গর্ভকালীন কোমর ব্যথার কারণ ও প্রতিকার : ডা. এম ইয়াছিন আলী

শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২০

গর্ভাবস্থায় কোমর ব্যথা একটি পরিচিত সমস্যা। অন্তঃসত্ত্বাদের কাছ থেকে প্রায়ই এ ধরনের সমস্যার কথা শোনা যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি চারজনে তিনজন নারী গর্ভাবস্থায় কোমর ব্যথা সমস্যায় ভুগে থাকেন। গর্ভাবস্থায় কোমরে ব্যথা হওয়ার কারণ ও প্রতিকার নিয়েই আজকের স্বাস্থ্য পরামর্শ।

কেন কোমর ব্যথা হয়?

গর্ভধারণের শুরু থেকেই শরীরের কিছু হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়। এর মধ্যে প্রজেস্টেরন এবং রিলাক্সিন হরমোন সন্তান জন্মদানের প্রস্তুতি হিসেবে কোমরের বিভিন্ন জয়েন্ট এবং লিগামেন্টকে নরম এবং ঢিলা করে দেয়। জয়েন্টের ভার বহন ক্ষমতা কমে যায় এবং হাঁটার সময়, অনেক বসে থাকলে, নিচে চেয়ার থেকে ওঠার সময় বা কোনো কিছু তোলার সময় ব্যথা অনুভূত হয়।

গর্ভাবস্থায় জরায়ু বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্তঃসত্ত্বার শরীরের ভর-কেন্দ্রও পরিবর্তিত হয় এবং পেটের পেশিগুলো স¤প্রসারিত ও দুর্বল হয়ে যায়। এর ফলে মায়ের চড়ংঁঃৎব আক্রান্ত হয় এবং পিঠের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে।

যেহেতু মায়ের শরীর এ সময় অতিরিক্ত ওজন বহন করে তাই এ সময় মায়ের শরীরের পেশি এবং জয়েন্টগুলোর ওপর চাপ বেশি থাকে। এই কারণে গর্ভাবস্থায় কোমর ব্যথা দেখা দিতে পারে।

মেয়েদের পেলভিসে একজোড়া লিগামেন্ট থাকে যা রাউন্ড লিগামেন্ট নামে পরিচিত। এগুলোর কাজ হলো জরায়ুকে সঠিক স্থানে ধরে রাখা। গর্ভধারণের পড়ে জরায়ুর আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ লিগামেন্টগুলো রাবার ব্যান্ডের মতো প্রসারিত হয় এবং পাতলা হয়ে যায়। এ ধরনের ব্যথাকে রাউন্ড লিগামেন্ট পেইন বলে। বিছানা বা চেয়ার থেকে ওঠার সময়, কাশি দেয়ার সময় বা বিছানায় নড়াচড়া করার সময়ও এ ব্যথা হতে পারে। রাউন্ড লিগামেন্ট পেইনের কারণে শারীরিক ধকল গেলেও চাপা ব্যথা অনুভূত হতে পারে।

গর্ভাবস্থায় কোমরে ব্যথা হওয়ার আরেকটি কারণ হতে পারে সায়াটিক নার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ। গর্ভাবস্থায় বড় হয়ে যাওয়া জরায়ুর চাপ যখন শরীরের দুটি সায়াটিক নার্ভের উপর পড়ে তখন কোমরে, নিতম্বে বা উরুতে ব্যথা হতে পারে। এ ধরনের ব্যথাকে বলে সায়াটিকা। এ ধরনের ব্যথা সাধারণত কোমর বা কোমরের উপরে পিঠের মাঝ বরাবর হয়। এ ব্যথা কখনো কখনো পায়ের দিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে বলে মনে হয়। কিছু কিছু কারণে এ ব্যথা বেড়ে যেতে পারে। যেমন- একটানা অনেকক্ষণ বসে থাকলে বা দাঁড়িয়ে থাকলে বা ভারী কিছু উঠালে। রাতের দিকে এ ধরনের ব্যথা বেশি অনুভূত হয়। গর্ভাবস্থায় সায়াটিকার হওয়া স্বাভাবিক।

যা করবেন

গর্ভাবস্থায় কোমর ব্যথা দূর করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ব্যায়াম। ব্যায়াম নিজের পেশিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি শরীরের সর্বস্তরের সুস্থতা খুব সহজেই শিশুকে বহন করার শক্তি জোগায়। তখন ওজন বৃদ্ধির পরও আপনি খুব সহজেই এবং আরামে শিশুকে বহন করতে পারবেন। গর্ভবতী মহিলাদের জন্য শ্রেষ্ঠ ব্যায়াম হলো হাঁটা, সাঁতার কাটা এবং আসতে আসতে সাইকেল চালান। আপনি আপনার ডাক্তারের সঙ্গে আলোচনা করে আপনার জন্য যে ব্যায়ামটি ভালো হয়, সে ব্যায়ামটি করা শুরু করেন।

গর্ভাবস্থায় স্ট্রেচিং ব্যায়াম করলে স্বস্তি মিলতে পারে। তবে খেয়াল রাখতে হবে যাতে এ ধরনের ব্যায়াম করার সময় তা দ্রুত করা না হয় বা স্ট্রেচিং বেশি করা না হয়। এর ফলে হিতে বিপরীত হতে পারে।

আপনার ব্যথার স্থানে গরম ও ঠাণ্ডা সেঁক দিতে পারেন। এতে আপনি কিছু সময়ের জন্য ব্যথা থেকে পরিত্রাণ পাবেন। তবে অবশ্যই আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিবেন। প্রথমে দুই-তিনদিন আপনার ব্যথাযুক্ত স্থানে ২০ মিনিট করে ঠাণ্ডা কম্প্রেস প্রদান করুন। এরপরে, আবার কয়েকদিন একই স্থানে গরম কম্প্রেস প্রদান করুন। কিন্তু, খেয়াল রাখবেন, গর্ভাবস্থায় কখনো পেটে ঠাণ্ডা বা গরম কম্প্রেস করবেন না।

গর্ভবতী অবস্থায় মেরুদণ্ডের ওপর বেশি চাপ পড়ে এবং অতিরিক্ত ওজন বহন করতে হয়। তাই, আপনি যখন বসে বসে কাজ করবেন, তখন সঙ্গে একটি ছোট তোয়ালে বহন করুন এবং তা আপনার ব্যথার স্থানে লাগিয়ে রাখুন। যতক্ষণ বসে থাকবেন, সোজা হয়ে বসে থাকার চেষ্টা করুন। এতে আপনার ভালো চড়ংঃঁৎব বজায় থাকবে, যা আপনার ব্যথা উপশম করতে কাজে দিবে।

সোজা হয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করুন। গর্ভবতী মায়েরা সাধারণত ঝুঁকে থাকেন। এতে মেরুদণ্ডের ওপর আরো চাপ পড়ে। বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে না থাকার চেষ্টা করুন। দাঁড়িয়ে থাকতে হলে কিছুক্ষণ পর পর বসে বিশ্রাম নিন।

গর্ভাবস্থায় ভারী জিনিস উঠানো উচিত নয়। যদি নিচ থেকে কোনো জিনিস তুলতে হয় তবে ঝুঁকে না তুলে আগে হাঁটু ভেঙে বসে তারপর তুলুন। বাজারের ব্যাগ বা কিছু বহন করতে হলে দুহাতে সমান ভর নেয়ার চেষ্টা করুন।

আপনি কীভাবে ঘুমাচ্ছেন তার ওপর নির্ভর করে আপনার মেরুদণ্ডের উপর চাপ পড়তে পারে এবং কোমর ব্যথা হতে পারে। গর্ভাবস্থায় বাম পাশ ফিরে শোয়ার চেষ্টা করুন। এতে আপনার মেরুদণ্ডের উপর চাপ যেমন কমবে তেমনি শরীরে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে না। এছাড়া ঘুমানোর সময় দুপায়ের মাঝখানে বালিশ ব্যবহার করতে পারেন যাতে উপরের পায়ের ভর বালিশের উপর পড়ে। পেটের নিচে বালিশ ব্যবহার করতে পারেন বা পিঠের দিকে বালিশ দিয়ে সাপোর্ট দিতে পারেন।

কনসালটেন্ড ও বিভাগীয় প্রধান – ফিজিওথেরাপি বিভাগ

প্রো-অ্যাকটিভ মেডিকের কলেজ ও হাসপাতাল,

ঢাকা।

পরামর্শ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj