করোনা ভাইরাস : উহানে লাশ পোড়ানো নিয়ে মুখ খুলছে না চীন

শনিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০

কাগজ ডেস্ক : করোনা ভাইরাস বিস্তারের কেন্দ্রভূমি চীনের হুবেই প্রদেশের উহানে ঝরছে প্রাণ। শহরে উচ্চমাত্রার সালফার ডাই-অক্সাইডের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে বলে জানিয়েছে ডেইলি মেইল। রাস্তায় গাড়ি-ঘোড়া নেই, কল-কারখানাও সব বন্ধ। তারপরও ধোঁয়ায় ছেয়ে আছে উহান শহর।

আন্তর্জাতিক এ গণমাধ্যম জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে উপগ্রহ থেকে নেয়া মানচিত্রে দেখা গেছে, উহানের চারপাশে এসও২-এর উপস্থিতি উদ্বেগজনকহারে বেড়েছে। এছাড়া কোয়ারেন্টিনের অধীনে থাকা চোংকিং শহরেও উচ্চমাত্রার সালফার ডাই-অক্সাইডের উপস্থিতি রয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মরদেহ পুড়িয়ে ফেলার সময় সালফার ডাই-অক্সাইড উৎপাদিত হয়। এছাড়া মেডিকেল বর্জ্য ভস্মীভূত করলেও এমনটি ঘটে।

সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীরা মানচিত্র পর্যালোচনা করে বলছেন, শহরের প্রান্তেই মরদেহগুলো পুড়িয়ে ফেলা হতে পারে। করোনা ভাইরাস মানুষে মানুষে সহজেই ছড়িয়ে পড়ছে বলে লাশ পোড়ানোর মাধ্যমে শেষকৃত্য সম্পাদনের নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। ফলে ২৪ ঘণ্টাই লাশ পোড়াতে হচ্ছে শ্মশানকর্মীদের। কাজটি এতটাই সুরক্ষিতভাবে করা হচ্ছে যে, প্রিয়জনের মুখ শেষবারের মতো দেখারও সুযোগ পাচ্ছেন না পরিবারের সদস্যরা। দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন বলছে, যথাসম্ভব দ্রুত সময়ে লাশগুলো ভস্মীভূত করে ফেলতে হবে, যাতে করে ভাইরাস না ছড়ায়। ব্যাপকসংখ্যক মরদেহ ভস্মীভূত করার সঙ্গে উহানের অতিমাত্রায় সালফার ডাই-অক্সাইডের উপস্থিতির একটি সম্পর্ক থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চেকভিত্তিক আবহাওয়াবিষয়ক ওয়েবসাইট উইন্ডি ডটকম দেখিয়েছে, সপ্তাহের শেষ দিনে প্রতি ঘনমিটারে এক হাজার ৩৫০ মাইক্রোগ্রামের কাছাকাছি সালফার ডাই-অক্সাইড দেখা গেছে উহানে। সেই তুলনায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, প্রতি ঘনমিটারে ৫০০ মাইকোগ্রামের ডোজ ১০ মিনিটের বেশি ছাড়িয়ে যাওয়া উচিত না। যুক্তরাজ্য সরকার বলছে, প্রতি ঘনমিটারে ৫৩৩ মাইক্রোগ্রামের ঘনীভবন অতিমাত্রায় বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। কিন্তু ম্যাপ অনুসারে, যদিও এসও২-এর মাত্রা আজ কম দেখা যাচ্ছে। কিন্তু অধিকাংশ চীনের সঙ্গে তুলনা করলে উহান ও চোংকিং শহরে সালফার ডাই-অক্সাইডের উপস্থিতি উল্লেখ করার মতো। সোমবারেও উহানের অধিকাংশ স্থানে প্রতি ঘনমিটারে ৫০০ মাইক্রোগ্রামের বেশি সালফার ডাই-অক্সাইডের উপস্থিতি দেখা গেছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মরদেহ ভস্মীভূতকরণে এসও২-এর পাশাপাশি নাইট্রোজেন অক্সাইডের মতো দূষণও ছড়িয়ে পড়ে। মার্কিন পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা বলছে, মেডিকেল বর্জ্য পুড়িয়ে ফেলার কারণেও সালফার ডাই-অক্সাইডের নির্গমন হতে পারে। তবে এটি নিশ্চিত না যে, অতিমাত্রায় এসও২-এর উপস্থিতির সঙ্গে করোনা ভাইরাসের কোনো সম্পর্ক রয়েছে। জীবাষ্ম জ্বালানি ও অন্যান্য রাসায়নিক প্রক্রিয়ায়ও রংহীন এই গ্যাস উৎপাদন ঘটতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, অতিমাত্রায় ও দীর্ঘ সময় সালফার ডাই-অক্সাইডের উপস্থিতি স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। অ্যাজমা, ফুসফসের প্রদাহ ও ফুসফুসের কার্যক্রম কমিয়ে দেয়াসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করতে পারে এই গ্যাস বলে দাবি বিশেষজ্ঞদের। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, এসও২-এ মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস ব্যবস্থা, ফুসফুসের কার্যক্রমে ক্ষতিকর প্রভাবসহ চোখে জ্বালাপোড়া দেখা দিতে পারে। ইউন নামে উহানের এক শ্মশানকর্মী জানান, তারা প্রতিদিন কমপক্ষে ১০০টি লাশ পোড়াচ্ছেন। গত ২৮ জানুয়ারি থেকে তিনি ও তার প্রায় সব সহকর্মীই সপ্তাহে ৭ দিন ২৪ ঘণ্টাই কাজ করছেন। এমনকি সামান্য বিশ্রাম নেয়ার জন্য বাড়ি ফেরারও সময় পাচ্ছেন না কেউ। এ কাজের জন্য শিগগিরই আরো লোকবল দরকার বলেও জানান তিনি। উহানের স্থানীয়রা জানিয়েছেন, শহরটির শ্মশানকর্মীদের জন্য ভাইরাসপ্রতিরোধী পোশাকের স্বল্পতা দেখা দিয়েছে। অনেকেই রেইনকোট পরে বিকল্প ব্যবস্থার চেষ্টা করছেন। এছাড়া করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কারণে প্রিয়জনের লাশ দেখারও সুযোগ দেয়া হচ্ছে না পরিবারের সদস্যদের। প্রাণঘাতী নভেলা করোনা ভাইরাসে উহানে মৃতের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। সোমবার পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। এ ভাইরাস সংক্রমণের পর এদিন সর্বোচ্চ ১০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই নিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ১ হাজার ১১ জনে। তবে সোমবার আক্রান্তের সংখ্যা আগের দিনের তুলনায় ২০ শতাংশ কমেছে। হুবাই স্বাস্থ্য কমিশন নিশ্চিত করেছে, সোমবার হুবাই প্রদেশে নতুন করে ২ হাজার ৯৭ জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে, রবিবার এ সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৬১৮ জন।

দূরের জানালা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj