জেনে রাখুন করোনা ভাইরাস সম্পর্কে

শুক্রবার, ২০ মার্চ ২০২০

ডা. আরিফা আকরাম

করোনা ভাইরাস কি-

করোনা একটি ভাইরাস পরিবারের নাম। সম্প্রতি যে ভাইরাসটি বিশ্বব্যাপী আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে সেটি একটি নতুন করোনা ভাইরাস। বিজ্ঞানীরা এর নাম রেখেছেন ২০১৯-হঈড়ঠ অথবা ডঁযধহ পড়ৎড়হধারৎঁং। এর আগেও ২০০২/২০০৩ সালে চীনে ও ২০১২ সালে সৌদি আরবে যথাক্রমে সার্স ও মার্স নামে দুটি করোনা ভাইরাস বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

২০১৯-এর শেষদিকে চায়নার উহান শহরের কিছু রোগী নিউমোনিয়া রোগের মতো উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়, যা কোনো ওষুধে সাড়া দিচ্ছিল না। সেখানে ঐসব রোগীর দেহ থেকে পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করে চীনের বিজ্ঞানীরা ঘাতক ভাইরাসের জেনেটিক কোড নির্ণয় করেছেন এবং সেখানে দেখতে পেয়েছেন যে এটি একটি নতুন ভাইরাস। তবে এটি পূর্বের আলোড়ন সৃষ্টিকারী সার্স ও মার্স করোনা ভাইরাসের সমগোত্রীয়।

৭ জানুয়ারি ২০২০ এই নতুন করোনা ভাইরাসটির নাম দেয়া হয়েছে- ঘড়াবষ ঈড়ৎড়হধারৎঁং (২০১৯-হঈড়ঠ)/ ডঁযধহ পড়ৎড়হধারৎঁং. পরবর্তী সময়ে ডড়ৎষফ ঐবধষঃয ঙৎমধহরুধঃরড়হ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০ নতুনভাবে এর নামকরণ করে ঝবাবৎব অপঁঃব জবংঢ়রৎধঃড়ৎু ঝুহফৎড়সব ঈড়ৎড়হধারৎঁং ২ সংক্ষেপে ঝঅজঝ-ঈড়ঠ-২ এবং এই ভাইরাস যে রোগ সৃষ্টি করে সেটির নাম ঈড়ৎড়হধ ঠরৎঁং উরংবধংব ২০১৯ সংক্ষেপে ঈঙঠওউ-১৯ ।

এই ভাইরাসে ১ম আক্রান্ত হন চীনের উহান শহরের সি ফুড মার্কেটের কিছু কর্মী ও ক্রেতা। এই বাজারে প্রক্রিয়াজাত মাংস ও বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী বিক্রি করা হয়। গবেষকরা গবেষণা করে যা পেয়েছেন তা থেকে ধারণা করা হচ্ছে এই ভাইরাসটি মানুষের দেহে প্রবেশ করেছে বাদুড় বা সাপ থেকে। তবে উৎস সম্পর্কে এখনো শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, পূর্বে আবিষ্কৃত সার্স ও মার্স করোনা ভাইরাসের প্রাথমিক উৎসও ছিল বাদুড় যা যথাক্রমে পাম সিভেট ও উটের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।

করোনা ভাইরাসের লক্ষণ

ভাইরাসটি মানুষের শরীরে প্রবেশের পর লক্ষণ প্রকাশ পেতে ২-১৪ দিন সময় লাগে। প্রথমে জ্বর তারপর হাঁচি ও শুকনা কাশি দেখা দেয়। তারপর দেখা দেয় শ্বাসকষ্ট ও বুকে ব্যথা। ভাইরাস সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং কিডনিসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ বিকল হয়ে মৃত্যুও ঘটতে পারে।

কীভাবে ছড়ায়?

প্রথমত এই ভাইরাসটি কোনো প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করেছে তারপর আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর থেকে অপর কোনো ব্যক্তির শরীরে এর প্রবেশ ঘটেছে। সুতরাং এটি ছড়ায় নিম্নলিখিত উপায়ে

১। মানুষ বা পশুপাখির মাধ্যমে

২। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি ও কাশির মাধ্যমে

৩। আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে করমর্দন বা তার সংস্পর্শে এলে

৪। রোগীর ব্যবহৃত জিনিসপত্র ধরে সরাসরি নিজের চোখ, মুখ ও নাকে হাত দিলে

সুরক্ষা পাওয়ার উপায়

নিম্নলিখিত পদ্ধতিগুলো অবলম্বন করা যেতে পারে

১। নিয়মিত সাবান দিয়ে ভালো করে হাত পরিষ্কার করা (অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে)। যদি সাবান না থাকে তবে স্যানিটাইজার বা হেক্সিসল ব্যবহার করা

২। হাত না ধুয়ে চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ না করা

৩। হাঁচি, কাশি দেয়ার সময় মুখ ঢেকে রাখা

৪। পশু-পাখির সংস্পর্শে আসার পরে সাবান দিয়ে ভালো করে হাত পরিষ্কার করা

৫। অসুস্থ ব্যক্তিদের থেকে ৩ মিটার দূরত্ব বজায় রাখা অথবা কাছে গেলে মাস্ক পরিধান করা।

এ প্রসঙ্গে মাস্ক নিয়ে দুটি কথা না বললেই নয়। করোনা ভাইরাসের খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দেশে মাস্কের ব্যবহার বহুগুণ বেড়ে গিয়েছে এবং চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে মাস্ক কেনায় বাড়তি দাম রাখা হচ্ছে।

চিকিৎসা

এখনো পর্যন্ত করোনা ভাইরাস থেকে মুক্তি পেতে কোনো ভ্যাকসিন বা ওষুধ আবিষ্কার হয়নি। বিজ্ঞানীরা এই ভাইরাসের ভ্যাকসিন তৈরির জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

শেষ কথা

নতুন আবিষ্কৃত করোনা ভাইরাস নিয়ে আতঙ্কিত এখন গোটা বিশ্ব। চীনের বাইরে জাপান, তাইওয়ান, ফ্রান্স ও ফিলিপাইনে ৪ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এমন অবস্থায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডড়ৎষফ ঐবধষঃয ঙৎমধহরুধঃরড়হ) তাদের এক বিবৃতিতে এই অবস্থাকে চঁনষরপ ঐবধষঃয ঊসবৎমবহপু হিসেবে ঘোষণা করেছে। তবে আশার কথা হলো পৃথিবীতে আক্রান্ত রোগীর মাঝে অনেকে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ত্যাগ করেছে। রোগটি খুব সংক্রামক হলেও মৃত্যুহার অনেক কম (২%), যেখানে মার্স ভাইরাসের ছিল ৩৭% এবং সার্স ভাইরাসের ছিল ১০%। চীনের বাইরে আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, ভিয়েনা, নেপাল, স্পেন, থাইল্যান্ড, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, রাশিয়াসহ আরো বিভিন্ন দেশে এই ভাইরাসের আক্রান্ত হওয়ার খবর দেশগুলোর কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশেও এ রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। ঘরে থাকুন, সুস্থ থাকুন। প্রয়োজন না হলে বাসার বাইরে বের হবেন না।

এসিস্টেন্ড প্রফেসর অব ভাইরোলজি

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ল্যাবরেটরি মেডিসিন এন্ড রেফারেল সেন্টার, ঢাকা

পরামর্শ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj