কলকাতায় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মুখোমুখি ভোরের কাগজ : আজো রাতে বাড়ি ফিরে ভাবি সারাদিন কী করলাম?

শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২০

এই উপমহাদেশে যে ক’জন অভিনেতা মেধায় আর সাবলীলতায় অভিনয়কে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায় তাদের মধ্যে অন্যতম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ৮৬ বছর বয়সে এসেও লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের মায়া থেকে এখনো বের হতে পারেননি। কলকাতার হরীতকী বাগান লেনের শুটিং বাড়িতে এসে পাওয়া গেল এই কিংবদন্তিকে। নিজেরই বায়োপিক ‘অভিযান’র শুটিং করছেন তিনি। মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে কথা হলো তার সঙ্গে। কথা বলেছেন শ্রাবণী রাখী

এই বয়সে অসুস্থতা নিয়েও শুটিং করছেন। অদ্ভুত প্রাণশক্তি আপনার!

সৌমিত্র : হা-হা-হা। আসলে আমার শারীরিক অবস্থা, আমার স্ত্রীর শারীরিক অবস্থা এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছে তবুও এই কাজটা করতে বাধ্য হচ্ছি। আসলে এটা অনেক আগের কথা দেয়া তো, তাই কথা রাখতেই হলো।

‘অভিযান’। আপনার নিজেরই বায়োপিক। অভিনয়ও করছেন আপনি নিজেই। মনে হলো না যে আরো আগেই কাজটা শুরু হতে পারত?

সৌমিত্র : আসলে কথা তো চলছিল বেশ আগে থেকেই। কিন্তু চিত্রনাট্য তৈরি করারও একটা ব্যাপার আছে। সময় তো লেগে যায়ই। আর বায়োপিক হলেও এখানে শুধুই আমার উপস্থিতি থাকছে না। সত্যজিৎ রায় থেকে শিশির কুমার ভাদুরি মিলবে সবার ঝলক। উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেনের দেখাও মিলবে। বলা যেতে পারে, আমার জীবন ফিরে দেখা। মঞ্চ থেকে সেলুলয়েডে, কবিতা পাঠ থেকে লেখালেখি সবই উঠে আসবে এই ছবিতে।

আপনার কি মনে হয়েছে, সৌমিত্রের বায়োপিকের পরিচালক হিসেবে পরমব্রতই ঠিক আছে!

সৌমিত্র : পরমব্রতর জ্ঞান ও বিবেচনার ওপর বিশ্বাস রয়েছে আমার। তাছাড়া সম্পূর্ণ চিত্রনাট্যও পড়েছি আমি। একশ শতাংশ যাচাই করেই এই ছবি করার মত দিয়েছি।

ক’দিন আগে তো আপনারা আরেকটি ছবি ‘বরুণবাবুর বন্ধু’ মুক্তি পেয়েছে। ছবির গল্পটা আসলে কি রকম?

সৌমিত্র : এটি ভীষণভাবে এ সময়ের ছবি। ছাত্র জীবনে রাজনীতি করা চিন্তাশীল, নীতিনিষ্ঠ ও আপসহীন এক ব্যক্তিত্বের ভূমিকায় অভিনয় করেছি আমি। আসলে এই সময়ে রাজনীতি কীভাবে দুর্নীতি ও সুযোগসন্ধানীদের হাতে কুক্ষিগত হচ্ছে কাহিনীছলে পরিচালক সেটাই দেখাতে চেয়েছেন।

ছয় দশক ধরে অভিনয় করছেন আপনি। এখনো এত অনুপ্রেরণা কোথায় পান?

সৌমিত্র : আমি একজন পেশাদার অভিনেতা। সারাজীবন তাই হতে চেয়েছি। বাংলা থিয়েটারের কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব শিশির কুমার ভাদুরির সংস্পর্শে আসাটা আমার জন্য অনেক বড় সৌভাগ্যের বিষয় ছিল। তারপর জীবনে প্রথম সিনেমার ডাক পাই স্বয়ং সত্যজিৎ রায়ের কাছ থেকে। পরবর্তীতে এই সম্পর্কগুলো আমার খুব কাজে আসে। ক্যারিয়ারে সত্যজিৎ রায়ের অবদান আজীবন স্বীকার করে যাব। আর আসলে আমি খুব খুঁতখুঁতে। কিছুতেই সন্তুষ্ট হই না। আজো রাতে বাড়ি ফিরে ভাবি সারাদিন কী করলাম? খিদেটা থেকেই যায়। আমি মনে করি কোনো ব্যক্তি যদি সংস্কৃতিমনস্ক না হন, তা হলে তিনি নিজে থেকে কোনো সংস্কৃতি তৈরি করতে পারেন না।

সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, তপন সিংহ, তরুণ মজুমদার থেকে শুরু করে এই সময় পরিচালকদের সঙ্গে সমানতালে কাজ করে যাচ্ছেন। পাঁচ প্রজন্মের যে পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করেছেন, তাদের একেকজনের ধরন ছিল একেক রকম। কীভাবে মানিয়ে নিয়েছেন?

সৌমিত্র : প্রাথমিক স্তরে তেমন তফাৎ নেই। যারা নিজেদের কাজ নিয়ে খুব সিরিয়াস, তারা খুব ফোকাসড্। কিন্তু তাদের কাজের ভাষাটা আলাদা। তাই অভিনেতাদের তারা একেক রকম ভাবে ট্রিট করেন। এখনকার পরিচালকরাও অভিনেতাদের বন্ধু হয়ে যান।

পর্দা থেকে মঞ্চ। কবিতা থেকে পত্রিকা সম্পাদনা। বাস্তব জীবনে আমরা অনেক ভূমিকায় পেয়েছি আপনাকে। এতকিছু করার অনুপ্রেরণা পান কী করে!

সৌমিত্র : শৈশব থেকেই সৃজনশীল কাজের প্রতি দুর্নিবার এক আকর্ষণ কাজ করত আমার মধ্যে। মোটামুটি সব কাজের কাজী কিন্তু কোনো কিছুতেই ওস্তাদ না- এরকম একটা অবস্থায় ছিলাম। তারপর ভেবে দেখলাম সবদিকে না ছুটে যে কাজগুলো করতে আমি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি সেদিকেই আরো মনোযোগী হওয়া উচিত। কাজেই থিয়েটার আর আবৃত্তি হয়ে দাঁড়াল আমার প্রধান নেশা। বাবা-মার কাছ থেকে আমি সর্বাত্মক সহযোগিতা পেয়েছি।

এখনো কি নিজের পুরনো কোনো ছবি দেখেন?

সৌমিত্র : ‘চারুলতা’। ‘অশনি সংকেত’। শুধুমাত্র ‘অশনি সংকেতের ‘র’নেস-এর জন্যই দেখব। আসলে যে অঞ্চলকে ঘিরে ওই ছবির গল্পটা তৈরি হয়েছে, আমি সেই অঞ্চলের লোক। আমি দেখেছি মানিকদা কী চমৎকারভাবে একইসঙ্গে মানুষের অসহায়তা, প্রেম দুটোই দেখিয়েছেন।

‘অশনি সংকেত’ এর প্রসঙ্গ যেহেতু এলো, এই সুযোগে একটা কথা জেনে নিতে চাই। ববিতার সঙ্গে যদি কাজ করার সুযোগটা মিলে যায় তাহলে কি আবার জুটি বাঁধবেন?

সৌমিত্র : অনাঙ্গ বউয়ের সঙ্গে কাজ করতে পারলে তো ভালোই লাগত। কিন্তু আমার শরীরের যে অবস্থা, তাতে নতুন কাজ নেয়ার সাহস হয় না। কেবলই মনে হয়, আজ আছি, কাল নেই। চারপাশে এত কাছের মানুষজন চলে যাচ্ছে!

ক্যারিয়ারের ছয় দশকে আপনার সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা কী?

সৌমিত্র : বিশ্বস্ত হওয়া, সৎ হওয়া।

বিনোদন হাইলাইটস'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj