দাঁতের যতেœ কি করণীয়?

শুক্রবার, ২০ মার্চ ২০২০

ডা. আইরিন ফেরদৌস

ইংরেজিতে একটা কথা আছে। “চৎবাবহঃরড়হ রং নবঃঃবৎ ঃযবহ পঁৎব” অর্থাৎ প্রতিষেধক অপেক্ষা প্রতিরোধ উত্তম। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থ্যা, দ্য ন্যাশনাল রিসোর্স কাউন্সিল অফ ইউএসএ, দ্য ন্যাশনাল হেলথ অব সায়েন্স (ইউএসএ), দ্য ইউএস পাবলিক হেলথ সার্ভিস, দ্য আমেরিকান ডেন্টাল এসোসিয়েশনের বিভিন্ন প্রতিবেদন ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, যার চুম্বকাংশ নিম্নে সবার জন্য তুলে ধরার চেষ্টা করছি :

১. প্রতি ৬ মাসে একবার রেজিস্ট্রার ডেন্টাল প্র্যাক্টিশনারের কাছে গিয়ে মুখ এবং দাঁতের পরীক্ষা করা, বিশেষ করে যাদের দাঁতে ক্যালকুলাস বা প্লাগ পড়ে এবং যাদের হার্ট, বহুমুত্র, অধিকন্তু লিভার সমস্যা আছে।

২. অবশ্যই দিনে দুবার দাঁত ব্রাশ করা উচিত। বিশেষ করে সকালে এবং রাতে খাবারের পরে, সফট টুথব্রাশ দিয়ে দাঁত এবং জিহ্বা পরিষ্কার করা উচিত। উল্লেখ্য, যে আমরা যারা দাঁত ব্রাশ করি, কিন্তু সাধারণত জিহ্বা ব্রাশ করি না বা পরিষ্কার করি না, এই জিহ্বার উপরে সাধারণত সবচেয়ে বেশি ময়লা পড়ে। আমাদের জিহ্বার উপরে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্র আছে এখানে হাজার হাজার খাদ্যকণা জমে, এগুলো জমে জমে ঠড়ষধঃরষব ঝঁষভঁৎ ঈড়সঢ়ড়ঁহফং নামে এক ধরনের গ্যাস তৈরি করে, এই গ্যাসই মূলত দুর্গন্ধের জন্য দায়ী, সুতরাং মাড়ি এবং দাঁত পরিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে জিহ্বাও পরিষ্কার করা উচিত। এক্ষেত্রে বাজারে ভালো ব্র্যান্ডের ফ্লোরাইড টুথপেস্ট ব্যবহার করা যেতে পারে এবং অবশ্যই আপনার টুথব্রাশ ৩/৪ মাস পর পর পরিবর্তন করতে হবে এবং বাজারে জিহ্বা পরিষ্কার করার অনেক উপকরণ আছে তা ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে সাময়িকভাবে দাঁত মাজার ব্রাশ দিয়েও পরিষ্কার করা যেতে পারে।

৩. অনেকের দেখা যায় দাঁত ব্রাশ করলে বা এমনি এমনি মাড়ি থেকে রক্ত বের হয় এটাও দুটি কারণে হয়, স্থানীয় কারণ, যেটাকে আমরা বলি ডেন্টাল প্লাগ, এটা স্কেলিং দ্বারা সারানো যেতে পারে আরো একটি হলো অজানা কারণ, যেমন কারো রক্তে প্লাটিলেট কমে গেলে বা দীর্ঘদিন যাবৎ ডায়াবেটিস থাকলে, এটা হতে পারে, সুতরাং সঠিক ডায়াগনোসিস দ্বারা বোঝা যাবে এর কারণ এবং সে অনুসারে রোগীর চিকিৎসা ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। একটা বিষয় খেয়াল রাখতে হবে আপনার মাড়িতে বা মুখে ঘা আছে কিনা, যদি থাকে তবে অবশ্যই পরীক্ষা করে আপনার যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।

৪. প্রতিটি মানুষকে অবশ্যই সুষম খাদ্য গ্রহণ করতে হবে, বিশেষ করে সবুজ শাক-সবজি, ভিটামিন সি এবং প্রচুর পরিমাণে বিশুদ্ধ পানি পান করতে হবে, সঙ্গে সঙ্গে জাঙ্ক ফুড পরিহার করতে হবে, সঙ্গে আমার পরামর্শ হলো সব ধরনের চিনি জাতীয় খাবার বর্জন করা উচিত। ৫ি. সম্পূর্ণরূপে পান, সুপারি, জর্দা এবং নিকোটিন পরিহার করতে হবে। এগুলোর ফলে দাঁতের এবং জিহ্বায় নিকোটিন জমে, ওই কারণে মুখে পর্যাপ্ত লালা জমাতে বাধা দেয় এবং দাঁতের নানান রোগ হয় সুতরাং পান, সুপারি, জর্দা এবং নিকোটিন এগুলো সম্পূর্ণরূপে পরিহার করা উচিত।

৬. মহিলারা যখন গর্ভবতী হয় তখন আমরা সাধারণত পরামর্শ দেই পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম গ্রহণের জন্য, কারণ গর্ভাবস্থায় ভ্রƒণের হাড় এবং দাঁতের ভিত্তি রচিত হয়, সুতরাং অনাগত বাচ্চার সুস্থ এবং স্বাভাবিক হওয়ার জন্য মায়ের বিশেষ যতœ নেয়া অত্যন্ত জরুরি।

৭. শিশুর ৬ মাস বয়সেই দুধদাঁত আসতে থাকে কোনো কারণে যদি এটি না আসে এবং ৬ থেকে ৭ বছরে এই দুধদাঁত পরে আসল দাঁত আসে এই চক্র যদি না সম্পূর্ণ হয় তবে দেরি না করে অবশ্যই একজন ডেন্টাল সার্জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করা উচিত।

৮. বাংলাদেশের অনেক মানুষের পেটে আলসার, গ্যাস এবং বদহজমের সমস্যা রয়েছে এবং যাদের কোষ্টকাঠিন্য আছে তাদেরও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দ্বারা চিকিৎসা প্রয়োজন, কারণ এসব রোগের সঙ্গে দাঁতের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। গবেষণায় এও দেখা গেছে যারা রেগুলার ক্যাফেইন এবং অ্যালকোহল ব্যবহার করেন তাদের মুখের এবং দাঁতের বিভিন্ন অসুখের জন্য এগুলো ব্যবহার দায়ী সুতরাং এগুলো বর্জন করতে হবে।

৯. গর্ভাবস্থায় মা যদি কোনো কারণে এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করে থাকেন, তাদের বাচ্চার দাঁতে সমস্যা হতে পারে, সুতরাং যারা এই সমস্যায় পড়ে গেছেন তাদের জন্য আমার পরামর্শ হলো আধুনিক চিকিৎসা দ্বারা সম্পূর্ণভাবে এই সমস্যাগুলো ভালো করা যায়। এক্ষেত্রে অবশ্যই একজন রেজিস্টার্ড ডেন্টিস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করুন এবং আপনার সমস্যার সমাধান করুন।

১০. অনেকে আমার কাছে আসেন দাঁতের হলুদ বর্ণের সমস্যা নিয়ে এটি ব্লিচিং দ্বারা সম্পূর্ণরূপে আপনার হলুদ দাঁত সাদা করা সম্ভব, সুতরাং নানা ধরনের ডেন্টাল চিকিৎসা দ্বারা বৈজ্ঞানিক উপায়ে এই সমস্যা থেকে সম্পূর্ণরূপে ভালো করা সম্ভব।

১১. এখন সারা বাংলাদেশে ডেঙ্গু এবং চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে সুতরাং চিকনগুনিয়া বা ডেঙ্গু হলে রক্তে প্লেটিলেট কমে, সুতরাং প্লেটিলেট স্বাভাবিক না আসা পর্যন্ত দাঁত বা মাড়ি থেকে রক্ত পড়তে পারে এই অবস্থায় প্লেটিলেট স্বাভাবিক আসার চিকিৎসা করতে হবে এবং এরপর যাদের দাঁতের সমস্যা আছে তারা দাঁতের চিকিৎসা করতে পারেন।

১২. আক্কেল দাঁত সাধারণত ১৮ বছরের পরে উঠে, কোনো কারণে এটি না উঠলে বা আঁকাবাঁকা হলে, দাঁত এবং মাড়ির এক্সরে করে সঠিক চিকিৎসা দেয়া সম্ভব, যা আপনাকে একজন রেজিস্ট্রার্ড ডেন্টাল সার্জনের পরামর্শে এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসা গ্রহণ করা যেতে পারে।

সর্বোপরি আমি একজন রেজিস্টার্ড মেডিকেল এবং ডেন্টাল বিশেষজ্ঞ হিসেবে বলতে পারি, ‘দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম দিতে হবে’ কারণ দাঁতের সঙ্গে শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের গভীর এবং সুস্পষ্ট যোগাযোগ রয়েছে সুতরাং দাঁত ভালো থাকলে দেহের প্রবেশপথ ভালো থাকবে এবং প্রতিটি মানুষ বিভিন্ন রোগ থেকে রক্ষা পেতে পারে।

(বিসিএস- স্বাস্থ্য, পিজিটি)

সহকারী ডেন্টাল সার্জন,

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, চর ভদ্রাসন

ফরিদপুর,

পরামর্শ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj