কিছু রাত জেগে থাকার

শনিবার, ৭ মার্চ ২০২০

জেলী আক্তার

খাবার টেবিলটা সুন্দর করে সাজিয়ে রাখা। কোনো বাটিতে ইলিশ মাছের পেটি, কোনো বাটিতে গরুর মাংস ভুনা, কোনোটায় খাসির কলিজা- বড় বড় চিংড়ি মাছ, কোনোটায় আবার বাদাম ভর্তা কিংবা কালিজিরা ভর্তা। আসলে কালিজিরা ভর্তা পছন্দের না হলেও কেন জানি তালিকা থেকে বাদ দিতে পারি না।

মায়ের হাতে তৈরি এসব খাবার অর্ণব ভাই নিয়ে এসেছে। বড় চাচার একমাত্র ছেলে অর্ণব ভাই। আমার থেকে প্রায় বছর পনের বড় হবে। খুব মিশুক মানুষ। কবি কবি একটা ভাব আছে।

যাই হোক, একে একে সব খাবার দেখে নিয়ে খেতে বসলাম। সামনে আরেকটা চেয়ার আছে, কেউ মুখোমুখি বসলে গল্প জমত।

খুব শীত পড়ছে। কনকনে হাওয়াও বইছে। বাইরে তাকিয়ে কাউকে দেখা যায় না, এত কুয়াশা।

বাড়ির দুজন বুয়া দুজনই ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু আরেকজন জেগে আছে। মাঝে মধ্যে ব্যতিক্রম ছাড়া ১২ টাকার পেন্সিল ব্যাটারিতে সে দিব্যি জেগে থাকে, সচল থাকে! আসলে দেয়ালে টাঙানো ঘড়িটার কথা বলছি।

আমার গায়ে ধূসর রঙের একটা চাদর মোড়ানো। কপালে একটা টিপ। চাদরটা মাথায় দেয়া হয়নি। মাথায় দিলেই কানের পাশ দিয়ে কেমন যেন ট্রেন চলার শব্দ, ঝিঁঝি পোকা ডাকার শব্দ পাই। মা বলত, শরীর দুর্বল হলে নাকি এমন হয়।

খেতে বসে প্লেট ভর্তি করে সব নিলাম। এরপর থেকে শুধু নাড়াচাড়া করছি, কিন্তু খেতে পারছি না। মনের মধ্যে একটা অস্থিরতা চলছে। মাথা তুলতেই দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল দেয়ালে লাগানো সেই ওয়ালমেট। একটা দামি কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছিল খুব যতেœ। কোনো কারণে কাপড়টা সরে গেছে।

একটা রাতের দৃশ্য। আজ থেকে ৭ বছর আগের। সালটা খুব স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে না। শুধু নামটাই বিশ্রী সৌন্দর্য নিয়ে জেগে আছে। যাকে ৭ বছর ধরে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা চলছে।

হাত ধুয়ে চলে গেলাম ছাদে। বাঁশ বাগান নেই, তাই জোনাক পোকা দেখা অবিশ্বাস্য ব্যাপার। কিন্তু শহরের বিষাক্ত বাতাস, আর সোডিয়াম লাইটের আলো ভীষণ সস্তা। এখানে ভুলে যাওয়া মানুষগুলো মাঝে মাঝে ভাবনায় এসে কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিতে প্রস্তুত।

পেছন থেকে কে যেন বললো- জীবনের প্রয়োজনে বদল জরুরি, বদলে যাওয়া মানুষদের সঙ্গে চললে বদল জরুরি।

পেছন ফিরে দেখি অর্ণব ভাই।

– সবাই কি বদলে যেতে পারে?

– কেন কত কী বদল হচ্ছে। চুলো বদল, চাল বদল, ঘর বদল, বাড়ি বদল, অভ্যেস বদল, অভিযোগ বদল, আরো কত কি?

– মন বদল করলে সেটা কি আর বদল করা যায়?

– প্রয়োজনে সব মানিয়ে নিতে হয়। আর প্রতারকদের এড়িয়ে যেতে হয়।

– নাহ্ অর্ণব ভাই, ও প্রতারক নয়।

– যে ছেলে ৭ বছরের প্রেমকে পরিবারের অযুহাত দেখিয়ে ফেলে যেতে পারে, সে তো প্রতারক ছাড়া আর কোনো পরিচয় পেতে পারে না।

– শোনো নিতি, জীবন বদলে যায় জীবনের প্রয়োজনে। কে কবে বেসেছিল ভালো, নাই বা রাখলে মনে। চলো ঘুমাতে চলো।

– নাহ্ তুমি যাও।

জীবনে কিছু রাত ঘুমিয়ে কাটানোর, কিছু রাত গল্প গুজবের, কিছু রাত বেদনার আর কিছু রাত জেগে থাকার।

:: উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগ,

কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj