সমস্যার আবর্তে পোশাক শিল্পের অদ্বিতীয়ারা : সারথী ভৌমিক

সোমবার, ২ মার্চ ২০২০

কৃষিনির্ভরতা থেকে দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে তৈরি পোশাক শিল্প। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর-২০১৯ সালের তথ্যানুযায়ী রপ্তানি আয়ের ৮৪ দশমিক ২১ শতাংশ আসে এ খাত থেকে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফেকচারার এন্ড এক্সপোটার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) (২০১৮-১৯ অর্থবছর) তথ্যানুযায়ী দেশে মোট জাতীয় উৎপাদনের (জিডিপি) ১১ দশমিক ৭ শতাংশ আসে এ খাত থেকে।

আশির দশকে এ শিল্পের গোড়াপত্তন হয়েছিল নারী শ্রমিকদের হাতেই। তবে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি শিক্ষার অভাবে কাজ হারিয়ে কর্মস্থল থেকে ছিটকে পড়ছেন অনেক নারী শ্রমিক। ২০১৯ সালে তৈরি পোশাক কারখানা নিয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৫ সালে পোশাক শিল্পে নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ ছিল ৬৪ শতাংশ। এখন কমে দাঁড়িয়েছে ৬০ দশমিক ৮ শতাংশ। কারখানায় যন্ত্রনির্ভশীলতা বাড়ার কারণে এ খাতে নারী শ্রমিক কমছে। এখানেই শেষ নয়, সিপিডির ওই প্রতিবেদন বলছে, মজুরির দিক দিয়েও এই শিল্পে নারী পুরুষের বৈষম্য রয়েছে। নারীর তুলনায় পুরুষ কর্মীরা ৩ শতাংশের বেশি মজুরি পাচ্ছেন। পুরুষ শ্রমিকের গড় মজুরি ৭ হাজার ২৭০ টাকা আর নারী শ্রমিকের মজুরি ৭ হাজার ৫৮ টাকা।

শুধু মজুরি বৈষম্যই নয় এই শিল্পে জড়িত নারী শ্রমিকরা পিছিয়ে আছে পুষ্টির ক্ষেত্রেও। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে আইসিডিডিআরবির বরাত দিয়ে জানানো হয়, সচেতনতার অভাব, খাদ্যের গুণাগুণ সম্পর্কে জ্ঞানের স্বল্পতা এবং সীমিত আয়ের কারণে এই শিল্পে নিয়োজিত অধিকাংশ শ্রমিক পুষ্টিকর খাবার থেকে বঞ্চিত। বিশেষত নারী শ্রমিকদের মধ্যে প্রায় ৪৩ শতাংশই দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টির শিকার। এদিকে ইন্টারন্যাশনাল লেবার অফিসের (আইএলও) ২০১৪ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, অপর্যাপ্ত পুষ্টির কারণে পোশাক খাতের শ্রমিকদের ২০ শতাংশ উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে।

২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ইমপ্রæভড নিউট্রিশনের (জিএআইএন) এক গবেষণায়, তৈরি পোশাক খাতে নিযুক্ত প্রতি ১০ জন নারী শ্রমিকের ৮ জনই রক্তস্বল্পতায় ভোগেন। অধিকাংশ নারী শ্রমিকের বয়স ২৩ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। তাদের প্রায় ৮০ শতাংশই বিবাহিত।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো নাজনীন আহমেদ জানান, বড় কারখানাগুলোতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার কারণে নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ কমছেন। কেননা নারীরা প্রযুক্তিতে সহজে নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারে না। এছাড়া নারী শ্রমিকদের শিক্ষার হারও কম।

নারী শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্য ও অপুষ্টিতে ভোগার প্রসঙ্গে শ্রমিক নেত্রী নাজমা আক্তার মনে করেন, পোশাক শ্রমিকরা এখন যে মজুরি পান, তা দিয়ে তারা এবং তাদের সন্তানদের পুষ্টিকর খাবার খাওয়া সম্ভব নয়। তাই নারী শ্রমিকদের রক্তশূন্যতা খুবই স্বাভাবিক বিষয়।

তিনি বলেন, দেশে চালের দাম কমলেও কয়েকগুণ বেড়ে গেছে সব ধরনের পুষ্টিকর খাবারের দাম। ফলে স্বল্প আয়ের মানুষদের পক্ষে এসব খাবার কেনা সম্ভব হয় না। বাধ্য হয়েই তারা ভাতের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

এত কিছুর পরও দেশে এ শিল্পে নিয়োজিত নারী শ্রমিকরা থেমে নেই। নিত্যদিনের পুষ্টিহীনতা, রক্তস্বল্পতাসহ শারীরিক, মানসিক, অর্থনৈতিক নির্যাতনকে মাড়িয়েই তারা শ্রম দিয়ে চলেছেন। তারা নিজেরাই হয়তো জানেন না, তাদের কাঁধেই দেশের অর্থনীতির চাকা। তাদের ঝরা ঘামেই আজ এই শিল্প বিশ^ দরবারে তুলে ধরছে বাংলাদেশের পরিচিতি।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj