পুরুষতন্ত্রবিরোধী মানুষের উদযাপনের দিন ৮ মার্চ

সোমবার, ৯ মার্চ ২০২০

সেবিকা দেবনাথ

৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস। বিশে^র অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও সরকার, বিভিন্ন নারী সংগঠন, মানবাধিকার সংগঠন এবং উন্নয়ন সংগঠনগুলো নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করে। কিন্তু নারী দিবসের মূল বার্তাটা কি আমরা সবার কাছে পৌঁছাতে পেরেছি? এখনো উচ্চ পর্যায়ে আসীন অনেক পুরুষের মুখে শুনি, ‘তাহলে কি বাকি ৩৬৪ দিন পুরুষের?’, ‘যদি সমান সুযোগই চায় তাহলে আলাদা করে দিবস কেন?’ অনেক নারী মনে করেন, এসব দিবস নারীদের আরো হেয় করছে। অনেকে মনে করেন, নারীদের দুর্বল ভেবে তাদের মূল্যায়িত করার জন্যই দিবসটি পালিত হয়।

আমরা ধরেই নেই, সমাজের শিক্ষাবঞ্চিত পিছিয়ে পড়া পরিবারেই বোধ হয় নারীদের বৈষম্যের মাত্রা বেশি। তথাকথিত শিক্ষিত এবং আধুনিক পরিবারে নারীরা আছেন মর্যাদা নিয়ে। আসলে তা নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া পরিবারের নারীরা যা পারে তা ওই তথাকথিত শিক্ষিত ও আধুনিক পরিবারের নারীরা পারে না। কেননা জাতিসংঘ সনদসহ কাগজে কলমে বিশ্ব নারীদের অধিকারের কথা স্বীকৃত হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। উন্নত বিশ্বে নারীরা শিক্ষায় কর্মে ও উদ্দীপনায় পুরুষের পাশাপাশি অবস্থান করলে তাকেও তার কর্মক্ষেত্রে এবং সমাজ জীবনে কমবেশি নির্যাতিত হতে হচ্ছে। তৃতীয় বিশ্বে শিক্ষায় ও কর্মক্ষেত্রে নারীরা পিছিয়ে থাকার কারণে সর্বোপরি ধর্মীয় সংস্কার ও সামাজিক নিষ্পেষণের জাঁতাকলে পড়ে নারী যেমন তার প্রাপ্য অধিকার পাচ্ছে না, তেমনি নির্যাতিত, নিগৃহীত হচ্ছে নানাভাবে।

চলতি বছরের ৫ মার্চ ‘জেন্ডার সোশ্যাল নর্ম’ সূচক প্রকাশ করে জাতিসংঘ। বিবিসি অনলাইনে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারীর প্রতি বিশ্বের ৯০ শতাংশ নারী-পুরুষেরই নেতিবাচক মনোভাব রয়েছে। অর্থাৎ ১০০ জনের মধ্যে ৯০ জনই নারীর প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। বিশ্বব্যাপী ৫০ শতাংশ পুরুষ মনে করেন চাকরির ক্ষেত্রে নারীর চেয়ে তাদের অধিকার বেশি। জরিপে অংশ নেয়া প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ মনে করেন, পুরুষ যদি তাদের নারী সঙ্গীকে আঘাত করেন, তা গ্রহণযোগ্য। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্বের কোনো দেশেই লিঙ্গসমতা নেই। বিশ্বের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারী-পুরুষ বৈষম্য বিদ্যমান। রাজনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতি খাতে নারীর অংশগ্রহণ এখনো সুপ্রতিষ্ঠিত নয়।

একই দিনে প্রকাশিত ইউনিসেফ, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল ও ইউএন উইমেনের এক প্রতিবেদনেও এমন চিত্র উঠে এসেছে। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিক্ষা, পুষ্টি, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর ক্ষেত্রে অগ্রগতি সত্ত্বেও বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও ধর্ষণ, যৌন নির্যাতনসহ সহিংসতার শিকার হয় নারী ও মেয়ে শিশুরা। বাংলাদেশে ১৫-৪৯ বছর বয়সী প্রতি চারজন নারীর একজন (২৫ দশমিক ৪ শতাংশ) স্বামীর দ্বারা স্ত্রীকে প্রহার করা ন্যায়সঙ্গত বলে মনে করেন।

পরিবার থেকে কর্মক্ষেত্র সবক্ষেত্রই যেন নারীর জন্য রণাঙ্গন। নারীকে যত বাধা পেরিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে হয় পুরুষের ক্ষেত্রে ততটা নয়। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমাদের পুরুষ শাসিত সমাজ নারীকে দেখে নারী হিসেবে।

এও ঠিক, দিবসের প্রকৃত বার্তাটিকে আড়াল করে নারী দিবস এখন ‘উৎসবে’ পরিণত হয়েছে। আর একে কেন্দ্র করে পুঁজিবাদী সমাজ তার বাণিজ্য করে নিচ্ছে। এ সত্য এখনো সমাজের অধিকাংশ মানুষের কাছে পৌঁছায়নি যে, নারীবাদ মানে নারীর সঙ্গে পুরুষের যুদ্ধ নয়। সমাজে বিদ্যমান অচলায়তন, পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে মুক্তচিন্তাই হলো নারীবাদ। নারীর মাঝেও আছে পুরুষতান্ত্রিকতা। নারীবাদ নারী-পুরুষ উভয়কেই পিতৃতন্ত্রের নাগপাশ থেকে মুক্তি দিতে চায়। নারী দিবস শুধু নারীর দিন নয়, সব পুরুষতন্ত্রবিরোধী মানুষের উদযাপনের দিন।

আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রেক্ষাপট প্রসঙ্গে একটু বলা দরকার। ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ এই দিনটির শুরু। সে সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে একটি সুচ কারখানার নারী শ্রমিকরা দৈনিক শ্রম ১২ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ৮ ঘণ্টায় আনা, ন্যায্য মজুরি এবং কর্মক্ষেত্রে সুস্থ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন। আন্দোলন করার অপরাধে গ্রেপ্তার হন বহু নারী। কারাগারে নির্যাতিত হন অনেকেই। তিন বছর পর ১৮৬০ সালের একই দিনে গঠন করা হয় ‘নারী শ্রমিক ইউনিয়ন’। ১৯০৮ সালে পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের কারখানার প্রায় দেড় হাজার নারী শ্রমিক একই দাবিতে আন্দোলন করেন। অবশেষে আদায় করে নেন দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ করার অধিকার। ১৯১০ সালের এই দিনে ডেনমাকের্র কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সম্মেলনে জার্মানির নেত্রী ক্লারা জেটকিন ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপর থেকেই সারা বিশ্বে দিবসটি আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

জাতিসংঘ ১৯৭৫ সালে আন্তর্জাতিক নারীবর্ষে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করা শুরু করে। ১৯৭৭ সালে জাতিসংঘ দিনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj