নারী সহকর্মীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি : কাঞ্চন রানী দত্ত

সোমবার, ২ মার্চ ২০২০

এক.

মৌমিতা সরকারি দায়িত্ব শেষে ঢাকার বাইরে থেকে ঢাকায় ফিরছিল। রাস্তায় প্রচণ্ড যানজট থাকায় হঠাৎ রুট পাল্টানোর চিন্তায় গাড়িচালক রাস্তা বদল করতে গিয়ে সামান্য ভুল রুটে গাড়ি ঢুকিয়ে দিল। সামনেই ছিলেন ট্রাফিক কর্মী। গাড়ির কাগজপত্র নিয়ে মামলা দেয়ার প্রস্তুতি। মৌমিতা বারবার ভুল স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করল। ‘আমিও আপনার ন্যায় সরকারি দায়িত্ব পালন শেষে সরকারি পরিবহনে ফিরছি, এটা ইচ্ছাকৃত ভুল নয়।’ ট্রাফিক কর্মী কোনোভাবেই বিশ্বাস করলেন না। মৌমিতা উপায়ান্তর না পেয়ে অফিসের একজন জুনিয়র পুরুষ সহকর্মীকে ফোনে বিষয়টি জানিয়ে ট্রাফিক কর্মীকে ফোনটা এগিয়ে দিল।

‘জি স্যার, জি স্যার, কোনো সমস্যা নেই’ জুনিয়র সহকর্মীর কথায় বিশ্বাস করে মৌমিতা ছাড়া পেল। ট্রাফিক কর্মী নারী কর্মকর্তাকে বিশ^াস করলেন না, কিন্তু পুরুষ সহকর্মীর ফোন পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে জি স্যার।

দুই.

নিশিতার সর্বোচ্চ বস ম্যাডাম। মধ্যম পর্যায়ের বস স্যার। মধ্যম পর্যায়ের বসকে প্রায়ই বলতে শোনা যায় ওপর-নিচ সবই ম্যাডামদের দখলে। ঠিক সম্পূর্ণ ইতিবাচক ইঙ্গিত নয় এটি, কিছুটা ঈর্ষান্বিত। কিছুটা উপহাসের আভাস।

নারীদের ভালো অবস্থানে থাকাটা অনেক পুরুষ সহকর্মী মেনে নিতে পারেন না। সুযোগ পেলেই দু-চারটা কটু কথা অন্তরালে থেকে হলেও বলে থাকেন। কেন যেন এখানে সব উদারতা শেষ হয়ে আসে। অফিসে নারীরা কম কাজ করে, বাসা নিয়ে সব সময় ব্যস্ত থাকে- এমন মন্তব্য তো অহরহ শোনা যায়। নারীরা অফিস সামলিয়েই বাসার দায়িত্ব পালন করে। অফিসকে এর জন্য কোনো ভুক্তভোগী হতে হয় না বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই।

‘নারীরা বস হিসেবে ভালো হয় না, তাদের অধীনে কাজ করা কঠিন, তারা দক্ষ নয়। দক্ষ-অদক্ষ তো পুরুষ-নারী উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আসলে পুরুষ সহকর্মী অনেক ক্ষেত্রেই নারী বসকে মেনে নিতে পারেন না। এই হীন মানসিকতা আড়াল করতেই দক্ষতা-অদক্ষতার প্রশ্ন তুলে নারীদের খাটো করে দেখতে চান। সব ধরনের পেশাতেই নারীদের অবস্থান শক্ত হচ্ছে দিন দিন। কিন্তু পুরুষ সহকর্মীর মনোভাবের খুব একটা উন্নত হচ্ছে না। অধিকাংশ ব্যক্তিই মনে করেন নারীরা অফিসপ্রধান হিসেবে যোগ্য নন। কখনো বা অনুসন্ধান করেন ম্যাডাম কি নারী কোটায় চাকরি পেয়েছেন। মেধায় হয়তো হয়নি।

ম্যাডামের বাড়ি, শশুরবাড়ি, ছেলেমেয়ে, স্বামীর অবস্থান- এসব জানতেও ব্যস্ত। যে কোনোভাবেই একটা হলেও দুর্বল দিক খুঁজে পেতে হবে। নয়তো তাকে নিচে টেনে নামানো যাচ্ছে না। আমাদের সমাজের বড় একটা উচ্চ শিক্ষিত চাকরিজীবী পুরুষদের এমন চিন্তা-চেতনা সত্যিই মাঝে মাঝে হতাশা করে দেয়। এখনো কেন পশ্চাৎগামী চিন্তা, চিন্তায় অগ্রশীলতা আনতে তো কোনো ক্ষতি নেই, এর জন্য তো কোনো আর্থিক মূল্য পরিশোধ করতে হয় না। তাহলে কেন এত কার্পণ্য। চিন্তার দৈন্যতা দূর করে একটু আলোর পথে হাঁটলে কী ক্ষতি। সবার লক্ষ্যই তো এক। তাহলে নেতিবাচক গণ্ডি পেরিয়ে ইতিবাচক বৃত্তে পা রেখে নারী সহকর্মীর প্রতি সহানুভূতি, সম্মান দেখাতে বাধা কোথায়।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj