চড়–ইভাতি নয়, এ যেন

শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২০

বন্ধুত্বের সমাধান সূত্র :

মো. বোরহান উদ্দিন

সব লেনদেন শেষে ঘরে ফেরার পালা। বিদায় জানানোর আগে ফেরার বাসে সবার বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। গন্তব্য অনুযায়ী নিশ্চিত করা হয়েছে বাসের রুট। আমাদের ক’জনের সিট মিলেছে বাসের বনেটে, ড্রাইভারের সিটের পেছনে গদি বসানো টুলে। দন্ত্যস সফিক, ওমর ফারুক দোলা আর আমি হিসেব মেলাচ্ছি।

না, অর্থকড়ি নয় বন্ধুতার। আনন্দের একটা আহ্নিক যাপন শেষে আমরা ফিরছি নীড়ে।

পাক্কা তিন মাসের কর্মযজ্ঞ শেষে কোথায় দাঁড়ালো আমাদের ভালোবাসার এই ডেরা! নিঃসন্দেহে এক মায়াময় পাটিগণিত এসে পৌঁছেছে সমাধানসূত্রে। চড়ুইভাতি শেষে ঘরে ফেরার পথে পেলাম সঞ্চিতা বৌদির (ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্তের স্ত্রী) ফোন। এ যাত্রায় পারিবারিক ব্যস্ততা আর শেষ মুহূর্তের অনাকাক্সিক্ষত ঝামেলায় আসতে পারেননি বলে তার আফসোস। সব ভালোয় ভালোয় সেরেছে কিনা তার খোঁজখবর শেষে জানালেন আগামীতে থাকবেন আমাদের আয়োজনে।

পুরোভাগে ছিলাম বলে পাখির চোখে দেখতে হয়েছে সবকিছু। এ টু জেড খবরাখবরে থাকতে হয়েছে।

শুধু আমি নই এখানে আমাদের সতীর্থ পাফো পরিবার সভাপতি দন্ত্যস সফিক। আগের ক’টা দিন কী অমিত প্রাণশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন তিনি। সবকিছুর দেখভাল আর সতীর্থদের প্রতি যথাযথ নির্দেশনা দিয়ে চাঙ্গা রেখেছিলেন পুরো আয়োজন। চড়ুইভাতি উদযাপন পরিষদের আহ্বায়ক সুব্রত শেখর ভক্ত এবং সদস্য সচিব কাজী সেলিম উদ্দিনও নিজেদের পারঙ্গমতা দিয়ে আয়োজনটিকে করেছেন নিখুঁত। আলাদা করে আরো কয়েকজন মানুষের কথা না বললেই নয়। এক দোদুল্যমান পরিস্থিতি নিয়েও ভোকাপাফো সহসভাপতি ওমর ফারুক দোলা যাতায়াত ব্যবস্থা সামলেছেন, পুরো আয়োজনে উপস্থিত থেকে আলো ছড়িয়েছেন বাচ্চাদের নিয়ে। ডা. হাসান শাহরিয়ার কল্লোল পাঠক ফোরাম ইতিহাসে এক অত্যুজ্জ্বল নক্ষত্র। বহুমাত্রিক প্রতিভার এই বন্ধুটি আমাদের আনন্দ আয়োজন মুখর করেছেন নিজের গানের গলা সমর্পণ করে। শুধু যে গান গেয়েছেন তা নয় বরং পুরো সাংস্কৃতিক আয়োজনের ব্যবস্থাপনা হয়েছে তার হাতে। জাত সংগঠক বলে কথা।

কিন্তু সকাল দেখে দিনটা এমন যাবে বলে মনে হয়নি। আমাদের মেয়ে রাণীয়া মাহাসানাত আঈশাকে নিয়ে চেনা গণ্ডির বাইরে এটা আমাদের দ্বিতীয়বারের মতো বেড়াতে যাওয়া। গতানুগতিক বেড়ানোর বাইরে এবার একটু ভিন্ন রকম আয়োজন। জানাই ছিল দায়িত্বের ভার পরিবারকে সময় দেয়ার ফুরসত দেবে না। তবুও দিন শেষে একটা আনন্দময় আবহে সবাইকে দেখতে পারাটা এক অনির্বচনীয় অনুভূতি।

একেবারে শেষ মুহূর্তে কনফার্ম করা শারমিন জাহান শাম্মী আগে থেকে অপেক্ষায়। জরুরি কাজ থাকায় তার স্বামী (আমাদের মোয়াজ্জেম ভাই) যেতে পারছেন না। তবু সঙ্গে এসেছেন স্ত্রীকে এগিয়ে দিতে। সকাল থেকে আমরা অপেক্ষায় পরিবারসহ আমাদের নির্ধারিত স্থান উত্তরায়। স্ত্রী-কন্যার সঙ্গে আছেন অতিথিও। মুগদা থেকে ফাহিমা আপা এসেছেন ছেলে আলভিকে নিয়ে। ওমর ফারুক দোলার সঙ্গে আছে শূন্য-গল্প আর একঝাঁক অতিথি। শেষে এসে যোগ দিলেন সুহাসিনী বন্ধু লেখিকা খায়রুন্নেসা রিমি। টানা মিনিটদুয়েক রাগের ঝালটা ঝাড়লেন গাড়ি দেরি হচ্ছে দেখে। তারপর যথারীতি আড্ডাবাজি, হাসি, হৈ-হুল্লোড়ের নহর। দেরিতে হলেও বাস এসেছে, আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছে বালিয়াটি প্রাসাদ অভিমুখে।

৯টার গাড়ি ৯টায় ছাড়েনি আমাদের জাতিগত ‘লেট লতিফ’দর কারণে। তবুও বন্ধুত্বের খাতিরে সব মাফ। গাড়িতেই প্রাতঃরাশের ব্যবস্থা। সকাল সকাল একটা হেলদি ব্রেকফাস্ট ছিল বলেই কিনা পথের দেরি গা সওয়া হয়েছিল। আমরা বালিয়াটি পৌঁছাই সাড়ে এগারোটা নাগাদ। সেখানে আগে থেকেই টিকেট কেটে অপেক্ষায় ছিলেন ভোরের কাগজ সাটুরিয়া প্রতিনিধি অলক রায়।

প্রায় আড়াইশ বছর বয়সী বালিয়াটি প্রাসাদ বাংলাদেশের এক অনন্য স্থাপত্য নিদর্শন। সপরিবারে আসা বন্ধুরা এই গোছানো ছিমছাম জমিদার বাড়ির অন্দর-বাহির দেখে যেন আনন্দে আত্মহারা। স্মৃতি ধরে রাখতে তৎপর বন্ধুদের বাঁধনহারা উচ্ছ¡াস দেখে মনে হলো ছেলে-বুড়ো কোনো ফারাক নেই। আনন্দ-উচ্ছ¡াসের ডেরায় সবাই শিশু। অঞ্জন রায়, ডা. রাব্বী, ফারহানা রুমা, ত্রিদিব বর্মণ, আমেনা খাতুন মনি, ঈশান মাহমুদ সবাই ব্যস্ত ক্যামেরা হাতে। আর ঢাকা পরিবারের সহসভাপতি সরফরাজ উদ্দিন পারভেজ সেলফি ভেল্কিতে মাত করছিলেন প্রাসাদ অঙ্গন। ব্যস্ত আমাদের তরুণ তুর্কিরাও। শাওনের ক্যামেরা তাক করে আছে সবার দিকে। তার ক্যামেয়ায় ধরা পড়ে স্বপ্না, নিশাত, শেখ শামীমা নাসরিন পলি, রেজাউর রহমান সবুজ, কাজী সেলিম, মিসেস কাজী সেলিমসহ বাচ্চা-কাচ্চাদের সবাই। আর ফাঁকফোকরে পাফো বি.স. মুকুল শাহরিয়ারও ব্যস্ত হয়ে পড়েন ছেলে মুনেম আর স্ত্রীকে নিয়ে। ক্যামেরাবন্দি হতে থাকে এক একটি পরিবারের গল্প। আর গ্রুপ ছবিতে আনিস ভাইয়ের ক্যামেরায় সবাই ফ্রেমবন্দি হই প্রাসাদ সম্মুখে।

বালিয়াটি প্রাসাদের পাঠ শেষে আমাদের যাত্রা মহিশাষীর মোহাম্মদী গার্ডেন। এখানকার চার নম্বর স্পষ্টটি আমাদের জন্য সেজে আছে পূর্ব পরিকল্পনামতো। ভোজন বিলাসের প্রস্তুতি চলছিল সকাল থেকে। সাংস্কৃতিক আয়োজনের মঞ্চও প্রস্তুত। শিল্পী ও যন্ত্রানুসঙ্গ তৈরি হয়ে আছে আগেভাগেই।

মঞ্চ থেকে ঘোষণা হয়ে গেছে আড়াইটায় মিলবে পেটপূঁজার অর্ঘ্য। তার আগেই সুইমিংপুল হামলে পড়ল শিশু-কিশোররা। তাদের বাবা-মায়েরাও কম যায়নি।

সাজানো ঘোছানো খাবার আয়োজন সারতে সেলফ সার্ভিসে মেতে উঠল সবাই। সবার ভোজের নিশ্চয়তার পর খেতে বসলাম আমরাও। যথারীতি এখানে নেতৃত্বে আছেন ভক্তদা, কাজী সেলিম, দন্ত্যস সফিক।

খাবারের আয়োজন শেষ হতে না হতেই ললনাদের দল মেতে উঠল পিলো পাসিং খেলায়। মঞ্চে মাইক দখলে নিলেন পাফো বটবৃক্ষ ভোলানাথ পোদ্দার এবং পুরনো পাফোস মেসবাহ য়াযাদ। পিলো পাসিং জিতে তাক লাগিয়ে দিল ছোট্ট চাঁদনী। তাকে মাথায় নিয়ে দোলা-পুলিশের সে কী উল্লাস! এখানে দ্বিতীয় হয়েছেন শান্তা এবং তৃতীয় হয়েছেন ফাহিমা। ওদিকে বি.স. মুকুল শাহরিয়ার আর রাশেদের তত্ত্বাবধানে মাঠে প্রস্তুত কচিকাঁচার দল। দু’দফায় দৌড় জিতল লামিয়া, জাইমা ও গল্প (মেয়েদের বিভাগে) এবং তুতান, অনন্ত ও আরেফিন (ছেলেদের বিভাগে)।

এবার আনন্দের নাও দৌড়ানোর পালা। আনন্দের পাল তুলে নৌকা ছুটবে সে ঘোষণা দিতে এসে ভোলানাথ পোদ্দার হয়ে উঠলেন আবেগপ্রবণ। আজকের দেশবিখ্যাত চিকিৎসক ডা. হাসান শাহরিয়ার কল্লোল গান গাইবেন। চড়ুইভাতিতে স্বতঃস্ফ‚র্ততা নিয়ে হাজার ব্যস্ততা পেছন ফেলে তিনি এসেছেন আজ মঞ্চ মাতাতে। অনুজ কল্লোল আজও সমান আবেগ নিয়ে পাঠক ফোরামকে ধারণ করেন দেখে আবেগে গলা কেঁপে উঠাইতো স্বাভাবিক।

স্বর্গে ঢেঁকি পেয়ে তাকে দিয়ে ক’টা ধান ভানিয়ে না নিলেইতো নয়। তাই আমি আহ্বান জানালাম সমসাময়িক উদ্বেগের বিষয় কোভিড-১৯ নিয়ে কিছু বলতে। অগত্যা করোনার কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার বর্ণনা শেষে কণ্ঠ বিলোনোর পালা।

মন শুধু মন ছুঁয়েছে দিয়ে শুরু হলো পরিবেশনা। একে একে গাইতে থাকলেন নিজের ও দর্শকের পছন্দের গান। মাঝে মাঝে আমরা বিরতি নিলাম। পুরো আয়োজনে হাত বাড়িয়ে দেয়া মানুষদের কথা শুনলাম। মঞ্চে আয়োজন নিয়ে কথা বললেন পাফো বি.স. মুকুল শাহরিয়ার। জানালেন পাফো নিয়ে ভোরের কাগজের প্রত্যয়ের কথাও। পুরো আয়োজনে আমাদের মধ্যমণি হয়ে থাকা লেখক, সাংবাদিক ও সাবেক পাফো বি.স. গিয়াস আহমেদ মঞ্চ আলো করলেন। শুভেচ্ছা ডালি নিয়ে এসেছিলেন অতিথি ধামরাই উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম সিরাজ, মো. মোসলেম উদ্দিন মাসুম, সাইফুল ইসলাম। অতিথিদের কথা শোনার ফাঁকে ফাঁকে আমরা শুনলাম বন্ধু ইশরাত জাহান কাকনের গান। মায়াভরা কণ্ঠের লোকগান আমাদের নিয়ে গেল এক অচিনপুরে। যেখানে পরম আরাধ্য বন্ধুকে পেতে মন ছুটে যেতে চায়। আর সংগীত পর্বের শেষ অংশে কল্লোল যখন রাধাকৃষ্ণের প্রেম পর্বের উন্মোচন করলেন বন্ধুদের উল্লাস আর রোখে কে! ওমর ফারুক দোলা, মমিনুল ইসলাম লিটন, বাবু, তুহিন পাঠান, সুব্রত শেখর ভক্তের সঙ্গে সবার প্রিয় বৌদি চপলা রাণী পোদ্দারের ধামাকাধার নাচে মেতে উঠল পুরো রিসোর্ট।

এবার ভাগ্য পরীক্ষার পালা। একশ টাকায় ভাগ্য পরীক্ষায় কেউই বাদ যায়নি। পান্থ রেজা এবারো আশায় ছিলেন বাজিমাত করার। কিন্তু তার ভাগ্যে শিকে ছেঁড়েনি। ছাব্বিশটি পুরস্কার নিয়ে সেকি তুমুল উত্তেজনা। একে একে নম্বর ঘোষণা শেষে হৈ-হুল্লোড় করে বিজয়ীরা মাতিয়ে তোলেন রিসোর্ট। সুব্রত শেখর ভক্ত এবং অরুণ রায় পরিবার জিতে নিয়েছে এগারোটি পুরস্কার, তরুণ বন্ধু আকবর, ইউসুফ, হারুনসহ যারাই জিতেছেন, সবারই উল্লাস ছিল যেন বিশ^জয়ের! তিনটি বিমান টিকেট জিতেছেন ঈশান মাহমুদ, ভোলানাথ পোদ্দার এবং গিয়াস আহমেদ। র‌্যাফেল ড্রজয়ী এই তালিকার সর্বোচ্চ তিনটি নাম দেখে ‘মধুরেণসমাপয়েৎ’ বলা ছাড়া গত্যন্তর কী!

:: সাধারণ সম্পাদক, ভোরের কাগজ পাঠক ফোরাম, ঢাকা পরিবার

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj