রাসেলের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর হৃদ্যতা : ফারুক হোসেন

শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২০

আজকের শিশুরা আগামীদিনের কর্ণধার। তারাই দেবে আগামীদিনের নেতৃত্ব। পৃথিবীর বিখ্যাত ব্যক্তিরাও একদিন শিশু ছিলেন। তাই বিখ্যাত হওয়ার পর শিশুদের নিয়ে তাদেরও ছিল নানা ভাবনা। নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, ‘সমাজ কীভাবে শিশুদের প্রতি আচরণ করে তার মধ্য দিয়ে সমাজের চেহারা ফুটে ওঠে।’ ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু বলেছিলেন, শিশুরা হচ্ছে বাগানের কাদামাটির মতো। তাদের খুব সতর্ক ও আদর সোহাগ দিয়ে যতœ করতে হবে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘শিশুরা হচ্ছে এমন এক প্রকার প্রাণী যারা নিজেরা নিজেদের জগত তৈরি করে।’ ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবুল কালাম বলেছেন, আমরা আজকের দিনটি উৎসর্গ করি যেন আমাদের শিশুরা একটি সুন্দর আগামী দিন পেতে পারে। আর ফরাসি বিজ্ঞানী লুই পাস্তুর বলেছিলেন, শিশুদের দেখলে আমার দুটি অনুভূতি জেগে ওঠে, একটি হলো তাদের জন্য আদর অন্যটি তাদের জন্য সম্মান। এরকম পৃথিবীর খ্যাতিমান ব্যক্তিরা নানাভাবে শিশুদের নিয়ে ভেবেছেন। তাদের প্রতি যতœবান থাকা, মনোযোগ দেয়া, কিছু করা সেটি নিয়ে সবাই ছিলেন সজাগ। কিন্তু সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক, রাজনীতির কবি, বিশ্বব্যাপী শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটু ভিন্নভাবে শিশুদের ভালোবাসতেন। শিশুদের মাঝে থাকতে চাইতেন। আবার শিশুদের জন্য করেছেন নিরাপত্তা বিধান।

শিশুদের কে না ভালোবাসে। কে না আপন করে নেয় তাদের? কিন্তু বঙ্গবন্ধু শিশুদের কীভাবে দেখতেন, কীভাবে আদর করতেন, দুষ্টামি করতেন, তার মধ্যে ছিল ভিন্নতা, স্বাতন্ত্র্য। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শিশুদের ছবি যদি আমরা গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করি, তাতে সেই বৈশিষ্ট্যই খুঁজে পাবে। পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য রাসেলের সঙ্গে মধুর সম্পর্ক ও দুষ্টামি দেখেও আমরা বুঝতে পারি বঙ্গবন্ধুর ছিল একটা মন যা সরল, সুন্দর ও শিশুবান্ধব। সংগ্রাম, আন্দোলন, বারবার কারাবরণ ও প্রচণ্ড মানসিক চাপের মধ্যে থেকেও বঙ্গবন্ধু উপভোগ করতেন শিশুদের সান্নিধ্য উচ্ছ¡াসের সঙ্গে। বুকে টেনে নিতেন আপন করে যে কোনো শিশুকে। হাসতেন শিশুর মতো শিশুদের সঙ্গে। আমরা বিভিন্ন সময় শিশুদের সঙ্গে তোলা বঙ্গবন্ধুর ছবি দেখে বুঝতে পারি তিনি কতটা নিবিড়ভাবে একাত্ম হতেন শিশুদের কাছে।

শিশুকে কাছে পেলেই বঙ্গবন্ধু আত্মহারা হতেন আনন্দে। স্বভাবসুলভ হাসতেন। মাথা নুয়ে ঝুঁকে পড়তেন শিশুর দিকে। শিশুরা তাকে পরিয়ে দিতো স্কার্প, ফুলের মালা, অথবা ব্যাজ। মনে হতে পারে এটি একটি সাধারণ ঘটনা। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর যে অভিব্যক্তি, আনন্দের বহিঃপ্রকাশ, সেটি একটি শিশুর জন্য বিশ্বজয়ের মতো। পৃথিবীর কোনো যন্ত্রণা, মানসিক চাপ কিংবা কর্মভারই বঙ্গবন্ধুকে শিশুর সান্নিধ্য উপভোগ থেকে বিরত রাখতে পারেনি। আর তার কাছে আসা শিশুদের জন্য সব সময়ই ছিল উন্মুক্ত।

রাজনৈতিক বা অন্য কোনো কারণে তিনি যখন মাঠ পর্যায়ে যেতেন, চলার পথে শিশুদের দেখলে গাড়ি থামিয়ে তিনি ওদের সঙ্গে গল্প করতেন। মাথা ছুঁয়ে আদর করে দিতেন। কাছে টেনে লেখাপড়া ও পরিবারের খোঁজ নিতেন। গরিব ও দুস্থ শিশুদের কাছে টেনে নিতেন। কখনো কখনো গাড়িতে তুলে নিতেন এমনকি নিজের বাড়িতেও নিয়ে যেতেন। উপহার দিতেন মন ভরে। ওদের মুখে হাসি ফুটিয়ে বিদায় দিতেন।

নিজ পরিবারের সবচেয়ে কনিষ্ঠ সদস্য শেখ রাসেলের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সম্পর্কটি কেমন ছিল? একেবারে বন্ধুর মতো বাবা বঙ্গবন্ধু শিশুর মতো হয়ে যেতেন রাসেলের সঙ্গে। গল্প করতেন অবসরে। কোলে তুলে উপভোগ করতেন শিশু সন্তানের স্পর্শ। খেলতেন ওর কিংবা ওর বন্ধুদের সঙ্গে। সবাই বঙ্গবন্ধুর ঘাড়ে বা শরীরে চড়ে উঠতো এবং ছোটাছুটিতে মেতে উঠতো। বঙ্গবন্ধু এসব উপভোগ করতেন।

বঙ্গবন্ধুই ভেবেছিলেন, শিশুদের সুরক্ষায় একটি আইন থাকা প্রয়োজন। আর তাই ১৯৭৪ সালের ২২ জুন প্রণয়ন করা হয় জাতীয় শিশু আইন। প্রথম বাংলাদেশের শিশুদের জন্য আইনি কাঠামো। তখন তার চিন্তা চেতনায় ছিল শিশু বান্ধব সিদ্ধান্ত গ্রহণ। শিশুদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর আন্তরিক মনোযোগ প্রতিফলিত হয় এরই মধ্যে। এই আইনে শিশুদের নাম ও জাতীয়তার অধিকারের স্বীকৃতি দেয়া হয়। শিশুদের প্রতি সবধরনের নিষ্ঠুরতা, শোষণ, অবহেলা, নির্যাতন ইত্যাদি খারাপ কাজে লাগানো থেকে নিরাপত্তার অধিকার দেয়া হয়েছে।

কচিকাঁচার মেলার প্রতি বঙ্গবন্ধুর ছিল খুবই আগ্রহ। সেটি শিশুদের জন্যই। এখানে কোনো অনুষ্ঠানে এলে তিনি মিশে যেতেন শিশুদের সঙ্গে। কচিকাঁচার এক আনন্দ মেলায় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘এই পবিত্র শিশুদের সঙ্গে মিশি মনটাকে একটু হালকা করার জন্য’। সংগ্রামমুখর জীবনে বঙ্গবন্ধু যে শিশুর সান্নিধ্য থেকে প্রশান্তি খুঁজে পেতেন, শিশুদের কাছ থেকে প্রেরণার উপাদান খুঁজে বেড়াতেন, সেটি তার এই বক্তব্যে বোঝা যায়। ১৯৭২ সালে একদল ক্ষুদে আঁকিয়ে ছবি এঁকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যায় গণভবনে। বঙ্গবন্ধু খুব খুশি হলেন ছোট বন্ধুদের পেয়ে। আগ্রহ নিয়ে ছবিগুলো দেখলেন। প্রশংসা করলেন। মুগ্ধ হয়ে বললেন, আমাদের দেশে ছোটরা যে এত সুন্দর ছবি আঁকতে পারে, এসব না দেখলে তা বিশ্বাস করা যায় না। সাড়ে তিন ঘণ্টা শিশুদের সঙ্গে কাটান বঙ্গবন্ধু এবং একসঙ্গে খাবার খান। সেদিন তিনি তৃপ্তিভরা কণ্ঠে বলেছিলেন, কর্মব্যস্ত সারাটা দিনের মধ্যে এই একটুখানি সময়ের জন্য আমি শান্তি পেলাম। এতে বোঝা যায় বঙ্গবন্ধু শিশুদের মাঝে থেকে ভুলে থাকতেন ক্লান্তি, যন্ত্রণা বা রাজনৈতিক জীবনের বড় বড় টেনশনের বিষয়। তার মানে তিনি শিশুদের কাছে থাকতে চাইতেন নিজেকে সকল জটিলতা থেকে মুক্ত রেখে প্রশান্তির জন্য। ভুলে থাকতে হবে সব অবসাদ।

বঙ্গবন্ধু সব সময় যেতেন কচিকাঁচা, খেলাঘর ও অন্যান্য ছোটদের সংগঠনের অনুষ্ঠানে। উপভোগ করতেন মার্চপাস্ট, লাঠিখেলা, নানারকমের পারফরমেন্স। তাদের পরিবেশনা দেখে তিনি অভিভূত হতেন এবং প্রশংসা করতেন। ১৯৭২ সালের এক সকালের ঘটনা। বঙ্গবন্ধু বেরিয়েছিলেন হাঁটতে। হঠাৎ দেখলেন একটি শিশু। কাঁধে তার ব্যাগ। কিন্তু সে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। বঙ্গবন্ধু ছেলেটিকে কাছে ডাকলেন, ছেলেটির পায়ের জুতো খুলে দেখলেন, জুতোর ভেতর লোহার সুচ। তাতে লেগে ছেলেটির পা থেকে রক্ত ঝরছে। তিনি দেহরক্ষীকে নির্দেশ দিলেন তার চিকিৎসার জন্য। কিছু টাকাও দিলেন তার হাতে। এই একটি ঘটনা থেকে সহজে আমরা অনুমান করতে পারি বঙ্গবন্ধু কতটা আন্তরিক ছিলেন শিশুদের প্রতি। বজ্রকঠিন প্রতিবাদী ও গণমানুষের নেতা এই বিশাল মানুষের এত কোমল হৃদয়, ভাবা যায় না।

এই শিশু বন্ধু বঙ্গবন্ধুর কথা আজকের শিশুরা কতটা জানে? জানার উপায় কি। এটিও আরেকটি দিক। আজকের শিশুদের জন্য জানার উপায়গুলো যেমন স্থ‚ল তাতে শিশুদের কাছে বঙ্গবন্ধুর ছবি সঠিকভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে কি। শিশু বন্ধু আমাদের জাতির পিতা সম্পর্কে শিশুদের কাছে তুলে ধরার কোনো কর্মসূচি আমি দেখছি না। এই নিয়ে নেই কোনো গবেষণা বা বিশ্লেষণ। সুতরাং শিশুদের প্রিয় নেতা, প্রিয় সংগ্রামী, প্রিয় ত্যাগের উদাহরণ, শিশুদের সেভাবেই জানতে হবে যাতে তারাও সেভাবেই গড়ে ওঠে। এমনভাবে মিশে যেতেন শিশুদের সাথে, শিশুরাও তার সাথে মিশে যেতো সহজে।

শিশুরা যাতে সৃজনশীল, মননশীল এবং মুক্তমনের মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে, বঙ্গবন্ধু সেটাই চাইতেন। অহিংসা দিয়ে, মানব প্রেম দিয়ে ভালোবাসা দিয়ে সমাজে যে আদর্শ বঙ্গবন্ধু নির্মাণ করে গেছেন তার মৃত্যু নেই।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj