গিয়াস আহমেদ : এখনো স্বপ্ন দেখি এখনো গল্প শুনি গান গাই প্রাণভরে…

শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২০

সন্ধ্যার ছায়া নামে, এলোমেলো হাওয়া, ভালো লাগে জীবনে এই গান গাওয়া- ‘আমার মন করে আকুল, আমার প্রাণ করে আকুল, গো…!’ বন্ধু ইশরাত জাহান কাকনের কণ্ঠে রামারমণের এই গানে আমাদের মন-প্রাণ আকুলি-ব্যাকুলি করে…।

আমি গৃহে রইতে আর পারি না…

গৃহে থাকা যায়নি আদতে। আমরা এসেছি বন্ধুতার টানে। এসেছি ভোরের কাগজ পাঠক ফোরামের ‘চড়–ইভাতি ২০২০’-এ। আমরা বন্ধুদল ঘন হয়ে বসেছি ধামরাইয়ের মহিশাষীর মোহাম্মদী গার্ডেনের আঙিনায়। চারপাশে গোলাপ, গাঁদা আর তারার মতো ফুটে থাকা রংবাহারি পিটুরিয়া ফুলের হাসি। আমের মুকুলেও লেগে আছে সন্ধ্যার আবছায়া। সেই মায়াবী আলোয়, মায়া-মমতায় জড়াজড়ি করে আমরা ডা. হাসান শাহরিয়ার কল্লোলের একের পর এক গান শুনি। তারই মাঝে ‘পিলো পাসিং’, শিশুদের খেলাধুলার পুরস্কার, আর টানটান উত্তেজনার র‌্যাফেল ড্র হলো। সুইমিং পুলে দাপাদাপির পর জম্পেস মধ্যাহ্নভোজ, তারপর যত আনন্দ আয়োজন।

আঁখি ঠারে কয় গো কথা…

পাঠক ফোরামের বটবৃক্ষ ভোলানাথ পোদ্দার, বিভাগীয় সম্পাদক মুকুল শাহরিয়ার, চড়–ইভাতি কমিটির আহ্বায়ক সুব্রত শেখর ভক্ত, কর্মঠ আয়োজক বোরহান উদ্দিন, দন্তস্য সফিক, কাজী সেলিম উদ্দিন, সরফরাজ উদ্দিন পারভেজ আন্তরিকতার চূড়ান্ত করেছেন। পাঠক ফোরামের ¯েøাগান ‘শানিত চেতনা সমৃদ্ধ মনন’। বেশ ভারী কথা। তবে চড়–ইভাতির আয়োজনে ভারভারিক্কি কোথায় আর! ছোট-বড় প্রায় বুড়ো সবাই চড়–ইপাখির মতো কিচিরমিচির করছে। আনন্দময় সুখী পরিবেশ।

আমার প্রাণবন্ধুর মুখের হাসি

মোহাম্মদী গার্ডেনই চড়–ইভাতির ভেন্যু। তবে এর আগে আয়োজকরা আমাদের ঘুরিয়ে এনেছেন সাটুরিয়ার বালিয়াটি প্রাসাদ। সে আসাধারণ এক অভিজ্ঞতা! ‘বহু দেশ দেখিয়াছি বহু নদ-দলে’ এমন বিশাল ও বিস্ময়কর জমিদার বাড়ি আর দেখিনি। উনিশ শতকে জমিদার গোবিন্দ রাম সাহা গড়েছিলেন গথিক স্থাপত্যশৈলীর এই স্থাপনা। তারই এক উত্তরপুরুষ ঢাকায় স্থাপন করেন জগন্নাথ কলেজ, হালে যেটি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রায় ছয় একর জমির ওপর দক্ষিণমুখী সাতটি অপূর্ব প্রাসাদবাড়ি। কক্ষ নাকি দুইশয়েরও বেশি। অন্দরমহল দেখে সুলতান সুলেমানের হেরেমখানার কথা মনে আসে। বাড়ির পেছনে সাতঘাটার পুকুর। সেখানে ছবি তোলার হিড়িক। মডেল যথারীতি আঞ্জুমান মুন্নী আর তুহিন পাঠান। পোজ কত প্রকার ও কী কী উদাহরণসহ তার চমৎকার প্রদর্শনী। আর এই বায়োস্কোপ বিরামহীনভাবে ক্যামেরা বন্দি করল মোমিনুল ইসলাম লিটন আর ঈশান মাহমুদ। মানুষের আঙুলে কি বাত-ব্যথাও হয় না রে ভাই! ডা. রাব্বী-রুমা দম্পতি ছোট ছেলে রিয়নকে নিয়ে তুলে নিল অসংখ্য ‘সুখী পরিবার’-এর ছবি। প্রিয় পরিবারটিকে ফ্রেমে এবং প্রেমে দেখে চোখ জুড়োয়…।

চিরহলুদ মেসবাহ য়াযাদেরও ‘সবুজব্যাধি’তে পেয়ে বসে যেন! তাকে দেখা যায় নারীবেষ্টিত রোমান্টিক মেজাজে। ছবি তোলার কো-মডেল হতে কাউকেই তিনি বঞ্চিত করেন না। আমেনা মনি, শারমীন শাম্মী, শান্তা, কনক, ত্রিদিব, অঞ্জন, আমি ঘুরে ঘুরে দেখি জমিদারবাড়ির জলুস। জাদুঘরের সিন্দুক কক্ষ, আয়না মহল দেখি আমরা, দেখি বন্ধুর মুখ…। ভোলানাথ পোদ্দারের স্ত্রী, আমাদের ‘গণবউদি’ যেন সবার মধ্যমণি। এই মায়াবতী নারীর সনে বহুদিন পরে দেখা। তিনি আগের মতোই হাসি ও আন্তরিকতায় উজ্জ্বল।

জমিদার বাড়ির টিউবওয়েল চাপে অঞ্জন, আমি আজলাভরে তুলে নিই শীতল জল- আহ!

যেন গোলাপ ফুল…

“ও বন্দের মুখের হাসি

যেমন গোলাপ ফুল

ও হাসি যেমন গোলাপ ফুল…”

কাকনের গানে আবার শীতল প্রাণ ফিরে আসে মোহাম্মদী গার্ডেনে। বন্ধুবিহারের চেয়ে বড় প্রশান্তি আর কী আছে! কোথায় আছে! প্রশান্ত মনে দেখি, আমাদের উত্তর প্রজন্ম খেলা করছে চারপাশ ঘিরে। আদিরা, শান্তা-কনক দম্পতির তুতান, ভদ্র পরিবারের চাঁদনী, কথা…। আমাদের তুমুল কথামালার মাঝে হঠাৎ চোখে পড়ে, সর্বকনিষ্ঠ আরিশা টলোমলো পায়ে এক পা দু পা হাঁটছে, বসে একটু জিড়িয়ে নিয়ে আবার উঠে দাঁড়াচ্ছে, আবার টলোমলো পায়ে হাঁটছে। ছোট্ট নাফিজা নিচু মাঠ থেকে নিজের চেষ্টায় ঠিকই উঠে আসছে উঁচু অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণে। দেখে প্রাণ পূর্ণ হয়। মনে মনে প্রার্থনা করি- তোমরাই আমাদের আগামী, আমাদের স্বপ্ন-সাধ… তোমরা থেমে থাকবে না… কোনো বাধা মানবে না, তোমরা এগিয়ে যাবে, যাবেই…। পরম দয়াময় তোমাদের তাঁর অপার করুণাধারায় রাখুন।

পাঠক ফোরামের জনক, আমাদের গুরু, প্রিয় সঞ্জীব চৌধুরীকে সশ্রদ্ধায় স্মরণ করে ডা. কল্লোল গায় সমাপনী গান, শাহ আব্দুল করিমের সেই চিরজীবী গান- ‘গাড়ি চলে না চলে না চলে না রে…’। কিন্তু গাড়ি ছাড়ার সময় হয়ে আসে। আমাদের ব্যস্তসমস্ত জীবনের তো থেমে থাকার জো নেই। আমাদের ফিরতে হবে সেই গতানুগতিক নাগরিক জীবনে।

আমার বন্দের সমতুল…

অবশেষে আমরা উঠি। রাত ঘন হয়ে আসে। আকাশে মেঘ। হিম বাতাসে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির হুমকি। বন্ধুতার অমলিন গন্ধ মেখে মেঠোপথ ধরে যেতে যেতে যেন শুনি-

‘ও আমি ত্রিজগতে আর দেখি নাই

বন্দের সমতুল

আমার বন্দের সমতুল…’

কে গায়? কে গায় এই গান। আমি অনুভব করি, আমার প্রাণ এই গান গায়, আমার মন বারেবারে ঘুরেফিরে এই গান গায়…। সত্যিই তো, বন্ধুর সমতুল্য আর কী আছে এ ভুবনে, এ জীবনে…!

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj