নারী মুক্তিযোদ্ধাদের ‘আম্মা’ : সাফিনা লোহানী

সোমবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০

অন্যপক্ষ প্রতিবেদক

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার যখন বীরাঙ্গনাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল তখন তাদের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন সাফিনা লোহানী। সন্তানের মতো আপদে-বিপদে তিনি আগলে রাখতেন তাদের। নিজগুনেই তিনি সিরাজগঞ্জের নারী মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে হয়ে উঠেন ভরসাস্থল। হয়ে উঠেন তাদের ‘আম্মা’। বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি প্রাপ্তির নেপথ্যে তিনি ছিলেন অগ্রসৈনিকের ভূমিকায়। নারী মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠক এই মহীয়সী নারী ১০ ফেব্রুয়ারি পাড়ি জমান পরপারে। বীরাঙ্গনাদের ‘মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়াই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া। বিভিন্ন সময় এই প্রাপ্তির কথা তিনি জানিয়েছেন।

২০১৫ সালে নেয়া সাফিনা লোহানীর এক সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অন্যপক্ষের এই প্রতিবেদন।

সিরাজগঞ্জের সুপরিচিত প্রগতিশীল পরিবার লোহানী পরিবারে সাফিনা লোহানীর জন্ম ১৯৫৩ সালে ১ সেপ্টেম্বর। ১৯৬২ সালে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে তিনি জড়িয়ে পড়েন। স্বামী মুক্তিযোদ্ধা আমিনুল ইসলাম চৌধুরী। মুক্তিযুদ্ধের সময় দুই মাসের সন্তান কোলে নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেন তিনি। ১৯৭২ সালে বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসনের জন্য নারী পুনর্বাসন কেন্দ্র নামে একটি আশ্রয় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠান করেন বঙ্গবন্ধু। এই কেন্দ্রের মূল সংগঠক ছিলেন ড. নীলিমা ইব্রাহিম। সিরাজগঞ্জ জেলায়ও চালু হয় এই পুনর্বাসন কেন্দ্র। কেন্দ্রের সভাপতি হিসেবে কাজ শুরু করেন সখিনা হোসেন আর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সাফিনা লোহানী। বিভিন্নভাবে তথ্য সংগ্রহ করে ৩৬ জন বীরাঙ্গনাকে বের করেন এই দুই নারী। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গঠিত ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সিরাজগঞ্জ কমিটির সদস্য হিসেবেও যুদ্ধাপাধীদের বিচারের দাবিতে ছিলেন সোচ্চার। সাফিনা লোহানী বলেন, ওই সময় লাঞ্ছিত এসব নারীর সামাজিকভাবে নানা গঞ্জনার শিকার হতে হয়েছে। সিরাজগঞ্জ জেলায় অসংখ্য বীরাঙ্গনা থাকলেও, তাদের মধ্যে ৩৬ জন বীরাঙ্গনা আশ্রয় নেন এ পুনর্বাসন কেন্দ্রে। যাদের পরিবার বিষয়টি মেনে নিয়েছিল তারা আশ্রয়কেন্দ্রে আসেনি। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর জিয়াউর রহমানের সামরিক আদেশে এ কেন্দ্রটি বন্ধ করে দেয়া হয়। তখন আশ্রয় নেয়া নারীরা নানা স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। ১৯৭৮ সালে আমার প্রতিষ্ঠা করা সিরাজগঞ্জ উত্তরণ মহিলা সংস্থার মাধ্যমে ৩৬ জনের মধ্যে ২১ জন বীরাঙ্গনাকে খুঁজে বের করি। তারা তখন দুর্বিষহ জীবনযাপন করছিলেন। নিজ পরিবার, সমাজ, এমনকি প্রতিবেশীদের কাছেও তারা ছিলেন অস্পৃশ্য। তাদের থাকার জায়গা ছিল না। পরনের কাপড়ও ছিল ছেঁড়া। খাবারও জুটতো না। আবার তাদের একত্র করি। বিভিন্ন ব্যক্তি, সংস্থার কাছে তাদের কষ্টের জীবনের কথা তুলে ধরে আর্থিক সাহায্য নিয়ে ২১ বীরাঙ্গনার মধ্যে বিতরণের পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন ত্রাণ সহায়তা পাওয়ারও চেষ্টা করি। অবহেলা আর নানা সমস্যায় জর্জরিত ওই নারীরা পরিবার ও সমাজের ভয়ে এতটাই ভীত ছিল যে আমার কথায় প্রথমে সাড়া দেয়নি। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। ওদের আস্থা অর্জন করতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। ওরা মিডিয়ার সামনে আসতে চাইতেন না। অনেক বুঝিয়ে তাদের মিডিয়ার সামনে উপস্থাপন করি। প্রথম প্রথম তো তাদের সঙ্গে আমাকেও থাকতে হতো। এরপর শুরু করি ওদের নিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাওয়া। এই কার্যক্রম চালাতেও বেগ পেতে হয়েছে সাফিনা লোহানীকে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর থেকে দীর্ঘদিন বীরাঙ্গনাদের নিয়ে কাজ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। অনেক বছর খুব গোপনেই কাজ করতে হয়। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে এ কার্যক্রম ভিন্নমাত্রা পায়। ওই সময়েই এক পর্যায়ে নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর উপস্থাপনায় চ্যানেল আইয়ের একটি অনুষ্ঠানে ৮ বীরাঙ্গনার সাক্ষাৎকার প্রচার করা হয়। আর সেই থেকে দেশবাসীর নজরে আসে সিরাজগঞ্জের নির্যাতিত বীরাঙ্গনা নারীদের অসহায় জীবনযাপনের বিষয়টি। এরপর বিভিন্ন মিডিয়ায় এনিয়ে আরো রিপোর্ট হয়। যা আমাদের আন্দোলনকে শক্তি জুগিয়েছে। ২০১৫ সালে বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেয় বাংলাদেশ সরকার। যা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj