উদ্যমী পাঁচ জয়িতা

সোমবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০

‘নারী’ যার পুরো জীবনটাই সংগ্রামময়। ঘর সামলানোর পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রেও দক্ষতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যাচ্ছেন তারা। শুধু নিজের অবস্থার উন্নতি করে থেমে থাকেননি। পরিবার, সমাজ তথা দেশকে এগিয়ে নিতে তারা হয়েছেন আলোকবর্তিকা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে বহুমুখী কার্যক্রমে অংশগ্রহণ ও নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নারীকে সমাজে যোগ্য সম্মান দিতে প্রতি বছরই বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে নির্বাচন করা হয় জয়িতাদের। জয়িতা অন্বেষণে বাংলাদেশ শীর্ষক কার্যক্রমের আওতায় ঢাকা বিভাগীয় পর্যায়ে পাঁচ ক্যাটাগরিতে ২০১৮ সালের সেরা পাঁচ জয়িতার হাতে চলতি বছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি সম্মাননা স্মারক তুলে দেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা। সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদানের জন্য ঢাকার ভেলরি এন টেইলর, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী হিসেবে মানিকগঞ্জের ফেরদৌসী আক্তার, শিক্ষা ও চাকরি ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী হিসেবে ঢাকার আখতারী বেগম, সফল জননী হিসেবে মানিকগঞ্জের রেখা রানী ঘোষ, নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করা ক্যাটাগরিতে ঢাকার অরনিকা মেহেরীন ঋতু জয়িতা হিসেবে নির্বাচিত হন। পাঁচ এই জয়িতাকে নিয়ে অন্যপক্ষের এই প্রতিবেদন। লিখেছেন সেবিকা দেবনাথ।

ভেলরি এন টেইলর

বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপির স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সিআরপি (সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইজড)-এর পরিকল্পক ও প্রতিষ্ঠাতা ভেলরি এন টেইলর। এই নারী মূলত ইংল্যান্ডের নাগরিক। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পান। সেই সময়ের প্রধানমন্ত্রী তাকে সম্মানপূর্বক এই নাগরিকত্ব দেন। শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের দুটি পরিত্যক্ত সিমেন্ট গোডাউনে বিদেশ থেকে আনা বরাদ্দ দিয়ে মাত্র চারজন পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগী নিয়ে সিআরপি যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু তৎকালীন মেডিকেল কলেজের পরিচালক তাতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে সেখানে আর কাজ করা হয়নি ভেলরির। তবে তাতে দমে যাননি তিনি। তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেন সমাজের নানামুখী উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে। প্রতিষ্ঠা করেন সিআরপি। প্রতিষ্ঠার পর অক্লান্ত পরিশ্রম করতে থাকেন এর উন্নতির জন্য। সাইকেলে চেপে বিভিন্নজনের ঘরে ঘরে যেতেন সাহায্যের জন্য। এ জন্য তাকে অনেক লাঞ্ছনা-গঞ্জনাও সহ্য করতে হয়েছিল। কিন্তু আজ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমাজের মূলধারায় একীভূতকরণের প্রচেষ্টার কারণে সিআরপি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

ভেলরি বলেন, সেবার মধ্যেই পরম সুখ ও সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি লাভ করা যায়। সে লক্ষ্যে সিআরপি গড়ে তোলা। প্রবাসী হিসেবে এ কাজটি আমার জন্য মোটেও সহজ ছিল না।

ফেরদৌসী আক্তার

বাবার অসচ্ছলতা ও পারিবারিক আয় না থাকায় মানিকগঞ্জের শিবালয়ের ফেরদৌসী বেশিদূর লেখাপড়া করতে পারেননি। কিশোর বয়সেই বিয়ে হয়ে যায়। তবে বিয়ে হওয়ার পরও অভাব তার পিছু ছাড়েনি। অভাবের তাড়না থেকে মুক্তি পেতে নিজের তাগিদেই সরকারি প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেই প্রতিষ্ঠা করেন একটি পোল্ট্রি ফার্ম। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। স্বাভাবিক আয় বৃদ্ধির সঙ্গে শুরু করেন মাছ চাষ। এছাড়া বসতবাড়ির আশপাশে করেন সবজি চাষ। ফার্মের প্রাথমিক পুঁজি সামান্য টাকা হলেও এখন তার পোল্ট্রি ফার্মের পুঁজি দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ টাকা। তার সর্বনি¤œ মাসিক আয় ৫০ হাজার টাকা। বর্তমানে তার রয়েছে তিনটি পোল্ট্রি ফার্ম, এক পুকুরে মাছের চাষ, সবজি বাগান, দেশি হাঁস-মুরগি পালন, ছাগল পালনসহ ফুল ও ফলের চাষ। ফেরদৌসী এখন তার ইউনিয়নে তিনটি ওয়ার্ডের উপজেলা সংরক্ষিত মহিলা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ফেরদৌসী বলেন, নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা আমাকে বিয়ে দেয়। শুরু হয় আমার জীবন যুদ্ধ। তিন সন্তান নিয়ে কষ্টে দিন কাটাচ্ছিলাম। তখন পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক থেকে কিছু টাকা ঋণ নিয়ে ৫শ মুরগি দিয়ে পোল্ট্রি ফার্ম করি। এখন আর অভাব নেই। চেষ্টা করলে সফলতা আসবেই।

আখতারী বেগম

কাপড় সেলাই ও টিউশনি করে অনেক কষ্টে টাকা জোগাড় করে লেখাপড়া করেন আখতারী বেগম। নি¤œবিত্ত পরিবারে জন্ম নিলেও শিক্ষা জীবনে কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে প্রতিটি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে সাফল্য অর্জন করেছেন তিনি। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে ¯œাতক ও ¯œাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি বিসিএস প্রশাসনে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন তিনি। সর্বশেষ তিনি সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আখতারী বেগম বলেন, আজ নিজের সম্পর্কে কিছু বলার আগে আমার বাবার কথা বলতে চাই।

বাবা নিজে একজন সাধারণ সৈনিক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। বাবাই আমাদের আট ভাই-বোনের মধ্যে স্বপ্নের বীজ বুনে দিয়েছিলেন। বাবা সব সময় বলতেন লেখাপড়া করতে হবে। বড় হতে হবে। মানুষের মতো মানুষ হতে হবে। কতটুকু হতে পেরেছি জানি না। তবে বাবার স্বপ্নকে পূরণ করার লক্ষ্য নিয়েই কাজ করেছি। পথ চলেছি। ১৯৮৫ সালে বাবা সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। মা শক্ত হাতে সংসারের হাল ধরলেন। বাবার স্বপ্ন পূরণে আমাদের ভাই-বোনকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন।

রেখা রানী ঘোষ

মানিকগঞ্জের ঘিওরের রেখা রানী ঘোষ, ছয় ছেলে ও এক কন্যা সন্তানের জননী। ছেয়েমেয়ে আর নাতি-নাতনি নিয়ে তার সুখের সংসার। কিন্তু সংসার জীবনের শুরুটা ছিল তার ঠিক উল্টো। নিজে তেমন লেখাপড়া করতে পারেননি। স্বামীর সীমিত আয়ের সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। একবেলা খাবার জুটতো। সামাজিক কটাক্ষকে গায়ে না মেখে গাভী পালন করে তার দুধ বাজারে বিক্রি শুরু করেন। এরপর শুরু করেন হাঁস-মুরগি পালন। ধীরে ধীরে সংসারে অভাবের কালো ছায়া কাটতে শুরু করে। সংসারের হাজার কাজের ভিড়েও সন্তানের লেখাপড়ার দিকে রেখা রানীর ছিল সজাগ দৃষ্টি। এ বিষয়ে কোনো ছাড় দিতে রাজি ছিলেন না তিনি। এরই ফল হিসেবে রেখা রানীর বড় ছেলে ডাক্তার হিসেবে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজে, দ্বিতীয় ছেলে সরকারি দেবেন্দ্র বিশ^বিদ্যালয় কলেজের সহকারী অধ্যাপক, তৃতীয় ছেলে ব্যবসায়ী, চতুর্থ ছেলে ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক, পঞ্চম ছেলে ইঞ্জিনিয়ার, ষষ্ঠ ছেলে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। আর মেয়ে ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন।

রেখা রানী বলেন, একটা সময় বড়ই কষ্ট করেছি। আমার স্বামীর তেমন অর্থনৈতিক সক্ষমতা ছিল না। গাভী কিনে তার দুধ বিক্রি করেছি বাজারে। সংসারে হাজার ঝামেলায় কষ্ট হতো খুব। কিন্তু সেই কষ্টকে কষ্ট মনে করতাম না। আজ আমার ছেলেমেয়েরা প্রতিষ্ঠিত। এটাই আমার পাওয়া।

অরনিকা মেহেরীন ঋতু

ধামরাইয়ের রডমিস্ত্রি বাবার মেয়ে অরনিকা মেহেরীন ঋতু। অভাবের সংসারে তাদের অবস্থা ছিল ‘দিন আনে দিন খায়’-এর মতো। তবে বাবার বড্ড আদরের ঋতু লেখাপড়ায় ছিল বেশ মনোযোগী। ঋতুর স্বপ্ন ছিল বড় হওয়ার। ঋতু তখন কিশোরী। এসময় তাদের বাড়িতে যাতায়াত করত দূরসম্পর্কের আত্মীয় আব্দুল ওয়াহাব। তারই রোষানলে পড়ে ঋতু। ওয়াহাব ঋতুকে প্রেমের প্রস্তাব দেয়। এই প্রস্তাবে রাজি হয়নি ঋতু। এর কিছুদিন পরই ঋতুর দিকে এডিস ছুড়ে মারে ওয়াহাব। এতে ঋতুর ডান কাঁধ-হাত-চোখ পুরোটাই অকেজো হয়ে যায়। প্রায় ১০ মাস চিকিৎসা চলে ঋতুর। অসহায় পরিবারকে সেই চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয়। আদরের ঋতু পরিবারের জন্য বোঝা হয়ে যায়। ঋতুও হতাশার অতলে তলিয়ে যেতে থাকে। এমন সময় এসিড সারভাইভার্স ফাউন্ডেশন থেকে কম্পিউটারের ওপর প্রশিক্ষণ নেয় ঋতু। এরপরই কাটতে থাকে হতাশার আঁধার। ১৩ হাজার টাকা বেতনে চাকরি পায় ঋতু। জীবন সংগ্রামে থেমে না গিয়ে ঋতু এখন সংসারের আর্থিক সহযোগিতাও করছে। ঋতু বলেন, আমার এসএসসি পরীক্ষার ১৭ দিন আগে আমার জীবনে এই দুর্দশা নেমে আসে। সেই লোকের এখনো কোনো বিচার হয়নি। আমি আমার যোগ্যতা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ নিয়ে ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেডের কল সেন্টারে কাজ করছি। আমি জীবন যুদ্ধে হারতে চাই না।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj