আগুনে শরীর ও ভবিষ্যৎ দুই ঝলসায় নারীর : জান্নাতুল ফেরদৌস আইভী

সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২০

সালটা ১৯৯৭। রান্না করার সময় আমার গায়ে আগুন লাগে। পুড়ে যায় শরীরের ৬০ শতাংশ। মুখ, বুক, হাত ঝলসে যায় আগুনে। সেই ক্ষত নিয়েই পথ চলছি দীর্ঘ ২৩ বছর। প্রতি পদে পদে পেয়েছি বঞ্চনা। আর মানুষের কাছে থেকে শুনতে অপ্রীতিকর মন্তব্য। শুধু ভাবতাম পুড়ে যাওয়া অন্য সব নারী জীবনে কেমন অবস্থার মুখোমুখি হয়? দেখলাম তারাও ভালো নেই। পুড়ে যাওয়া নারীদের অধিকারের কথা তুলে ধরার প্রয়াসেই আমি গড়ে তুলেছি ভয়েস এন্ড ভিউজ নামের একটি সংস্থা। কিন্তু এ বিষয়টি একটি নতুন বিষয়, দাতা সংস্থাকে এর জন্য প্রয়োজনীয়তা বুঝাতে হয় কোনো উদাহরণ হাজির করে। সেই উদাহরণ গড়তে প্রথমে এগিয়ে এসেছিল নেপালের একটি মানবাধিকার সংস্থা ‘করুণা ফাউন্ডেশন’। পোড়ার দুর্ঘটনা প্রতিরোধের বিষয়ে সচেতনতার কাজ করার জন্য এই সংস্থাটি একটা ক্ষুদ্র আর্থিক সহযোগিতা করে ভয়েস এন্ড ভিউজকে। মানুষের ভেতরে এ বিষয়ে জানার আগ্রহ কম দেখে তখন আমরা বর্তমান সময়ে পুড়ে যাওয়া নারীদের জীবনের অবস্থা জানার চেষ্টা করতে চাই। দেখলাম দাতা সংস্থার মধ্যেও এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা নেই। দুটি সংস্থা আমাদের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়। সবশেষে বাংলাদেশেরই একটি জাতীয় পর্যায়ের সংস্থা হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (এইচডিএফ) একটা ছোটমাত্রার অনুদান দেয় ভয়েস এন্ড ভিউজকে। যাতে আগুনে পুড়ে যাওয়ার দুর্ঘটনার শিকার হয়ে বেঁচে যাওয়া নারীদের বর্তমান আর্থসামাজিক অবস্থা এবং তারা কীভাবে তাদের দৈনন্দিন জীবনে মানসিক আঘাত সহ্য করছে, এ বিষয়ের তথ্য সংগ্রহ করতে পারি। এই গবেষণা তথ্য সংগ্রহ করার জন্য ‘মুক্তি নারী ও শিশু উন্নয়ন সংস্থা’ এবং ‘জাগরণ প্রতিবন্ধী নারী উন্নয়ন সংস্থা’ সহযোগিতা করেছে।

এই গবেষণা থেকে জানার বিষয়গুলো ছিল মূলত কত বছর বয়সে দুর্ঘটনা ঘটেছে, পড়ালেখার যোগ্যতা, বিবাহিত কিনা, বিয়ের সময়ে পোড়ার কারণে কোনো বাড়তি ব্যয় কনের পরিবার বহন করেছে কিনা, বিয়ের পরে পারিবারিক জীবন কেমন কাটাচ্ছেন, প্রতিবেশীদের ব্যবহার কেমন, যানবাহনে চড়তে গেলে কেমন অভিজ্ঞতা, তিনি কোনো আয় বৃদ্ধিমূলক কাজ করেন কিনা, যেক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্রে সমান মজুরি ও মর্যাদা পান কিনা, পরিবারে তার মতামতের গুরুত্ব দেয়া হয় না কিনা এবং উত্তরাধিকারসূত্রে সম্পদ পেয়েছেন কিনা। গবেষণাটি খুব ছোট আকারের হয়। মোট ১১৬ জন ব্যক্তির তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে ৫৫ জনের ১০ বছর বয়সের আগেই, ২২ জনের ২০ বছর বয়সের আগে এবং বাকি ৩৯ জনের ২০ বছরের বেশি বয়সে দুর্ঘটনা ঘটেছিল। কাজ করতে গিয়ে দেখলাম, শিশুরাই আগুনে পোড়ার ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি। এর সঙ্গে সম্পর্কিত যে বিষয়টি আসে তা হলো পুড়ে যাওয়ার কারণ। ১১৬ জন নারীর মধ্যে একজন এসিড সহিংসতার শিকার হয়েছেন। তিনজন পারিবারিক ষড়যন্ত্রের কারণে এবং ১১২ জন দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন।

শিক্ষার হারের ক্ষেত্রে এই উত্তরদাতাদের ৫২ জন নারী নিরক্ষর, ৩৮ জন প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষা, ১২ জন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়েছেন। আর বর্তমানে ১২ জন নারী পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। কাজেই এই ১২ জন ছাড়া প্রায় সবাই আয় বৃদ্ধিমূলক কোনো পেশায় জড়িত নেই। যদিও ২৫ জন নারী দিনমজুর এবং বাড়িতে সেলাই করে এবং হাঁস-মুরগি পালন করে কিছুটা আয় করেন। তবে দিনমজুর নারীদের প্রায় সবাই মজুরি বৈষম্যের শিকার হয়ে চলেছেন এবং পোড়া অঙ্গের কারণে প্রতিনিয়ত অসহনীয় মানসিক নির্যাতনের ব্যবহারের সঙ্গে জীবন কাটাচ্ছেন। এবার আসা যাক পারিবারিক জীবনের তথ্যে। উত্তরদাতাদের ১১৬ জনের মধ্যে শিশুর সঙ্গে ৯ জন এবং বর্তমানে পড়ালেখা করছে ৪ জন। যারা স্বাবলম্বী হওয়ার পথে রয়েছেন। এই সংখ্যা বাদ দিয়ে যারা আছেন তাদের মধ্যে ৩ জন বিয়ে করেননি কখনো। আর একশ নারীর মধ্যে ২ জনের বিয়ে হয়েছে যৌতুক ছাড়া। তবে সেক্ষেত্রে ওই নারীই আয় করে সংসার চালাচ্ছেন। বাকি ৯৮ জনের সবার বিয়ে হয়েছে অতিরিক্ত মাত্রার যৌতুকের বিনিময়ে তবুও বিয়ের পর পোড়া শরীরের কারণে স্বামী হয় দ্বিতীয় বিয়ে করেছে অথবা স্বামী পরিত্যাগ করেছে অথবা স্বামীর সংসারে থাকলেও স্বামী এবং শ^শুরবাড়ির সবাই মানসিক নির্যাতন করে। প্রতিবেশীদের ব্যবহার এবং যানবাহনের চড়ার অভিজ্ঞতা প্রায় সবার ক্ষেত্রেই ভয়াবহ কট‚ক্তিপূর্ণ এবং অসহযোগিতা পাওয়ার অভিজ্ঞতা।

বর্তমানে পোড়া রোগীদের চিকিৎসা ব্যবস্থায় বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটেছে। এছাড়া এসিড সহিংসতা বন্ধের জন্য অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে কাজ করেছে সরকারি ও বেসরকারি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। তবে সন্ত্রাসী ঘটনায় হোক কিংবা দুর্ঘটনাজনিত কারণে হোক যারা ইতোমধ্যেই পুড়ে যাওয়া মানুষ, বেঁচে যাওয়া এমন একজন ব্যক্তিকে প্রায় আজীবন চিকিৎসা নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়। আর সেক্ষেত্রে পারিবারিক অন্যায়ের শিকার হয়ে যান প্রায় সব নারী। কারণ তার চিকিৎসার ব্যয় বহন করেছে বলে পরিবার থেকে উত্তরাধিকার সম্পদের অধিকার হারিয়েছেন এই মন্তব্য শুনতে হয় প্রায় সব পোড়া নারীকে। গবেষণার উদ্দেশ্য শুধু পুড়ে যাওয়া নারীদের জীবনে যেসব ধরনের সামাজিক হয়রানি, বৈষম্য এবং অন্যায় ঘটছে সে সম্পর্কে জানা। পরিবারের রান্নার দায়িত্ব নারীদের ওপরেই থাকে, এ কারণে যেমন পোড়ার দুর্ঘটনার শিকার নারীরা বেশি হন তেমন পারিবারিক সহিংসতার কারণে নারীরা পুড়ে যাওয়ার দুর্ঘটনার শিকার বেশি হন, এটাও ঠিক। বলা যায় ‘সহিংসতার দুষ্টচক্র’। কারণ যাই হোক, একজন পুড়ে যাওয়া নারী পোড়ার মুহূর্ত থেকে বাকি জীবন এই সমাজের অন্যায়, বৈষম্য আর মানসিক নির্যাতনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে জীবন কাটান। এই অবস্থার অবসান দরকার।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj