নিজেরে করো জয়! : আহমেদ মুশফিকা নাজনীন

সোমবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ফ্লোরা বন্যা। সারাটা সময় কাটাতেন তার স্বামী সন্তান আর সংসার নিয়ে। হাসতেন বেড়াতেন। এর মাঝেও কখনো কখনো বিষণœ হতো মন। নিজের পরিচয় কি? এই যে এত পড়াশোনা করেছেন তা কি শুধু এমনি এমনি। গুমড়ে কাঁদতেন। ভালোলাগতো না কিছুই। একদিন ফেসবুকে দেখেন পেন্সিল নামে এক গ্রুপ। সেখানে হঠাৎ করেই পাঠান কবিতা। প্রথমেই ৩ হাজার লাইক। এত মানুষ পছন্দ করেছে। নিজেকে যেন ফিরে পেতে লাগলেন। একটু একটু করে বাড়তে লাগল আত্মবিশ^াস। বাসায় কাজের ফাঁকে ফাঁকে, কখনো রান্না করার ফাঁকে শুরু করলেন লেখা। কিন্তু বিষয়টা পছন্দ করলেন না পরিবারের অনেকেই। এমনকি ভুল বুঝলেন বরও। আত্মীয়স্বজনও বিরক্ত। ঘরের বউ সারাক্ষণ এসব কি লেখে। আটকাতে হবে। নয়তো ভেঙে যাবে সংসার। ফ্লোরা একটু একটু করে বুঝাতে লাগলেন বরকে। একসময় বর বাড়ালেন হাত। ফ্লোরা হেসে বলে, জানেন, এবার বইমেলায় আমার বর কিন্তু যাপিত জীবনের গল্পের বই কিনে সবার আগে আমার অটোগ্রাফ নিয়েছে। ছেলে-মেয়েরাও বলেছে মা, আমরা গর্বিত তোমার মতো মা পেয়ে। একসময় ডুবতে বসেছিলাম। এখন মনে হচ্ছে ভেসে বেড়াছি। তিনি তার লুকানো প্রতিভাকে বের করার জন্য পেন্সিল প্রকাশনাকে ধন্যবাদ জানান। লেখকের স্বামী এইচ এস এন আলম জানান প্রথমদিকে কিছুটা বাধা দিলেও পরে বুঝেছি ওর প্রতিভা রয়েছে। ঘর সংসার সব সামলিয়ে লিখছে ফ্লোরা। তার লেখালেখিতে এখন সবচেয়ে বেশি আনন্দিত তিনি।

অন্যদিকে ছোটবেলা থেকেই লেখালেখি করতেন গৃহবধূ সালমা সুলতানা। কিন্তু সেগুলো ছাপার অক্ষরে পাঠাননি কোথাও। একদিন হঠাৎ পেন্সিলে প্রথম লেখা পোস্ট করেন। পরে সবার কমেন্টে উৎসাহ পান। বাসা থেকেও পান সমর্থন। বিশেষ করে শ^শুর ভাষা সৈনিক ড. নেছার উদ্দিন আহমেদ অনেক উৎসাহ দিতেন। তিনি চাইতেন মেয়েদের জীবন যেন রান্নাঘরেই না কাটে। এখানেই যেন শেষ না হয় তারা। সালমার দুঃখ তার প্রকাশিত বইটি শ^শুর দেখে যেতে পারেননি। সালমার এ নিয়ে ৩টা বই প্রকাশিত হয়েছে। এ বছর বইমেলায় এসেছে তার গল্পগ্রন্থ ‘দহন’। নতুন লেখকদের জন্য তার আহ্বান, জীবনে কোথাও না থেমে সময় পেলে মানুষের জন্য, দেশের জন্য কিছু করা দরকার। এর জন্য লেখালেখি হতে পারে শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। তিনি হাসতে হাসতে বলেন, বই হাতে পাওয়ার পর মনে হয়েছে আজ যেন ঈদের দিন।

তার অনুভূতির রেশ অনুভব করতে না করতেই কথা হলো লুনা নুসরাতের সাথে। হাসিখুশি মেয়েটি জানায় কখনো ভাবিনি লেখালেখি করব। অনেকে যেমন ছোটবেলায় লেখে আমি তেমন কিছুই লিখিনি। এখন বই যেহেতু সবসময় পড়ার সুযোগ পাই না। তাই গাড়িতে জ্যামে বসে ফেসবুকে নানারকম লেখা পড়তে পড়তেই পেন্সিলের সঙ্গে পরিচয়। ছবি তুলতেন তিনি। ছবিগুলোর অনুভূতি দিয়েই প্রথমে ছোট ছোট করে লেখা শুরু করেন পেন্সিলে। সবাই খুব প্রশংসা করলে আত্মবিশ^াসের মাত্রা বাড়তে থাকে। একদিন পোস্ট করেন শোধ নামে এক ধারাবাহিক গল্প। পোস্ট করার আগে ভয়ে ভয়ে এক বন্ধুকে দেখান। তিনি সাহস দেয়ায়, চালিয়ে যান লেখা। সেই যে শুরু আজ তার বই প্রকাশিত হয়েছে একুশে গ্রন্থমেলায়। তার মতে যে যেভাবেই থাকুক না কেন প্রত্যেক মানুষের নিজের জন্য একটা সময় বের করা দরকার, কিছু করা দরকার। তাহলে বিষণœতা আর জায়গা করে নিতে পারে না। তিনি বলেন, যখন কোনো আডডায় বন্ধুরা পরিচয় করিয়ে দেয় ও লুনা খুব ভালো লেখে। তখন আমার খুব ভালো লাগে, চাকরি না করার দুঃখ ভুলে যাই। এটা সম্ভব হয়েছে পেন্সিলের প্লাটফরমের জন্য। এবার মেলায় লেখক সুমী শারমীনের বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা থেকে ৪টা বই বের হয়েছে। সুমী জানান, পরিবারের স্বার্থে চাকরি ছাড়তে হয়েছে। পরে শুরু করেন লেখালেখি। তবে লেখালেখিতে পরিবারের কারো কাছ থেকে কখনো তিনি তেমন কোনো উৎসাহ পান না। তাকে একা একাই সবকিছু করতে হয়। একটু অভিমানের স্বরে বলেন আসলে পরিবারের সবাই একটু আগ্রহ দেখালে এগিয়ে যাওয়াটা মেয়েদের জন্য সহজ হয়। নিয়তি বইয়ের লেখক জুবাইদা পারভীন লিপি জানান, বাবার কাছ থেকে ছড়ার ছন্দ শেখা তার। এরপর ঘরসংসারের পাশাপাশি চলত লেখালেখি। মাঝখানে ছেলে বড় করার সময় নেন বিরতি। এখন ছেলে বড় হয়ে যাওয়ায় আবার সেই লেখালেখিতে ফিরে আসা। এর মধ্যে তার বের হয়েছে কবিতা ও গল্পের বই।

লেখালেখির অঙ্গনে পুরুষের তুলনায় নারীর অংশগ্রহণ এখনো অনেক কম। তবে এবারের বইমেলায় অনেক নারী লেখকের বই এসেছে। যা প্রশংসার দৃষ্টিতে দেখছেন বেসরকারি কর্মকর্তা ও আবৃত্তিকার আরিফ রহমান। তিনি বলেন, ঘরের বউ লিখবে এ ভাবনায় সমাজ একসময় আঁতকে উঠলেও এখন সময় কিছুটা পালটেছে। আর তাইতো যে মেয়েটা কোনোদিনই ভাবেননি তার নিজের নামে বই বের হবে, তিনিও যখন অটোগ্রাফও দেন তখন তার সমাজের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিই পাল্টে যায়। ঘর দোর সামলিয়ে ঘরে থাকা গৃহিণী যখন হাতে তুলে নেন কলম, বসেন পিসির সামনে তখন আশার আলো ছড়িয়ে পড়ে সমাজে। পেন্সিলের কর্ণধার আনোয়ার জানান, শুদ্ধ চর্চা সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ এবং নান্দনিক কিছু সৃষ্টির প্লাটফরম তৈরির স্বপ্ন নিয়ে ২০১৬ সালে সৃষ্টি হয় ফেসবুক ভিত্তিক গ্রুপ পেজ পেন্সিল। এবার বইমেলায় পেন্সিল প্রকাশনা থেকে ৫৪ জন লেখকের বই প্রকাশ করা হয়েছে। তার মধ্যে ৩৮ জনই নারী। এদের মধ্যে রয়েছেন বেশ কয়েকজন গৃহিণী। আনোয়ার জানান, বইগুলো পাঠকপ্রিয়তাও পেয়েছে। কোনো কোনো বই ৩য় সংস্করণেও গেছে বলে তিনি জানান। নারীদের এগিয়ে যাওয়ার সমর্থন করেই পেন্সিলের এই উদ্যোগ। তার মতে নারীদের চলার পথে সমাজের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি যত থাকবে তত তার পথচলা মসৃণ হবে। জাহানারা ইমাম, সেলিনা হোসেন, প্রীতিলতা, সুফিয়া কামাল, ইলা মিত্র আর বেগম রোকেয়ার এ দেশে নারীরা সব প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে এগিয়ে যাক। দুহাত ভরে লিখে তারা আলোকিত করুক চারধার।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj