙ্গে কাজ করার জন্য মোদি ভিডিও কনফারেন্সে আহ্বান জানিয়েছেন। যৌথ তহবিল গঠনের প্রস্তাব এসেছে। করোনা নিয়ে গুজব অনেক। মানুষ না জেনেশুনে গুজব ছড়াচ্ছেন। কেউ গোমূত্র পান করছেন। কেউ দোয়া পড়ছেন, আবোলতাবোল বকছেন। গুগুলে টাইপ করুন, ‘বাংলা ওয়াজ অন করোনা’। দেখবেন বিশ্বের সাইন্টিস্টরা হুজুরদের কাছে নস্যি! তবে এটা সত্য, করোনা ভাইরাস থেকে মুক্তির জন্য বিশ্ব বিজ্ঞানের দিকে তাকিয়ে? যদিও বলা হয়, ‘গুজবে কান দেবেন না’, মানুষ তবু কান দেয় এবং সেইমতো লাফায়। নিউইয়র্কের গ্রোসারিগুলো ফাঁকা হয়ে গেছে। মানুষ চাল-ডাল কিনে মজুত করেছে। ক্লিনিং জিনিসপত্র হাওয়া। টিস্যু শেষ। এই তালিকা বেশ বড়? কিন্তু কেন? ওই যে গুজব! যোগাযোগ বিঘ্ন হচ্ছে, এতে কিছু জিনিসপত্র সাপ্লাই কম হতে পারে, এজন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ার কোনো কারণ নেই? বাঙালি ‘ঘর পোড়া গরু, সিঁদুরের মেঘে ভয় পায়!’ অন্যরা কি ভয় পাচ্ছে না? কিছুটা তো পাচ্ছেন!

গিন্নিরা আজকাল খুশি, কারণ স্বামীরা করোনার ভয়ে বাইরে যাচ্ছেন না। আমাদের ঘরে চাল বাড়ন্ত। গিন্নিকে বললাম, ডোন্ট ওরি, চাল না থাকে পিৎজা খাব, নইলে মেক্সিকান। নিদেন পক্ষে চাইনিজ। চাইনিজ দোকানে সবকিছু পাওয়া যাচ্ছে, কারণ অযথা মানুষ এদের এড়িয়ে যাচ্ছে। করোনার কারণে ছোট-বড় ব্যবসা হোঁচট খাবে, চাইনিজরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে বেশি। তবে ক্লিনিং, গ্রোসারি, ফার্মেসি ব্যবসা রমরমা। এজন্য হয়তো বলে, ‘কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ’। আজ একটু আগে আমি বাসার পাশে একটি কোরিয়ান গ্রোসারিতে ঢুকলাম। জিনিসপত্র ঠাসা। ভিড় নরমাল। সবজি, ফল নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। গিন্নিকে বললাম, বাংলাদেশি চাল না পেলেও কোরিয়ান চালের কোনো অভাব নেই? টিভিতে দেখলাম, নিউজ কাস্টার বলেছেন, জিনিসপত্র সরবরাহ ঠিকই আছে, মজুত করার কিছু নেই? করোনা শুরু হলে এক হুজুর বলেছিলেন, ‘চীনের প্রতি ওটা আল্লাহর গজব’? শোনা যায়, তিনি নিজেও ওই গজবে আক্রান্ত। করোনা চীন ছেড়ে ইরানে পৌঁছলে, অনেকে ঠাণ্ডা হন! কারণ করোনা আগাগোড়া ধর্মনিরপেক্ষ! কিছু মানুষ খুশি যে, করোনার কারণে অনেকে হ্যান্ডশেক বাদ দিয়ে নমস্কারের ভঙ্গিতে অভিবাদন করছেন। এতে খুশি হওয়ার তেমন কারণ নেই! অভিবাদন তো কনুইয়ে কনুইয়ে হচ্ছে, তাতে কী? দেশে দেশে অভিবাদনের নিয়মও ভিন্ন। তবে উন্মাদ ইব্রাহীম খলিলের ‘স্বপ্নলোকের করোনা’ রোজগারের ধান্ধা মাত্র, তাকে আটক করা উচিত। গোমূত্র খেয়ে রামদেব বাবার হাসপাতালে ভর্তির খবর ভুয়া! বাংলাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। নিউইয়র্ক সিটিতে স্কুল বন্ধ। সুখের কথা, করোনা ভাইরাস বাচ্চারদের আক্রমণ করছে না। মার্কিন সিডিসি (সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল) দুই মাসের জন্যে ৫০ জনের বেশি জমায়েতের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাচ্ছে।

জনবহুল বলে অনেকে সঙ্গত কারণে বাংলাদেশ-ভারত নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে বলছেন, একবার সংক্রমিত হলে কী অবস্থা হবে? ধারণা করি, এ আশঙ্কা অমূলক। উভয় সরকার সচেতন। মানুষ সতর্ক। উষ্ণ আবহাওয়া সহায়ক হতেও পারে। দুঃখজনক হলেও সত্য, চীনাদের যাতায়াত যেখানে বেশি, সেই জায়গায় করোনা ছড়িয়েছে বেশি। গত বছর এই সময়টায় আমরা দুই সপ্তাহ ইতালির বড় বড় শহরগুলোতে ছিলাম। হোটেলগুলো ছিল চীনা ভর্তি। ইতালি, দক্ষিণ কোরিয়া, ইরান ও জাপানে চীনাদের অবাধ গতিবিধি ওইসব দেশে করোনা বিস্তার করেছে। চীনাদের দোষ দিচ্ছি না, যেহেতু করোনার উৎপত্তি চীনে, তাই চীনাদের যাতায়াত যেখানে বেশি, সেখানে এটি ছড়াবার সম্ভাবনা বেশি থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। বিশ্বব্যাপী ভ্রমণ নিয়ন্ত্রণে করোনার বিস্তার কমতে সহায়তা করবে। আমরা একসময় শুনেছি, ‘চীনের চেয়ারম্যান, আমাদের চেয়ারম্যান’, করোনার প্রাদুর্ভাবের পর তারা কী এখন বলবেন, ‘চীনের ভাইরাস, আমাদের ভাইরাস’?

বাংলাদেশ সরকার সম্ভব হলে প্রবাসীদের এ মুহূর্তে দেশে না যেতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। তারপরও অনেকে গেছেন বা যেতে হয়েছে। সরকার এদের কোয়ারেন্টাইনে রেখেছে। অভিযোগ আছে, ইতালি থেকে যারা ফিরেছেন তাদের প্রতি দুর্ব্যবহার করা হয়েছে, এটি দুঃখজনক। প্রবাসীরা যে আচরণ করেছেন সেটাও কাম্য নয়। দীর্ঘকাল প্রবাসী এবং বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আব্দুল মোমেনের বক্তব্য- ‘প্রবাসীরা দেশে এলে নবাবজাদা হয়ে যান’ অশোভনীয়। সবকিছুতেই আমরা লাগামহীন, এটি ঠিক নয়! তবে ভারতের এক নেতার বক্তব্য, তেত্রিশ কোটি দেবতা থাকতে করোনা কিছুই করতে পারবে না, আহাম্মকি! মোদ্দা কথা হচ্ছে, করোনা ভাইরাস নিয়ে সচেতন থাকতে হবে, আতঙ্কের কোনো কারণ নেই? অসুস্থ বোধ করলে ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হবে। সামাজিক মাধ্যমে অনেক কিছু শোনা যাচ্ছে। এসব দেখে ঘাবড়ানোর কোনো কারণ নেই। স্বাস্থ্য দপ্তরের নির্দেশ ফলো করা উচিত। মার্কিন সর্বস্তরের প্রশাসন সর্বক্ষণ মানুষকে সর্বশেষ অবস্থা জানাতে সচেষ্ট আছেন। সুতরাং আমাদের জন্য চিন্তার কারণ নেই। আপনারা ভালো থাকুন।

শিতাংশু গুহ : কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
আ ব ম খোরশিদ আলম খান

ঘরে বসে তারাবিহ্র নামাজ পড়ুন

ড. এম জি. নিয়োগী

ধান ব্যাংক

মযহারুল ইসলাম বাবলা

করোনার নির্মমতার ভেতর-বাহির

অধ্যাপক ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী

শিক্ষা খাতে প্রণোদনা প্যাকেজ প্রয়োজন

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

করোনা যুদ্ধে জয়ী হওয়া

অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী

করোনা ভাইরাস এবং আমাদের যতœ

Bhorerkagoj