বরিশালে দখল দূষণে হারিয়ে যাচ্ছে খাল

সোমবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০

এম মিরাজ হোসাইন, বরিশাল : ধান-নদী-খাল এই তিনে বরিশাল। একসময় বরিশালকে চেনাতে এমন বাক্য ব্যবহৃত হতো কিন্তু সেই চিত্র এখন বদলে গেছে। শহরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া এবং বিভাগের অধিকাংশ জেলা ও উপজেলার খালগুলোর বেশির ভাগই অস্তিত্ব হারিয়েছে। কীর্তনখোলা ও পালরদী নদীও দখল হচ্ছে।

জানা গেছে, ১৯০৬ সালের ১৫ এপ্রিল কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বজরা ভিড়েছিল বরিশাল শহরের ভাটার খালে। ওই সময় বজরায় অবস্থান করা বিশ্বকবিকে মুগ্ধ করেছিল বরিশালের রূপ। এছাড়া খাল-বিল-পুকুর-নদী পরিবেষ্টিত বরিশালের রূপে মুগ্ধ কবি কাজী নজরুল ইসলাম এই নগরীকে ‘বাংলার ভেনিস’ আখ্যায়িত করেছিলেন।

বরিশাল শহরে একসময় ১৮টি বড় খাল ছিল। এসব খালগুলোর মধ্যে অন্যতম বটতলা খাল। শহরের বটতলা থেকে নবগ্রাম হয়ে ঝালকাঠি জেলার রায়পাশা-কড়াপুরে গিয়ে খালটি সুগন্ধা নদীতে মিশেছে।

এলাকাবাসী জানান, আশির দশকের মাঝামাঝি সময়েও খালটিতে নৌকা চলাচল করত। কিন্তু বেশির ভাগ অংশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে এটি মরা খাল। নবগ্রাম এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বেশ কয়েকটি স্থানে খালটির ওপর নির্মিত সরু কালভার্টের দুই পাশের বিরাট অংশ ভরাট হয়ে গেছে। পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খালে থাকা ময়লা-আবর্জনা দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।

নগরবাসী জানান, বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আহসান হাবিব কামাল বরিশাল পৌরসভার চেয়ারম্যান থাকাকালীন উন্নয়নের নামে খাল ভরাট শুরু হয়। সে সময় (১৯৯৮ সাল) তৎকালীন পৌরসভা বটতলা এলাকায় বটতলা খাল ভরাট করে দোকানপাট নির্মাণ করে। ২০০০ সালে বরিশাল পৌরসভা সিটি করপোরেশনে উন্নীত হলে আহসান হাবিব কামাল কিছুদিন মেয়র ছিলেন। ওই সময় খালটির বটতলা থেকে হাতেম আলী কলেজ চৌমাথা পর্যন্ত অংশ ভরাট করা হয়। ২০০৩ সালে মজিবর রহমান সরোয়ার (বর্তমানে মহানগর বিএনপির সভাপতি) মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর খালের নবগ্রাম থেকে বটতলা মার্কেট পর্যন্ত এলাকা ভরাট করা হয়। বটতলা খালের ওপর সড়ক নির্মাণ করা হয় সাবেক মেয়র শওকত হোসেন হিরনের সময়ে। তবে সাবেক মেয়ররা বটতলা খাল ভরাটের জন্য পরস্পরকে দায়ী করেন। আহসান হাবিব কামাল বলেন, বটতলা খাল এলাকায় নির্মিত দোকানপাটগুলো ছিল জেলা পরিষদের। মজিবর রহমান সরোয়ারের দাবি, তার সময়ে বটতলা খাল ভরাট করা হয়নি, বরং খালের পাড়ের ভরাট হওয়া অংশ ও অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হয়েছে।

সূত্র মতে, ওই উপজেলার মধ্য দিয়ে বহমান থানা সংলগ্ন চৌধুরী খালটি দখল ও দূষণে এখন মরা খালে পরিণত হয়ে অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। স্থানীয় প্রভাবশালী তারেক বুলুর নেতৃত্বে আকন বাড়ির সামনে থেকে খালের একাংশ দখল করে নিয়েছে স্থানীয়রা। খালের দুইপাড়ে গড়ে তোলা হয়েছে বিলাসবহুল অট্টালিকা, স’মিল, দোকানপাট।

উপজেলার শৌলজালিয়া ইউনিয়নের সেন্টারের হাটবাজারের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে হিজলতলা খাল। সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে শত বছরের পুরনো ওই খালের ¯øুইস গেটের ওপর পাকা ভবন নির্মাণ করেছে স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তি। খালের পাড়ে সরকারি জমিসহ খালের ওপরের ¯øুইস গেটের একাংশ দখল এবং অবৈধ ভবন নির্মাণ করলেও প্রশাসন তা উচ্ছেদ করতে পারছে না। একইভাবে শৌলজালিয়া ইউনিয়নের প্রভাবশালী মিজানুর রহমান বশির মীরা তার বাড়ির সামনের বৈরাগী বাড়ি খালের প্রায় ৫০০ ফুট দখল করে মাছ চাষ করে বছরে লক্ষাধিক টাকা আয় করছেন। ফলে খালের পানি প্রবাহ বন্ধ হওয়ায় কৃষকদের চাষাবাদ মারাত্মকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের চোখের সামনেই সরকারি খাল দখল করে শৌলজালিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মৃত কুদ্দুস মীরের ছেলে মিজানুর রহমান বশির মীরা ও তার ছোট ভাই সৈয়দ শামীম জাহাঙ্গীর মাছ চাষ ও দোকান ঘর নির্মাণ করছে।

বরিশালের নদী খাল বাঁচাও আন্দোলনের সদস্য সচিব কাজী এনায়েত হোসেন বলেন, কাগজে-কলমে এখনো শহরে ১৮টি খালের কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় ৭টি খালের। এগুলো হলো- জেল খাল, লাকুটিয়া খাল, আমানতগঞ্জ খাল, সাগরদী খাল, নবগ্রাম খাল, পুডিয়া খাল ও টিয়াখালী খাল। খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই শহরে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।

এ ব্যাপারে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ফারিহা তানজীন জানান, যেখানেই খাল দখলের খবর পাওয়া যাচ্ছে সেখানেই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে। নতুন করে কাউকে খাল দখল করতে দেয়া হবেনা। তিনি আরো জানান, খালের মধ্যে থাকা স্থাপনাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।

বরিশাল জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান বলেন, দখল হওয়া নদী ও খাল উদ্ধারের জন্য সরকারিভাবে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। তাই প্রতিটি উপজেলার নির্বাহী অফিসারদের এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেয়ার পর ইতোমধ্যে বেশ কিছু উপজেলায় উচ্ছেদ অভিযানও পরিচালনা করা হয়েছে। বাকিগুলোও পর্যায়ক্রমে উচ্ছেদ করা হবে।

সারাদেশ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj