পরী : নজরুল ইসলাম

শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২০

ঘড়ির দিকে তাকাল শাহেদ- ছয়টা সতের বাজে। অফিস শেষ হয়েছে সেই বিকাল পাঁচটায়।

সবাই চলে গেছে- শুধু তারা তিনজন এখনো অফিসে বসা। করিম সাহেব, মতিন ভাই আর শাহেদ। এদের মধ্যে শাহেদ সবার জুনিয়র। মতিন ভাই তার বস- কোম্পানির হিসাব রক্ষক। আর করিম সাহেব অন্য সেকশনের।

আবার ঘড়ি দেখল শাহেদ- ছয়টা উনিশ। আজকে সময়ও চলছে না।

শাহেদের অফিসটা তোপখানা রোডে। সাত তলা বিল্ডিংয়ের চার তলায়।

‘দেড় ঘণ্টা যাবৎ বসে আছি, কোনো মানে হয়!’ নীরবতা ভাঙলেন করিম সাহেব।

শাহেদ চোখ তুলে তার দিকে তাকাল। মতিন ভাই নির্বিকার।

করিম সাহেব বলতে থাকলেন, ‘আপনারা না হয় অ্যাকাউন্ট সেকশনের- আমি তো অন্য সেকশনের। আমাকে বসিয়ে রেখে কী লাভ?’

‘এদিকে শহরের অবস্থাও ভালো না। বাসায় যাব কী করে?’

প্রশ্নটা করেই তিনি মতিন ভাইয়ের দিকে তাকালেন, যেন উত্তরটা তারই দেবার কথা।

কিন্তু এবারো মতিন ভাই নিরুত্তর; তবে এবার তাকে একটু বিমর্ষ দেখাল।

উত্তরের অপেক্ষা না করে করিম সাহেব বলতে থাকলেন, ‘আপনার ভাবি বলেছে অফিস থেকে বাসায় যাবার সময় আটা আর চিনি নিয়ে যেতে। দোকান তো সব বন্ধ হয়ে যাবে এতক্ষণে।’

এই কথা শুনেই শাহেদের মনে পড়ল তাকেও তো ফার্মেসি যেতে হবে, পরীর জন্য ওষুধ কিনতে হবে। গত সপ্তাহে ডাক্তার দেখিয়েছিল, বলেছে ফুসফুসে ইনফেকশন। এত ছোট একটা মানুষের ফুসফুসে ইনফেকশন হয়!

অনেকগুলো ওষুধ দিয়েছে, সাথে একটা স্প্রে। ওটাই গতকাল শেষ হয়ে গেছে। রাতে দেয়া হয়নি। সারা রাত মেয়েটা ঘুমাতে পারেনি। নিশ্বাস নিতে মেয়েটার কী কষ্ট! শাহেদ সারাটা রাত মেয়েকে কোলে নিয়ে ঘরের মধ্যে হেঁটেছে।

আজ যদি সে ওষুধ নিয়ে না যায়, তাহলে…

শাহেদ উঠে দাঁড়াল। সে শেষবারের মতো ঘড়ি দেখল- ছয়টা একচল্লিশ।

‘মতিন ভাই, আমাকে যেতে হবে। মেয়েটার খুব অসুখ।’

এই কথা শুনে মতিন ভাই প্রথমবার মুখ খুললেন। ঠাণ্ডা গলায় বললেন, ‘কিন্তু স্যার তো আমাদের তিনজনকেই থাকতে বলে গেলেন- তুমি শুনলে না! আজ মাসের পঁচিশ তারিখ, অথচ স্টেটমেন্টই এখনো পাঠানো হয়নি। তুমি চলে গেলে কীভাবে হবে? করিম সাহেবকে তো স্যার থাকতে বলেছেন অন্য কারণে।’

শাহেদ অস্থির হয়ে উঠল। সে বলল, ‘মতিন ভাই, শহরের অবস্থা ভালো না। একটু পরেই সব দোকান বন্ধ হয়ে যাবে। কোনো ফার্মেসি খোলা পাব না। ওষুধটা আজ নিতে না পারলে আমার মেয়ে…।’ শাহেদের শেষের দিকের কথাটা পরিষ্কার শোনা গেল না।

মতিন ভাইকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে সে অফিস থেকে বেরিয়ে আসল। দ্রুত পায়ে সে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল।

দুই.

রাস্তায় নেমেই শাহেদের বুক শুকিয়ে গেল। রাস্তা বলতে প্রায় জনমানবশূন্য! অল্প দুয়েকজন যাও আছে, তাদের চোখে-মুখে কেমন যেন একটা আতঙ্কের ছাপ।

ঘড়ি দেখল শাহেদ- একেবারে সাতটা।

সে দ্রুত পা বাড়াল। প্রেস ক্লাবের সামনে এসেই তার মনে হলো এদিকে এখন কোনো ফার্মেসি পাওয়া যাবে না; সব বন্ধ হয়ে গেছে। আচ্ছা, শাহবাগের দিকে গেলে কেমন হয়। সেখানে নিশ্চয়ই ফার্মেসি খোলা পাওয়া যাবে। কিন্তু শহরের এই অবস্থার মধ্যে শাহবাগের দিকে যাওয়াটা কি ঠিক হবে?

আজ কেমন একটা ভ্যাপসা গরম পড়েছে- হাঁটতে হাঁটতে ভাবল শাহেদ। মার্চ মাসের এই এক সমস্যা। আচ্ছা, এখন বাংলা কোন মাস?

অনেক চেষ্টা করেও শাহেদ বাংলা কী মাস তা মনে করতে পারল না।

শাহেদ যখন আব্দুল গনি রোড পার হচ্ছিল, তখনই সে সাইরেনের আওয়াজ শুনতে পেল। ভয় পেয়ে সে রাস্তার এক পাশে সরে গেল।

নাহ, এই রাস্তা দিয়ে যাওয়া যাবে না।

এই ভেবে যখনই শাহেদ উল্টা ঘুরতে যাবে, তখনই কেউ একজন তার পেছন থেকে কঠিন গলায় বলল, ‘স্ট্যান্ড আপ’।

শাহেদের মুখ থেকে রক্ত সরে গেল!

সে দেখল তার পেছনে পাকিস্তানি আর্মির দুজন সৈনিক। তাদের পেছনেই আর্মির একটা জিপ দাঁড়িয়ে। সামনে দুজন বসা। পেছনেও কয়েকজন আছে।

সবার কাছেই অস্ত্র!

‘কন হো তুম? ইধার মে কাহা যাতা হ্যায়।’ তার পেছনে দাঁড়ানো দুজন সৈনিকের একজন জিজ্ঞেস করল।

শাহেদ মুখ খোলার চেষ্টা করল, কিন্তু তার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। একবার বাংলায় বলতে গিয়েও সে থামল।

কী ভাবল এক মুহূর্ত, তারপর ইংরেজিতে বলল, ‘আই এম গোয়িং টু মাই হোম, অ্যাট ঝিগাতলা।’

বলেই সে অসহায়ের মতো তাকাল। তারপর অস্থিরভাবে পকেট হাতড়াতে লাগল। হঠাৎ পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে বলল, ‘আই অ্যাম অ্যা সার্ভিস হোল্ডার।’

শাহেদ দাঁড়িয়ে আছে। তার পরিচয়পত্র নিয়ে সৈনিকদের একজন গেছে জিপের কাছে, জিপের সামনে বসা অফিসারের সাথে কথা বলছে। আরেকজন দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে, মনে হয় সে তাকে পাহারা দিচ্ছে। শাহেদের মনে হলো সময় যাচ্ছে না, অনন্তকাল ধরে সে এখানে দাঁড়িয়ে আছে!

অনেকক্ষণ পর সে ফিরে এসে আদেশ করল, ‘গাড়ি ম্যায় ব্যায়ঠো।’

শাহেদ তার বুকে একটা মৃদু চাপ অনুভব করল। কী করবে সে এখন? সে ঢোক গেলার চেষ্টা করল- কিন্তু পারল না। গলার কাছে এসে আটকে গেল।

খাকি উর্দি পরা লোকটি ধমকে উঠল, ‘হারি আপ।’ শাহেদ নীরবে গাড়ির পেছনে উঠে বসল।

গাড়ি চলতে শুরু করল- ধীরে ধীরে।

তিন.

সেসহ জিপের পেছনে মোট পাঁচজন, সামনে ড্রাইভারসহ দুজন।

শাহেদ বাইরে তাকাল- তার চেনা সব রাস্তা, দোকান। কিন্তু চেনা রাস্তাগুলো একের পর এক পেছনে সরে যাচ্ছে।

কোথায় নিয়ে যাবে তাকে? ক্যাম্পে, নাকি নদীর ধারে? এখান থেকে তো নদী অনেক দূর।

সে অবাক হয়ে লক্ষ্য করল তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে সে জন্য সে রাস্তার দিকে তাকিয়ে নেই, মনের অজান্তে সে ফার্মেসি খুঁজছে! আজ রাতে নিশ্চিত মেয়েটার শ্বাসকষ্ট হবে।

শাহেদের চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করল। সে চোখ বন্ধ করল।

হঠাৎ কেউ একজন বলল, ‘আপকা ঘাড় আগায়া।’

মাথা তুলে তাকাল শাহেদ। সত্যিই, তার বাসায় ঢোকার গলির মুখে দাঁড়িয়ে আছে জিপ! যেখান থেকে তার তিনতলা বাসার কিছুটা অংশ দেখা যায়।

সামনে বসা অফিসার আদেশের সুরে বলল, ‘গেট ডাউন।’ শাহেদ নেমে দাঁড়াল।

অফিসার তার দিকে না তাকিয়েই বলল, ‘ডোন্ট কাম আউট টুনাইট।’ বলতেই গাড়িটি শাঁ করে তার পাশ দিয়ে চলে গেল।

শাহেদের এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না! কী করবে সে এখন? বাসায় যাবে, নাকি ফার্মেসি খুঁজবে?

ঘড়ি দেখল সে- নয়টা সাতাশ।

রেশমা যখন দরজা খুলল তখন শাহেদ কাঁপছে। ‘কী হয়েছে তোমার, এত রাত হলো যে?’

রেশমার এই কথার কোনো জবাব সে দিতে পারল না। অস্পষ্ট স্বরে শুধু জিজ্ঞেস করল, ‘পরী কোথায়?’

খেতে বসে শাহেদ বলল, ‘একটা ভুল হয়ে গেছে। পরীর স্প্রেটা আজো আনতে পারিনি।’

রেশমা একটু হেসে বলল, ‘দরকার নেই- ও আজ ভালো আছে। সন্ধ্যার পর শুধু একবার শ্বাসকষ্ট হয়েছিল। তারপর সেই যে ঘুমিয়েছে, এখনো উঠেনি।’

‘আচ্ছা, আজ তুমি কোন আক্কেলে এত রাত পর্যন্ত বাইরে থাকলে? তুমি জানো না- দেশের অবস্থা ভালো না! তার মধ্যে মেয়েটার এই অবস্থা।’

শাহেদ কোনো কথা বলল না। নিঃশব্দে খাওয়া শেষ করল।

রাতে ঘুমুতে যাওয়ার আগে মেয়ের কপালে চুমু খেল শাহেদ।

মেয়েটা দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে, মনে মনে ভাবল শাহেদ। কিন্তু তার গায়ের রং এখনো সেই আগের মতোই আছে- রেশমার মতো।

মেয়েটা শাহেদের কিছুই পায়নি। সব মায়ের পেয়েছে। তবে মেয়েটা স্বভাব পেয়েছে বাবার। শাহেদ কপালে হাত দিয়ে ঘুমায়- মেয়েটাও তাই।

তাদের বিয়ের এক বছর পরেই পরীর জন্ম- আটষট্টিতে। এই ডিসেম্বরে ওর তিন বছর হবে, অথচ এই বয়সেই মেয়েটার কত অসুখ!

শাহেদ ছোট্ট একটা নিশ্বাস ফেলে মেয়ের কপালের হাতটা সরিয়ে দিল।

দেয়ালে টানানো ঘড়ি দেখল শাহেদ- দশটা একান্ন বাজে। রেশমাকে বলল আলোটা নিভিয়ে দিতে।

চার.

মাঝরাতে শাহেদের ঘুম ভাঙল রেশমার ডাকে।

‘এই উঠো, দেখ পরী যেন কেমন করছে!’

আতঙ্কিত হয়ে শাহেদ উঠে বসল।

মেয়েটা নিশ্বাস নিতে পারছে না। মনে হচ্ছে কেউ যেন ওর গলা চেপে ধরে আছে। শাহেদ বলে উঠল, ‘স্প্রেটা নিয়ে আসো।’ বলেই সে হাঁ করে রইল।

রেশমা বলল, ‘কী করবে এখন?’

‘আমার শার্টটা দাও। ওকে এক্ষুনি ডাক্তারের কাছে নিতে হবে।’

বলেই ঘড়ি দেখল সে- রাত বারোটা নয়। এমন কোনো রাত হয়নি।

খাট থেকে নেমে দাঁড়ালো শাহেদ।

এমন সময় কোথাও যেন একটা গুলির শব্দ হলো- তার সাথে সাথে আরো কয়েকটা। শাহেদ ছুটে জানালার কাছে গেল। জানালা খুলতে যাবে এমন সময় রেশমা তার হাত ঝাপটে ধরল।

‘করছ কী! জানালা খুলছ কেন?’

শাহেদ কী বলবে ভেবে পেল না। আবার সে খাটের কাছে ফিরে এলো। পরী এখন অসাড় হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। শাহেদ অসহায়ের মতো রেশমার দিকে তাকাল।

‘এখন ঘর থেকে বের হওয়ার দরকার নেই। রাতটা পার হোক। সকালে যা করবার করো।’ পরীর মাথার বালিশটা ঠিক করতে করতে বলল রেশমা।

এমন সময় কাছে কোথাও যেন ট্যাংকের গুলির প্রচণ্ড বিস্ফোরণ হলো। তার সাথে সাথেই আর্তচিৎকার আর মানুষের ছোটাছুটির শব্দ। শাহেদের মনে হলো তাদের বাসার সামনের যে গলিটা, সেখান দিয়েই মানুষগুলো দৌড়াচ্ছে।

সে আবার জানালার কাছে এগিয়ে গেল। এমন সময় বাইরে আবারো গুলিবর্ষণের শব্দ শুরু হলো, সেই সাথে ট্যাংকের গুলি। শব্দ একটু কমলেই মানুষের আহাজারি শোনা যায়; মনে হচ্ছে কোথাও আগুন লেগেছে!

কী করবে শাহেদ, ভেবে পাচ্ছে না। সে কি একবার বাইরে যাবে? কিন্তু, তার মেয়ে…

এই সময় রেশমা চিৎকার করে উঠল, ‘পরী, পরী, মা আমার! এই, তুমি এদিকে আস।’

শাহেদ দৌড়ে গিয়ে দেখল- পরীর মাথা বালিশ থেকে সরে গেছে। তার চোখগুলো বড় দেখাচ্ছে। সেই চোখে সে নিষ্প্রভভাবে তার মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে।

পরীকে এখন আর ফর্সা দেখা যাচ্ছে না, কেমন নীল দেখাচ্ছে!

শাহেদ একমুহূর্ত দ্বিধা না করে মেয়েকে কোলে নিয়ে দরজার দিকে পা বাড়াল।

রেশমা হাহাকার করে উঠল, ‘দোহাই তোমার। এখন না। বাইরে গোলাগুলি হচ্ছে। এই অবস্থায় তুমি কোথায় যাবে? কার কাছে যাবে?’

শাহেদ পরীকে কোলে নিয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। এমন সময় হঠাৎ পরী তার দুই হাত দিয়ে বাবার পিঠ খামচে ধরল।

পাঁচ.

রাত একটা ষোল। বাইরে তখনো গুলির শব্দ হচ্ছে।

এমনি এক সময়ে শাহেদ রেশমার হাত ধরে ঘর থেকে বের হলো।

অন্ধকার রাতে সে যখন পরীকে বুকে ধরে অনিশ্চিত পথে যাত্রা করল, তখন অনুভব করল একজোড়া কোমল হাত শক্ত করে তার গলা জড়িয়ে রেখেছে!

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj