সাহিত্য চর্চায় অচলায়তন ভাঙছে নারী : সেবিকা দেবনাথ

সোমবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর বায়াত্তর সালেই গ্রন্থমেলার আয়োজন হয়েছিল বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে। তবে আজকের একুশে গ্রন্থমেলার আনুষ্ঠানিক সূচনা ১৯৮৪ সালে। তারপর থেকে বইমেলার পরিসর বেড়ে একাডেমি প্রাঙ্গণ থেকে ছড়িয়ে পড়েছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। একই সঙ্গে বেড়েছে পাঠক ও লেখকের সংখ্যা। কিন্তু যে পরিমাণ বই প্রকাশ হয় তার মধ্যে নারী লেখকদের প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা খুবই কম। জানা যায়, প্রতি বছর বইমেলার প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে নারী লেখকদের বই থাকে ২০ থেকে সর্বোচ্চ ২২ শতাংশ। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে নারী লেখকের সংখ্যা এত কম কেন?

এ প্রশ্নের উত্তরে নবীন-প্রবীণ নারী লেখকরা বলছেন, সমাজ-সংসারের কারণেই নারী গণ্ডিবদ্ধ। একজন নারী সাহিত্যিককে তার লেখার মান নিয়ে সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছাতে যত কাঠখড় পোড়াতে হয়, পুরুষ সাহিত্যিককে ততটা নয়।

প্রবীণ লেখকরা বলছেন, লেখালেখিতে নারী এগিয়ে আসা যত বাড়বে তেমনি করে তৈরি হবে পাঠক। আর তাতে করে আরো সমৃদ্ধ হবে বাংলা বইয়ের ভাণ্ডার। আর নবীন লেখকদের অভিযোগ সুপরিচিত লেখকদের বাইরে নতুন উঠে আসা নারীর বই প্রকাশে প্রকাশকদের মধ্যে এক ধরনের অনীহা কাজ করে।

এ প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বলেন, মেয়েরা যে কম লিখছে, তার দায় কেবল মেয়েদের নয়। এর সঙ্গে পারিপার্শ্বিক অনেক কারণ থাকে। এর দায় রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থারও রয়েছে। অনেক সময় তাদের আড়াল করে রাখা হয়। তবে তরুণ প্রজন্মের লেখকরা এজন্য আরো বিভিন্ন কারণ যেমন লেখালেখির যথেষ্ট পরিবেশ না থাকা এবং প্রকাশকদের আগ্রহের অভাবকে দায়ী করলেন। সেই সঙ্গে পারিবারিক ও সামাজিকভাবে অসহযোগিতাকেও দায়ী করে থাকেন।

আর সাহিত্যিক নাসরীন জাহান বলেন, বাংলাদেশে তো লেখালেখিকে পেশা হিসেবে নেয়া যায় না, সেটা একটা বিরাট সমস্যা। তার বাইরে একজন পুরুষ যখন লেখেন, তাকে পরিবার অবসর তৈরি করে দেয়। কিন্তু মেয়েদের জন্য তা হয় না।

নব্বইয়ের দশকে বাংলা একাডেমিতে তরুণ লেখক প্রকল্প নামে একটি প্রকল্প চালু ছিল, যার মাধ্যমে অনেক নতুন লেখক তৈরিও হয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে সেই প্রকল্পটি বন্ধ রয়েছে। এর বাইরে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে এ ধরনের কোনো প্রকল্প এখন আর কেউ চালাচ্ছেন না।

নবীন লেখক মেহেরুন নেছা রুমার এ পর্যন্ত প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১২টি। ২০১২ সালে তার প্রথম বই প্রাকাশিত হয়। এবারের বইমেলাতে এসেছে তার লেখা বই মেঘ জলের জীবন। আহমেদ মুশফিকা নাজনীনের এবারের প্রাকাশিত বই প্রজাপতি ও তিতলী। শিশুতোষ এই বইটি নিয়ে তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা চার। এবারের বইমেলায় প্রথম বই প্রকাশিত হয়েছে জান্নাতুল কেকা, সাজেদা পারভীন সাজু, নাসরীন গীতির। কেকার ফ্রকের ঘেরে শৈশব, সাজুর সময় এবং গীতির বইয়ের নাম ঘর বসতি।

নবীন এই লেখকরা বলেন, সংসার ও চাকরি সামলে নিজের জন্য সময় বের করা নারীর জন্য কিছুটা নয় অনেকটাই কঠিন। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের বাধাও থাকে।

অন্যান্য আরো অনেক কারণ তো রয়েছেই। আর এখানে টিকে থাকাটা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক সময় বই প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রকাশকরা পরিচিত এবং প্রতিষ্ঠিত লেখকদেরই প্রাধান্য দেন। সমাজ নারীকে নারীই ভাবে মানুষ ভাবে না। লেখার জগতে নারীদের একটা অবস্থান হতে পারে, তা অনেকে মনেই করেন না। এমনকি অনেক লেখক প্রকাশকও তা মানতে চান না। প্রতিবন্ধকতার পরও এই অচলায়তন ভাঙছে নারী। বিকশিত হচ্ছেন শত পল্লবে।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj