সাইবার প্রতারণা : আহমেদ মুশফিকা নাজনীন

সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২০

বন্ধুদের সবার ফোন আছে শুধু পিয়ারই নেই এই বলে দিনরাত মন খারাপ আর ঘ্যানঘ্যান করার পর বাবা কিনে দিলেন ফোন। অপো স্মার্টফোনের নতুন মডেল দেখে বন্ধুরা বিস্মিত। অহংকারে দুলে ওঠে কিশোরী মেয়েটির মন। যাক দেরিতে পেলেও সবার চেয়ে ওর ফোন দামি আর দেখতে সুন্দর। সময় কাটে ওর ফোন নিয়ে। বয়স বাড়িয়ে খোলে ফেসবুক পেজ। নানা ঢংয়ে নতুন নতুন ছবি আপলোড করে। কখনো নিজের, কখনো ওর আদরের বিড়ালের, কখনো বন্ধুদের সঙ্গে সেলফি। এ যেন এক রঙিন জগৎ গড়ে ওঠে ওর।

হঠাৎ একদিন ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট আসে নীল আকাশ নামে এক আইডি থেকে। প্রোফাইল দেখে। পছন্দ হয়। বন্ধুদেরও দেখায়। বন্ধুরা দুষ্টামি করে। নিতে বলে। রিকোয়েস্ট নেয় সে। এরপর দিনরাত শুধু চ্যাটিং। পড়ার নাম করে বইয়ের ফাঁকে লুকিয়ে লুকিয়ে চ্যাট করে ও। সারারাত জেগে কথা বলে। ঘোর লাগে ওর। একদিন ছেলেটা ওর সঙ্গে দেখা করতে চায়। রাজি হয় পিয়া। মাকে মিথ্যে কথা বলে বেরিয়ে যায়। সারাটা বিকাল দুজন ঘুরে বেড়ায়, রেস্টুরেন্টে খায়। রাতে বাড়ি আসে। মা জেরা করলে বলে বন্ধু তন্দ্রার জন্য দেরি হয়েছে। মা বিশ^াস করেন। ক’দিন পর আবার ছেলেটার আবদারে ও বেড়াতে যায়। সরল বিশ^াসে ঘোরে মেয়েটি। ছেলেটা হোটেলে নিয়ে যায় ওকে নিরিবিলি সময় কাটাবে বলে। ক’দিন পর ছেলেটার ফোন ফেসবুক সব বন্ধ পায় মেয়েটি। পাগল পাগল লাগে ওর। এখানে ওখানে খোঁজে পায় না। ছেলেটার কোনো ঠিকানাই তো জানে না ও।

হঠাৎ একদিন ছেলেটার ফোন আসে। টাকা চায়। নাহলে ওদের ঘনিষ্ঠতার ছবি সব ফেসবুকে ছেড়ে দেবে। মেয়েটি অবাক হয়। এত টাকা কোথায় পাবে ও। ছেলেটি নাছোড়বান্দা। হয় টাকা, নয় মানসম্মান। মেয়েটি মার আলমারি খুলে লুকিয়ে গয়না বের করে ছেলেটিকে দেয়। এভাবে কয়েকবার ছেলেটিকে টাকা দিতে হয়। এক সময় না পেরে বাবা মাকে খুলে বলে ঘটনাগুলো। বাবা পুলিশকে জানায়। আটক করা হয় ছেলেটিকে। জানা যায় ছেলেটি এক গাড়ির কারখানায় মোটর মেকানিকের কাজ করে। প্রোফাইলে লিখেছিল সে ভাসির্টিতে পড়ে।

অন্যদিকে সুমির সঙ্গে ফেসবুকে পরিচয় সুমনের। মফস্বল শহরের সহজ সরল মেয়েটি সুমনের কথার জালে মুগ্ধ হয়। ভাবে এত ভালোবাসে তাকে। কই তার যে এত গুণ কেউ তো কখনো বলেনি। কিশোরী মন উড়ে বেড়ায়। সরল বিশ^াসে হাত বাড়ায় সুমনের দিকে। ভরসা করে পা বাড়ায় নতুন জীবনের জন্য। সুমন তার বিশ^াস নষ্ট করে পালিয়ে যায়। অপমান আর লোকলজ্জার ভয়ে সুমি আত্মহত্যা করে। সুমন নতুন আইডি খোলে আবার নতুন কোনো এক সুমিকে প্রতারণার জন্য।

ফেসবুকের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে প্রতিদিনই ঘটছে নানা অপ্রীতিকর ঘটনা। আমাদের প্রায় সবারই প্রতিদিন শত শত চেনা-অচেনা রিকোয়েস্ট আসে পেজে। এসবের অনেকই থাকে ফেক। কিন্তু অনেক মেয়ে বা ছেলে তা বুঝতেই পারে না। মিষ্টি মিষ্টি ছবি আর কথায় ভুলে যায় তারা।

গ্রামে গেছি বেড়াতে। পুকুর পাড়ে বসে আছে কিছু কিশোরী মেয়ে। দেখলাম তারা গোল হয়ে বসে মোবাইলে কি যেন দেখছে। আমাকে দেখেই লুকিয়ে ফেললো। কথায় কথায় জানলাম ওরা চ্যাট করছে এক ছেলের সঙ্গে। চেনো তাকে, বাড়ি কোথায় কি করে? একটা প্রশ্নেরও উত্তর তাদের জানা নেই। জানলাম শুধু ওরা নয় ওদের স্কুলের অনেক মেয়েই ম্যাসেঞ্জারে কথা বলে, ভিডিও চ্যাট করে। আতঙ্ক লাগলো কোথায় যাচ্ছে এরা!

মোবাইল ফোন আজ হাতে হাতে ঘরে ঘরে। প্রয়োজনের চেয়ে এর অপব্যবহারই হচ্ছে যেন বেশি। আর এতে প্রতারণার শিকার হচ্ছে বেশি মেয়েরা। নিউজে কাজ করতে যেয়ে প্রতিদিনই এ ধরনের সংবাদ দেখতে পাই। অবাক হতে হয় কিশোরী মেয়েরা কি সহজেই এসব প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলছে। যারা প্রতিবাদ করতে পারে না তারা বেছে নেয় আত্মহননের মতো জঘন্য পথ। ধনী-গরিব সব শ্রেণির মেয়েই কিন্তু প্রতারণার শিকার হচ্ছে।

আটক কয়েক কিশোর জানায় সামনাসামনি মেয়েদের প্রলোভনে ফেলা যায় না। কিন্তু ফেসবুকে তা সহজেই করা যায়। এখানে কেউ কাউকে তেমন চেনে না। একটা কাব্যিক নাম, সুন্দর ছবি, বড়লোকের ছেলে, নামকরা ভার্সিটিতে পড়া দেখলে মেয়েরা সহজে পটে যায়। সহজে বিশ^াস করে। আর তারা খুঁজে খুঁজে তেমন মেয়ে বের করে যাদের টাকা আছে। তাহলে ব্লুাকমেইল করতে সুবিধা হয়। আর এ কাজটা তারা করে কয়েকজন বন্ধু মিলে। পরে টাকাগুলো সবাই ভাগ করে নেয়।

এ কাজটা যে অন্যায় সে বোধটা তাদের মধ্যে খুব একটা দেখা গেল না। কষ্ট পেলাম। সঙ্গে হতাশ। কোথায় যাচ্ছি আমরা।

এখনই সচেতন হতে হবে সবাইকে। বিশেষ করে অভিভাবকদের। নয়তো আত্মহননের মিছিলে সুমি শাম্মী, ময়না লিপিদের নাম বাড়তেই থাকবে।

সন্তানরা ফোন নিয়ে কি করছে তা খেয়াল রাখা উচিত বাবা মায়ের। সন্তানরা যেন কোনো প্রতারণায় না পরে সেজন্য সতর্ক করে দেয়া দরকার। সন্তানদের সঙ্গে যদি সহজভাবে কথা বলেন, সামাজিক সব সমস্যা শেয়ার করতে বলেন তাহলে মনে হয় কিছুটা হলেও প্রতারণার হাত থেকে মেয়ে বা ছেলেকে রক্ষা করা সম্ভব।

এ প্রসঙ্গে পুলিশের অতিরিক্ত ডেপুটি কমিশনার মাহমুদা আখতার লাকী বলেন, যদি কেউ প্রতারণার শিকার হন তিনি আইনের আশ্রয় নিতে পারেন। মালিবাগে সিআইডি ও ডিএমপির সিটিটিসি ইউনিটে অভিযোগ করা যায়। এজন্য দরকার প্রতারণার স্ক্রিনশট আর যে আইডি থেকে প্রতারণা করা হয় তার লিংক। এসব নিয়ে তারা ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট অথবা পর্নোগ্রাফি অ্যাক্টে মামলা করতে পারেন। মাহমুদা বলেন, এখন দুভাবে প্রতারণা করা হচ্ছে এক আইডি হ্যাক করে টাকা পয়সা চাওয়া হয় অন্যভাবে হচ্ছে পরিচিত কাছের মানুষ বা বন্ধুরা ব্লুাকমেইল করছে নানা ধরনের ছবি পোস্ট করে। তার পরামর্শ লোকলজ্জার ভয়ে সব গোপন না করে দ্রুত প্রতারককে ধরিয়ে দেয়া দরকার।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj