সেলিম রেজার কবিতায় জমে থাকা আত্মবিশ্বাস

শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২০

বাংলার আকাশ-নদী, আলো-হাওয়া, দুপুরের ¤øান রোদ, ঘাসফুল, গোধূলীবেলা থেকে দূরে থাকা মানেই একটা নির্ঘুম রাত, ছুটে চলা বাস-ট্রেনের বিষণœ দুপুর অথবা শুকিয়ে যাওয়া সাদা ঠোঁটের মলিন মুখ মানেই প্রবাসজীবন। কাজ শেষে ঘরে ফেরা বেদনার্ত, করুণ রাত মানেই একটা প্রবাসজীবন। মনের খাঁচা বা স্বপ্নের বীজ নষ্ট হয়ে যাওয়া মানেই প্রবাসজীবন। পাওয়া না পাওয়ার বেদনায়, কষ্টের তীব্রতায় আর প্রিয়জনের বিশ্বাসহীনতায় এই প্রবাসজীবনে কতজন যে নিঃস্ব হয়ে যায়- প্রেম-ভালোবাসা আর শক্তি-সামর্থ্যে নিঃস্ব, অর্থে নিঃস্ব। নিঃস্ব আর নিঃস্ব। শুধু নিঃস্ব। প্রবাসজীবন মানেই একটা বেদনার দীর্ঘ নিঃশ্বাস। কষ্টের দিন। প্রবাস মানে এক অবিশ্বাসের জগত।

প্রবাসজীবনের একটা সময়ের পর পিতা-মাতা, ভাইবোন এমনকি স্ত্রীও বিশ্বাস করতে চায় না, তার স্বামী অহরহ একটা কষ্টের সমুদ্রে সাঁতার কাটছেন। তারা শুধু টাকা আর সুখ চান। টাকা চান। একটা জীবনকে বিসর্জন দেয়া মানেই প্রবাসজীবন। হতাশা আর হৃদয়ের তোলপাড়, সংগ্রামের জীবন। এটা আমরা অনেকেই বুঝতে চাই না। তবুও চলে যায় প্রবাসজীবন। আমাদের আজকের আলোচিত কবি সেলিম রেজাও পার করছেন একটা দীর্ঘ প্রবাসজীবন। তবে তার প্রবাস জীবনে এখন তেমন একটা নির্ঘুম রাত বা বিষণœ দুপুর নেই। নেই বেদনার দীর্ঘ নিঃশ্বাস বা কষ্টের কোনো দিন। তিনি তার প্রবাসজীবনকে অনেকটা গুছিয়ে এনেছেন। নিজের করে নিয়েছেন প্রবাসের আলো-হাওয়া, ঘাসফুল ও গোধূলীবেলাকে। তবে এ কথা সত্য, কখনো সখনো সেলিম রেজার ভেতরেও মোচড় দিয়ে ওঠে প্রবাসজীবনের কষ্ট। ব্যথার তীব্র নদী। তিনি ‘সবুজেঘেরা ধূসর স্মৃতি’ কবিতায় লিখে ফেলেন-

গাছগাছালি ঘেরা গ্রামের জলাশয়ে সাদা বক, কাতল-বোয়াল আর দেখা হয় না। বাড়ির পেছনে বাঁশবনে পাখিদের কিচিরমিচির, মাঝিদের বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ, বুভুক্ষু শেয়ালের ডাক আর শুনি না।…/ বিদেশ-বিভুঁইয়ে জীবনের বিচিত্র গতিময়তায় নিষ্ঠুর বাস্তবতা, ফেলে আসা স্বজনের স্মৃতি, কষ্টের সীমাহীন কষাঘাত যন্ত্রণা দেয়। অযাচিত দুঃখ জগদ্দল পাথরের মতো বুকে চেপে বসে, যান্ত্রিক সময়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফেরারী মন ছুটে চলে ধূসর স্মৃতির আবরণে ঢাকা কালো মাটি শ্যামলিমার বাংলায়।

কখনো হয়েছি নিংস্ব, তবুও করেছি সৃষ্টি

একাকী এখন ছোট্ট বারান্দায় দাঁড়িয়ে-

শুনি বোবাকান্না, শূন্য সংসারে

ক্লান্তি চুপি চুপি এসে দাঁড়ায় সামনে

উইপোকা খুঁটে খেয়েছে ভবিষ্যৎ

ঘাত-প্রতিঘাতে লুণ্ঠিত হৃদয়।

-সময়ের বিপরীত মেরুতে

কবিরা সময়ে কথা বলে। তারা তাদের সময়কে কালের অক্ষরে ধরে রাখেন। সমাজের যন্ত্রণা, রক্তের দাগ, ষড়যন্ত্র, আইনহীন পথ-ঘাট, বাগানবাড়ি, রেস্তোরাঁ- আমাদের সবগুলো সবুজ দেয়াল আজ ঘুণপোকার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। নির্লজ্জ দাপট অথবা ক্ষমতার আলোহীন অন্ধকার, মোহগ্রস্ততায় ভরে গেছে আমাদের এই সমাজ। আমরা এর প্রতিকার চাই। আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে চাই। কবিরাই একদিন মানসিক ও বিকারগ্রস্ত এই সমাজের মুখোশ উন্মোচন করবেন। কবি সেলিম রেজাও নষ্ট সমাজের মুখোশ উন্মোচন করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তার কবিতায় প্রেম-ভালোবাসার সাথে দ্রোহ ও সমাজ বিনির্মাণের গান আছে। বেদনা আছে। আছে স্বপ্নের ঝাঁপি খুলে তুলে আনা রঙিন স্বপ্ন- দীর্ঘ রাতের প্রহর শেষে তার কবিতায় উঠে আসে ভোরের নবাগত সূর্য। তিনি তার কবিতায় বলেন-

স্বপ্নের ডানায় উড়ে উড়ে যেতে ইচ্ছে করে

সুখের পৃথিবীতে…

… … … …

নিঃসীম একাকী পথে দাঁড়িয়ে থাকা

ল্যাম্পপোস্টের আলোকবর্তিকার মতো

যান্ত্রিক কোলাহল ছেড়ে আমিও

স্বপ্নের ঝাঁপি খুলে ঢুকে পড়ি

অনন্ত পিপাসায়; ব্যস্ততম নগরীর পথে।

-ব্যস্ততম নগরী

দুঃখ-ব্যথা ছাড়া মানুষ নেই। কবিদের ব্যথা থাকতেই হবে। কবিরা ব্যথার পিরামিড। ব্যথা একদিন অনন্ত পিপাসায়, ব্যস্ততম নগরীর পথে পথে নিয়ে কবিকে মস্ত বড় কবিতে পরিণত করে। ব্যথা নিয়ে বাংলার রাজ কবি, কবি আল মাহমুদের একটি উক্তি এ মুহ‚র্তে আমার বেশ মনে পড়ছে। তিনি বলছেন- আমি কি জানতাম প্রিয়তমার উচ্চারিত ‘প্রিয়তম’ শব্দের মানে হলে শুয়োরের বাচ্চা। সেলিম রেজারও ব্যথা আছে। তিনিও মাঝে মাঝে ব্যথায় কাতরান। গভীর রাতে ঘুম ভেঙে উঠে লিখে ফেলেন কবিতা-

হঠাৎ একদিন খাঁ খাঁ রৌদ্দুরে

পান্থপথে হলো দেখা

সেদিনের মতো আজো

ঠায় দাঁড়িয়ে…

আত্মবিশ্বাসী এক যুবক

আঁকা বাঁকা সুদীর্ঘ পথে যেন

নির্বিকার, উদ্বেগহীন এক প্রান্তবাসী।

-প্রান্তবাসী

… … … …

দীর্ঘকাল নির্বাসনের পর দিগন্ত পেরিয়ে

উন্মাদের মতো ছুটে আসা

কবিতার ভেজা ঠোঁট জোড়ায় আলতো চুমু

বাঁধ ভেঙে নেমে আসে চিবুকের দিকে।

… … … …

গভীর আশ্লেষে উবে যাওয়া ঘুমের কুয়াশা

কবিতা শুয়ে আছে স্বপ্ন সাম্পানে

আর আমি দাঁড় টানি স্বর্গীয় সুখে।

-ডিজায়ার ওয়ার্ল্ড

কবি সেলিম রেজার ‘স্বপ্ন মৃত্তিকায় নবীন ঘাসফুল’ বইটিতে বেশ কিছু বানান ও বাক্য বিভ্রাট রয়েছে। ব্যস্ততম নগরী কবিতার ‘মানুষেরা আমূল বদলায়’ বাক্যটি ‘মানুষের আমূল বদলায়’ হয়ে আছে। আছে ইদানীং, শরৎ, বুভুক্ষু, নীরবতাসহ আরো বেশ কয়েকটি ভুল বানান। বইটি পড়তে গিয়ে এ বানান বিভ্রাটের কষ্টে আমরা মর্মাহত হয়েছি। তাছাড়া সেলিম রেজার স্বপ্ন মৃত্তিকায় নবীন ঘাসফুল কবিতার বইটি আগাগোড়াই মুগ্ধতায় ভরা। প্রাজ্ঞতার মুন্সীয়ানা রয়েছে বইটির পরতে পরতে। খ্যাতিমান প্রচ্ছদশিল্পী ধ্রæব এষের প্রচ্ছদে নান্দনিকতার ছোঁয়া বেশ চমৎকার। মানুষকে বইটি কেনার জন্য আগ্রহ বাড়াবে। বইটির দামও আপনার হাতের নাগালে; তিন ফর্মার একটু বেশি বুক সাইজ এ বইটির দাম মাত্র ৮০ টাকা। আমরা বইটির বহুল প্রচার, প্রসার ও সমৃদ্ধি কামনা করছি। বইটি আপনার সংগ্রহকে সমৃদ্ধ করবে।

:: মৃধা আলাউদ্দিন

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj