জালাল উদ্দীন মাহমুদের বই : রঙে ভরা আমার ব্যাংকিং জীবন

শুক্রবার, ২০ মার্চ ২০২০

অনেকদিন পর এক বসায় তিনটি বই পড়লাম। বইগুলো হলো- ‘রঙে ভরা আমার ব্যাংকিং জীবন’- লেখক : জালাল উদ্দীন মাহমুদ, এ সময়ের কবি ও কথাশিল্পী মাসরুর আরেফিনের ‘আলথুসার’ ও শায়রা আফ্রিদা ঐশীর কবিতার বই ‘অল দ্য কোয়েট প্লেস’। কিন্তু আমাকে আগে লিখতে হচ্ছে জালাল উদ্দীন মাহমুদের রঙে ভরা আমার ব্যাংকিং জীবন নিয়ে। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম এটা ব্যাংকিং জগতের একটা কঠিন বই। কিন্তু পড়তে গিয়ে দেখলাম- না, এটা কোনো কঠিন বই না। উপন্যাস বা আরব্য রজনীর মতো একটা মজার বই। একটার পর একটা কাহিনী আমাকে সামনে নিয়ে যাচ্ছে। ক্যাশ ফেলে ক্যাশিয়ারের দৌড়, তামিল ভাষা শেখার অদ্ভুত আসর, ঘুম নিয়ে গবেষণা, মাড়োয়ারিদের নিয়ে একটি সাধারণ আলোচনা ও তিনটি কৌতুক- আপনাকে শুধু সামনের দিকেই নিয়ে যাবে। আপনি বুঝতেই পারবেন না, ব্যাংকিং জগৎ নিয়ে একটা কঠিন বই পড়ছেন আপনি। তবে এ কথা সত্য, ব্যাংকারদের পড়ার জন্য সিলেবাসভিত্তিক কোনো পাঠ্যপুস্তক নয় এটা। যারা গভীর তত্ত্বে প্রত্যাশা করেন তারা এখানে তেমন কিছু পাবেন না। লেখক ইচ্ছে করলে তত্ত্বের কথা আনতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেনি। দ্বৈত মতবাদে বিশ্বাসী হয়েই তিনি বইটি লিখেছেন বলে আমার বিশ্বাস। তিনি তার ব্যাংকিং জীবনের মজার মজার ঘটনাগুলোই এখানে বর্ণনা করেছেন। আমানত সংগ্রহ, ঋণ আদায়, কঠোর পরিশ্রম- এসব প্রতিটি ব্যাংকারই করে থাকেন। আমাদের আজকের লেখকও জীবনে খুব কঠোর পরিশ্রমী, মেধা ও স্মৃতিসম্পন্ন মানুষ ছিলেন। বইটির পরতে পরতে তারই প্রমাণ পাওয়া যায়। বইটি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমি বইটিতে এ পর্যন্ত চাকরির প্রথম কয়েক বছরের কথা বর্ণনা করেছি। অর্থাৎ বর্তমান পরিপক্ব মস্তিষ্ক দিয়ে চিন্তা না করে সে সময়ের তরুণ মন দিয়ে ঘটনাগুলো যেমনভাবে হৃদয়ঙ্গম করেছি তাই তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। আমি সারাজীবন কর্তৃত্বমূলক ব্যবস্থাপনার পরিবর্তে অংশীদারিত্বমূলক ব্যবস্থাপনা পছন্দ করেছি। আমি দেখেছি এতে সবাই শতভাগ সন্তুষ্ট থেকে পরিশ্রম করে যায়। তবে প্রশাসকের নামে দুর্বল ব্যবস্থাপনার বদনামও ওঠে। আমার লেখায় আমার বাস্তব জীবনের প্রতিফলন ঘটাই স্বাভাবিক। কেউ যেন তার নিতান্ত ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে এমন চিন্তা না করেন, তখনকার আমার এসব কাজ ভুল ছিল। শুদ্ধ হোক, ভুল হোক যা করেছি- তার আলোকেই লিখতে চেয়েছি। আমি কখনই ভাবি না এ বই শুধু ব্যাংকাররা পড়বেন। তাই একজন নন- ব্যাংকারও যেন বইটি বুঝতে পারেন সেজন্য ব্যাংকিং পদ্ধতি হালকাভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি। … চুপিচুপি বলি আমি একটা পাঠকশ্রেণি গড়ে তুলতে চাচ্ছি, যারা অবসরের এ সময় শুধু টিভির হিন্দি সিরিয়াল না দেখে বা ফেসবুকে অযথা সময় নষ্ট না করে কিছু ভালো কাজ করবে। পড়বে। আমি বিশ্বাস করি রঙে ভরা আমার ব্যাংকিং জীবন পড়ার জন্য একটি শক্তিশালী পাঠকচক্র ইতোমধ্যেই গড়ে উঠেছে।

সবার উপরে সত্য কথা এই, বইটি লেখার সময় আমার যে আর একটা উদ্দেশ্য ছিল তা হলো- মানুষ ব্যাংকারদের এখনো বিশ্বাস করে সবচেয়ে বেশি। মানুষ জীবনের সব সঞ্চয় ব্যাংকারদের কাছে জমা রেখে নিশ্চিত থাকতে চায়। সরকারও মূল্যবান সামগ্রী কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখে। কিন্তু বাজারে এরূপ দৃষ্টিভঙ্গি প্রচলিত, ব্যাংকার মাত্রই নিরস একজন মানুষ। এরা টাকা গোনা, ঋণ দেয়া, ঋণ আদায় ও আমানত সংগ্রহের জন্য ধরনা দেয়া ছাড়া আর কিছুই বোঝে না। অনেক কর্তৃপক্ষ, এমনকি ব্যাংকাররাও স্বয়ং মনে করে যে তাদের আর কিছু বোঝা উচিতও নয়। আমি আমার ক্ষুদ্র প্রয়াস দিয়ে এ দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর প্রচেষ্টা চালাতে চাই। সামনেও চালিয়ে যাব। সবশেষে বলি- সবাইকে নির্মল আনন্দ দেয়াই আমার উদ্দেশ্য, তো কেউ যদি এ বইয়ের মধ্যে কোনো শিক্ষামূলক কিছু পেয়ে যান তবে সেটা হবে আমার বোনাস। সমকালীন ব্যাংকিং জীবন কেমন ছিল তা জানার জন্যও বইটি ব্যাংকারদের জন্য সহায়ক হতে পারে। ব্যাংকারদের জন্য ছোট ছোট কিছু টিপসও আছে বইটিতে।’

লেখক জালাল উদ্দীন মাহমুদের ‘রঙে ভরা আমার ব্যাংকিং জীবন’ বইটি পড়ে আমার মনে হয়েছে এটি এক ঢিলে মারা অনেকগুলো আমের মতো সুন্দর। আমি অনেকদিন পর নানা গল্পে ঠাসা, অনেক তথ্যবহুল একটি বই পড়লাম। এখানে ঘুম সম্পর্কিত অনেক প্রয়োজনীয় তথ্য আছে। যা মানুষকে সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। ‘জগৎশেঠ’ যে কারো নাম নয়, এ আমার জানা ছিল না। বইটি পড়ে আমি প্রথমবারের মতো জানলাম, ‘জগৎশেঠ’ মানে বিশ্বব্যাংক। জৈনধর্ম, মাড়োয়ারিসহ অনেক তথ্যসমৃদ্ধ এই বইটি সবার কাছে সমাদৃত হবে। ব্যাংকার হিসেবে মানুষ বইটি পড়তে পারেন। বইটিতে একদিকে প্রচুর রসবোধ, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় তথ্য আর বাস্তব অভিজ্ঞতা- যা আমাদের জীবনকে আরো মানবিক, উদার, সহনশীল, সদয় ও বাস্তবধর্মী করতে কাজে লাগবে বলেই আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস।

লেখক জালাল উদ্দীন মাহমুদের ‘রঙে ভরা আমার ব্যাংকিং জীবন’ বইটি পড়ে তার এক সময়ের সহকর্মী মোহাম্মদ নাজমুল হুদা রবিন বলেন, ‘জালাল স্যারের রঙে ভরা আমার ব্যাংকিং জীবন বইটি পড়ে মনে হলো জীবনটা গল্পের মতো, যে গল্প মানুষকে সুন্দরভাবে বাঁচতে পথ দেখায়। খুব ভালো লেগেছে জালাল স্যার ও রফিক সাহেবের তৈরি প্রত্যয়নপত্র, যাতে ম্যানেজার তার নিজের মৃত্যু সনদে সাইন করেছিলেন। এটা আমাদের জন্য খুব শিক্ষণীয় একটা বিষয়। কারণ আমরা অনেকেই সাব অর্ডিনেটের তৈরি করা ভাউচার ভালোভাবে পরীক্ষা না করেই কাউন্টার সাইন করি- এতে আমরা বড় ধরনের বিপদে পড়তে পারি। তবে এটাও ঠিক, এই আস্থার জায়গা আছে বলেই আমরা অনেক সুন্দর ও ভালো কাজগুলো সহজে সম্পাদন করতে পারি। আরো ভালো লেগেছে আমিনুর আর সাইকেলের বিষয়টা। আমিনুরের মতো সহজ ও অনুগত চরিত্রের মানুষ আছে বলেই আমাদের অনেকের যাপিত জীবন এমন সুন্দর হয়। ভিসিআর, সিনেমা চরিত্রের অনেক তথ্য আছে এই বইটিতে। সিনেমার সেকাল-একালের মধ্যে যে ফারাক আর সমাজ ব্যবস্থার দ্রুত পরিবর্তন তা নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের মতো হয়ে থাকবে। স্যার, তরুণ বয়সে অনেকের মতো নিজেকে নায়ক ভাবতেন।’

লেখক জালাল উদ্দীন মাহমুদের রঙে ভরা আমার ব্যাংকিং জীবন প্রথম খণ্ড শেষ হয়ে যাওয়ায় পুনঃমুদ্রণ করতে হয়েছে। পুনঃমুদ্রিত কপিগুলোও শেষ হয়ে যাওয়ায় তৃতীয়বার পুনঃমুদ্রণের কাজ চলছে। এর মাঝেই এ বইয়ের ২য় খণ্ডও প্রকাশিত হয়েছে। ৩য় খণ্ডও চূড়ান্ত হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব ৩য় খণ্ড প্রকাশের লক্ষ্যেও কাজ চলছে।

জালাল উদ্দীন মাহমুদ জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৮ সালের ১ জানুয়ারি, বগুড়ায়। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর করেন ১৯৮৩ সালে। ওই বছরই অগ্রণী ব্যাংকে যোগদান। দীর্ঘ ৩৪ বছরের চাকরি জীবনে বগুড়ার আটটি শাখায় কর্তব্যরত ছিলেন- এর মধ্যে চারটিতে শাখা ব্যবস্থাপক হিসেবে। এছাড়া প্রধান কার্যালয়ের পাঁচটি বিভাগে (নিরীক্ষা, পল্লীঋণ, শৃঙ্খলা, ঋণ আদায় ও আইটি) কর্মরত ছিলেন। তার মধ্যে আইটি ডিভিশনে ৯ বছর। অনলাইন ব্যাংকিং কার্যক্রমের শুরু থেকে সর্বশেষ শাখায় তা বাস্তবায়ন পর্যন্ত এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অনলাইন ব্যাংকিংসংক্রান্ত হাজার হাজার কর্মকর্তার প্রশিক্ষণের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত থেকেছেন জালাল উদ্দীন মাহমুদ। এছাড়া বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি), রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব), বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড (বিডিবিএল) ও আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংকের অনলাইন ব্যাংকিং (সিবিএস) বাস্তবায়নের সঙ্গেও জড়িত ছিলেন তিনি।

ছাত্রজীবন থেকেই জালাল উদ্দীন মাহমুদ লেখালেখি শুরু করেন। কর্মজীবনে প্রবেশের পর লেখালেখিতে ছেদ ঘটতে দেননি তিনি। ব্যাংক থেকে অবসরের পর অন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরির পাশাপাশি লেখালেখির কাজ আবার শুরু করেছেন। লিখেছেন রঙে ভরা আমার ব্যাংকিং জীবন। আমরা জালাল উদ্দীন মাহমুদের রঙে ভরা আমার ব্যাংকিং জীবন গ্রন্থটির বহুল প্রচার, প্রসার ও সমৃদ্ধি কামনা করছি। বইটি আপনার সংগ্রহকে সমৃদ্ধ করবে।

-মৃধা আলাউদ্দিন

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj