উৎসবটি নারীর জন্য…

রবিবার, ৮ মার্চ ২০২০

শান্তা তাওহিদা

চেয়ারপার্সন, কমিউনিকেশন ডিজওর্ডারস বিভাগ

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়

পুরুষদের সব ক্ষমতা নাকি লুকিয়ে থাকে তার টাই বা গলা বন্ধনীর ভেতর …কী অবাক হলেন শুনে? অবাক হওয়ার মতোই বিষয় এটি। গল্পের কিন্তু এখানেই শেষ না, এ তো গল্পের শুরু। পুরুষদের ক্ষমতাহীন করতে নারীরা কী করে শুনলে আরো মজা পাবেন। নারীরা তার নিজ পুরুষের সে টাইকে কাঁচি দিয়ে কেটে ফেলেন। যার অর্থ হলো, ‘প্রাণের রাজা এবার তুমি ক্ষমতাহীন। তোমার রানী এখন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।’… সেই রানীকে খুশি করতে রাজ্যহীন রাজারা রানীর ঠোঁটে চুম্বন করেন তখন। তারপর রাজা রানী সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে থাকেন! এটি গল্প নয়, জার্মানিতে এভাবেই পালিত হয় নারীদের উৎসবের দিন। বাংলাদেশে ৮ মার্চ হলেও ২০ ফেব্রুয়ারি জার্মানির রাইনল্যান্ড স্টেটে উদযাপিত হলো নারী দিবস। ঠিক দিবস বললে ভুল বলা হবে, নারীদের উৎসবের দিন ছিল সে দিন। এ দিন ঘরের কাজ, ছেলেমেয়ের দেখাশুনাসহ সব কিছু করে থাকেন নারীদের বরেরা।

এখানে বলে রাখা ভালো যে, ইউরোপে বিশেষত জার্মানিতে, ঘরের কাজ কেবল মেয়েদের কাজ- এ ধারণার কিন্তু চল নেই। বরং রান্না, কাপড় ধোয়া, ঘর ঝাড়া মোছা, বাগান করা, সন্তানদের দেখাশোনা এখানে নারী-পুরুষ উভয়ের কাজ। প্রথাগতভাবে, ঘরের কাজ বাইরের কাজ কার কোন কাজ? সেই ধারণাও এখানে অচল।

তাহলে মনে প্রশ্ন আসতেই পারে, আলাদা করে নারীর জন্য উৎসবের দিনের কী দরকার? নারীদের উৎসবের এই ধারণার সূত্রপাত মধ্যযুগে। তখন পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীরা স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশ করতে পারত না। নির্বাচনে ভোট প্রদান তো আরো বহু পরের ধারণা। খোদ ইউরোপেও নারীদের নানানভাবে নির্যাতন করা হতো। ইসলামের আইয়ামে জাহেলিয়াতের যুগের মতোই ইউরোপের মধ্যযুগকে তুলনা করেন কেউ কেউ।

ধীরে ধীরে ইউরোপীয় সমাজ বিশেষত জার্মানিতে নারীর কর্মের প্রতি গুরুত্ব ও পরিবারে সমাজে তার অবদান মূল্যায়ন পেতে শুরু করে। একটি নিষ্ঠুর সত্য হলো, জার্মানিকে দুই দুটি বিশ্বযুদ্ধের জন্য দায়ী করা হয়। দুটি বিশ্বযুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি অপরিসীম ছিল সেই সময়। বিশেষ যার নেতৃত্বে এই যুদ্ধ হয় তাকে জার্মানরা এখনো ঘৃণা করে এবং প্রকাশ্যে তার নাম পর্যন্ত নেন না। জার্মানিতে গত কয়েক দশক ধরে নারীর ক্ষমতায়নের পেছনকার ইতিহাস এর সঙ্গে বেশ সম্পর্কিত। আজকের আধুনিক ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ উন্নত জার্মান দেশকে গড়ে তুলেছে কারা জানেন? এ কেবল জার্মান নারীদের অবদান।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মান নারীদের মধ্যে এক ধরনের পুরুষবিদ্বেষী ধারণার জন্ম নেয়। সে রকম ভাবা সেই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে যে একেবারেই অমূলক ছিল তা নয়। বহুদিন পর্যন্ত পুরুষদের জার্মান নারীরা দায়ী করত যুদ্ধের জান-মাল ক্ষয়ক্ষতির কারণ হিসেবে।

পুরুষের কাজই হলো যুদ্ধ করা, নারী-শিশু হত্যা, গৃহহীন করা, খাবার সংকট তৈরি অসহায়ত্ব এসব কিছুর জন্য পুরুষদের বাদ রেখেই নারীরা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে ঠিকঠাক করার গুরুদায়িত্ব। সেই দায়িত্ব তারা কতখানি পালন করেছেন এবং করে চলেছেন তার প্রমাণ চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মারকেল।

এই হলো জার্মানিতে অনুষ্ঠিত নারীর জন্য উৎসবের খানিকটা পটভূমি।

সুতরাং বুঝাই যাচ্ছে যে, এটি প্রথাগত একটি দিন, যে দিন নারীদের ওপর সমস্ত ক্ষমতা অর্পণ করা হয়। তবে এই ক্ষমতা বদলটা নারী অধিকার কিংবা নারীর ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠার নয়। এই ক্ষমতা বদলখানি একরকম মর্যাদা বা সম্মান প্রদর্শন বলা যায়।

সমাজে নারীর অবদানের স্বীকৃতি দিয়ে প্রতীকী এই উৎসব উদযাপনের ধরন-বরণ বেশ মজার।

রাইনল্যান্ডের নারীরা এ দিন বিভিন্ন রকম মুখোশ ও বর্ণিল পোশাকে সাজে। একসময় তারা বুড়ো ও কুৎসিত সাজে সাজত। কিন্তু কালের বিবর্তনে এখন তারা বয়স নির্বিশেষে সবাই ১৯ শতকের নারীদের মতো করে সাজে।

১৮ শতক থেকেই জার্মানির কোলনে বেশ জাঁকজমকের সঙ্গে এই উৎসব পালিত হয়। রাইনল্যান্ড রাজ্যে নারীদের উৎসবের এ দিন নারীদের জন্য এক প্রকার অঘোষিত ছুটি। দুপুরের পর থেকে কেউ আর অফিসে কোনো কাজ করেন না। বেলা ১১.১১ এর দিকেই সবাই সেজেগুজে বের হয়ে পড়েন। একেক জায়গায় উদযাপনের ধরনটা একেক রকম। কোথাও কোথাও নাচ-গানের বড় কনসার্ট হয়। কোনো কোনো শহরে প্যারেডও অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে নারী-পুরুষ সবাই মিলে আনন্দে মেতে ওঠেন।

রাইনল্যান্ড রাজ্যে এই উৎসবের একটা আলাদা ঐতিহ্য রয়েছে। ওয়াইনের জন্য রাইনল্যান্ড রাজ্যে হলো বিশ্বসেরা। অনেক পর্যটক একে তাই ওয়াইনল্যান্ড বলেও চিনে থাকেন। নারীদের উৎসবের দিনে এখানে শহরের কেন্দ্রের কোনো খোলা জায়গায় সব নারী জড়ো হন। সেখানে পুরুষরা তাদের বোতল থেকে ওয়াইন ঢেলে দেন। এবং সবাই মিলে একসঙ্গে ওয়াইন পান করেন।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো এখানে নারীদের অধিকার আদায়, নারীর ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠার জন্য এখানে সভা, সমিতি, আন্দোলন হয় না। এই নারী দিবস একেবারেই নারীর জন্য পুরুষদের অংশগ্রহণে নারীর প্রতি ভালোবাসা আর সম্মান প্রদর্শনের উৎসব।

এ দিন পুরুষরা স্ত্রীদের সুন্দর সুন্দর উপহারও দেন।

২০ শতকের দিকে এই উৎসবের সঙ্গে যুক্ত হয় আরো একটি মজার বিষয়। নারীরা বিশাল বড় বড় কাঁচি হাতে সারিবদ্ধভাবে অপেক্ষা করেন তার নিজ পুরুষটির জন্য। সেই পুরুষকে আবার অবশ্যই টাই বা গলা বন্ধনী পরে আসা বাধ্যতামূলক। এই টাইকে ধরে নেয়া হয় পুরুষদের প্রতীকী ক্ষমতা হিসেবে। নারীরা সে টাইকে কাঁচি দিয়ে কেটে দেন। যার অর্থ হলো, ‘ প্রাণের রাজা এবার তুমি ক্ষমতাহীন। তোমার রানী এখন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।’ সেই রানীকে খুশি করতে রাজ্যহীন রাজারা রানীর ঠোঁটে চুম্বন করেন তখন।

এভাবেই জার্মানিতে পালিত হয় নারীদের উৎসব বা উইমেন কার্নিভাল বা জার্মান ভাষায় ভেইবারফাস্টনাখট। তবে কোন তারিখে এই দিবসটি পালিত হবে তার সঙ্গে খ্রিস্টীয় ধর্মের দিন তারিখের সম্পর্ক রয়েছে। বলা হয়ে থাকে ইস্টার সানডের ৫২ দিন আগে পালিত হয় নারীর জন্য এই উৎসবটি। সেই হিসাবে গতবছর এই উৎসবটি পালিত হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি। তবে ২০২০-এ এই উৎসব পালিত হয়েছে ২০ ফেব্রুয়ারি।

নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন, কৃতজ্ঞতা আর ভালোবাসা জানানোর এই নারী উৎসব ছড়িয়ে পড়–ক সারা বিশে^।

ফ্যাশন (ট্যাবলয়েড)'র আরও সংবাদ

নারীর প্রিয় বাহন স্কুটিগত এক দশকে প্রজন্মের বাহন হিসেবে মোটর সাইকেলের জনপ্রিয়তা বেড়েছে কয়েক গুণ। চলতি পথে কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো ও গতিময়তার সম্মিলনে প্রিয় বাহন হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে মোটর সাইকেল। বর্তমানে কোথাও যেতে হলে পোহাতে হয় যানজটের ঝক্কি, তার ওপর সময়মতো গাড়ি পাওয়া যায় না, আর পেলেও প্রায়ই গুনতে হয় ডাবল ভাড়া। ফলে অফিস কিংবা গন্তব্যে যেতে প্রায়ই দেরি হয়ে যায়, পোহাতে হয় সীমাহীন দুর্ভোগ। এ সব ঝামেলা থেকে মুক্তি পেতে নিজের একটি বাহন এখন বেশ দরকারি। তাই পুরুষের পাশাপাশি আধুনিক অনেক নারীরই বাহন হিসেবে বেছে নিচ্ছেন পছন্দসই একটি মোটর সাইকেল। এ ক্ষেত্রে স্কুটিই এখন অনেক নারীর প্রথম পছন্দ-

Bhorerkagoj