অগ্রিম শ্রম বিক্রিতেও মেলে না ন্যায্য মজুরি : মো. মাজেম আলী মলিন

সোমবার, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০

এসএসসির ফরম পূরণের সময়। অনিমা ওরাঁওয়ের পরিবারে নগদ অর্থকড়ি ছিল না। অনিমার মা অঞ্জনা ওরাঁও দিনমজুরি করে যা আয় করেন তাতে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকাই কঠিন। সেই অভাবের সংসারে অনিমার মা ফরম পূরণের টাকার জোগান দিতে ব্যর্থ হন। কিন্তু লেখাপড়ার প্রতি অনিমার বেজায় ঝোঁক। নিজের ফরম পূরণের টাকা জোগাড় করতে অনিমা অগ্রিম শ্রম বিক্রি করেন। গ্রাম্য মহাজনের কাছ থেকে অর্ধেক মজুরিতে অগ্রিম শ্রম বিক্রি করেন, সেই টাকাতেই অনিমার ফরম পূরণ হয়। এসএসসিতে অনিমা বেশ ভালো ফলাফল করেছেন। কলেজে ভর্তির আগে মহাজনের সেই টাকা পরিশোধে অনিমা কৃষি জমিতে কাজ করেন। তবে অনিমা জানান, অভাবে পড়ে তিন মাস আগে ১৫০ টাকা মজুরিতে অগ্রিম শ্রম বিক্রি করতে হয়েছিল। সময়মতো শ্রম বিক্রি করলে মজুরি হতো ২৫০ টাকা। তাও পুরুষের তুলনায় অনেক কম।

অনিমা আক্ষেপ করে বলেন, একই সমান কাজ করে পুরুষ শ্রমিকরা ৫০০ টাকা মজুরি পায়। তাদের ক্ষেত্রে একই কাজ করে মজুরি হয় অর্ধেক। অনিমা তথাকথিত এই বৈষম্যপূর্ণ সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন দাবি করেন।

নাটোরের চলনবিলের বিভিন্ন মাঠে ও বাসাবাড়িতে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বেশির ভাগ নারী কৃষি কাজে নিয়োজিত। পুরুষের চেয়ে নারী শ্রমিকরাই বেশি মজুরি বৈষম্যের শিকার।

নারী শ্রমিকরা জানান, কর্মক্ষেত্রে মজুরির বৈষম্য জেনেও জীবিকার তাগিদে তারা কাজ করে যাচ্ছেন। তবে পুরুষ শ্রমিকের সঙ্গে সমান তালে কাজ করলেও কখনো কখনো পুরুষ সহকর্মী কিংবা মালিক পক্ষের হাতে লাঞ্ছনায় শিকার হতে হয় তাদের। এমনকি অনেক সময় নারী বলে কাজে নিতেও আপত্তি জানান মালিক পক্ষ। কাজের ধরন ও সময় অনুসারে মজুরি নির্ধারণ করা হলেও নারীরা প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে পুরুষ শ্রমিকের অর্ধেক কিংবা তারচেয়েও কম মজুরি পান। পুরুষ শ্রমিক দৈনিক ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মজুরি পেলেও নারী শ্রমিককে দেয়া হয় দেড়শ থেকে আড়াইশ টাকা।

চলনবিলে কাজ করতে আসা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারী শ্রমিক শ্যামলী রানী ও আল্পনা রানী জানায়, সকাল থেকে ৪টা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন শ্রম দিয়ে তারা নামমাত্র মজুরি পাচ্ছেন। তাতে কোনো রকমে বেঁচে রয়েছেন তারা।

গুরুদাসপুরের চাপিলা ইউনিয়নের আদিবাসী সুমতী মাহাতো জানান, ভাদ্র, আশ্বিন ও কার্তিক মাসে তাদের কোনো কাজ থাকে না। এ সময় অর্থ সংকটে পড়ে অল্প দামে অগ্রিম শ্রমও বিক্রি করতে হয়। কিংবা চড়া সুদে টাকা নিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে অনেকেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ওই দলের অনিমা ওঁড়াও ও রূপালী কেরকাটা জানান, দ্রব্যমূল্যের দাম যে হারে বাড়ছে তার তুলনায় আমাদের এই মজুরিতে সংসার চলে না। তাই মজুরি বৈষম্য থেকে মুক্তি চান তারা।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj