শীতে শিশুর স্বাস্থ্য সমস্যা : ডা. এম এ লতিফ বকসী

শুক্রবার, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০

শীতে শিশুদের সর্দি-কাশি হবে, এটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সর্দি-কাশির কারণে রোটা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ডায়রিয়ায় শিশুর মৃত্যু হতে পারে, তা অনেকেরই অজানা। গরম, শীত বা বছরের যে কোনো সময় অনেক কারণেই শিশুর ডায়রিয়া হতে পারে। এখন ঘরে ঘরে শিশুরা সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হচ্ছে। শিশুদের সর্দি-কাশি নিয়ে অবহেলা করার সুযোগ নেই। শীত এলে হাসপাতাল ভরে যায় ডায়রিয়া ও ঠাণ্ডাজনিত রোগে। বিশেষ করে মহাখালী কলেরাসহ বিভিন্ন হাসপাতালের ডায়রিয়া ইউনিটে গেলে দেখা যায় এর প্রকৃত অবস্থা। প্রতি বছর যেসব রোগী ডায়রিয়ার কারণে চিকিৎসা গ্রহণ করে তার প্রায় ৮০ ভাগই শিশু। এদের বয়স ২ থেকে ৫ বছরের মধ্যে। খাবার স্যালাইনের সুবাদে এখন আর ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু তেমন হয় না, কিন্তু সময়মতো এর চিকিৎসা করা না হলে ডায়রিয়া শিশু মৃত্যুর অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

শিশু যাতে শীতের দিনে সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত না হয়, সেদিকে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। তবে শিশুর ডায়রিয়া হলে প্রাথমিক চিকিৎসা পরিবার থেকেই দিতে হবে। ডায়রিয়ার লক্ষণ দেখা দিলেই শিশুকে খাবার স্যালাইন ঘন ঘন খাওয়াতে হবে। স্যালাইন ঘরে না থাকলে হাতে তৈরি স্যালাইন প্রাথমিকভাবে শিশুকে দিতে হবে। এক চিমটি লবণ, ২০ গ্রাম বা এক মুঠো চিনি বা গুড়, এক লিটার পানিতে গুলিয়ে ভালোমানের খাবার স্যালাইন তৈরি করা যায়। এভাবে প্রাথমিকভাবে শিশুর জীবন রক্ষা করা সম্ভব। মনে রাখতে হবে স্যালাইনের মাধ্যমে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশুর জীবন অতি সহজে রক্ষা করা গেলেও অসাবধানতার কারণে শিশুর মৃত্যু হতে পারে।

ভাইরাসজনিত কারণে ডায়রিয়া হলে উপযুক্ত চিকিৎসা ও যতেœ তিন দিনেই সেরে যায়। তবে ডায়রিয়া তিন দিনের বেশি থাকলে সঙ্গে জ্বর বা পায়খানার সঙ্গে রক্ত থাকলে বা অতিরিক্ত বমি হলে সময় নষ্ট না করে রোগীকে হাসপাতালে বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিতে হবে।শীতকালীন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশুর বিষয়ে সচেতন না হলে বিপজ্জনক হতে পারে। ডায়রিয়া জন্য সাধারণ করণীয় হচ্ছে- শিশুকে খাবার স্যালাইন ও অন্যান্য তরল খাবার বেশি করে দিতে হবে; এর পাশাপাশি শিশু স্বাভাবিক খাবার খেতে থাকবে; শিশুকে মায়ের বুকের দুধ অবশ্যই দিতে হবে, অনেকের ভুল ধারণা আছে শিশুর ডায়রিয়া হলে শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো একেবারেই বন্ধ করে দেয়, এটা শিশুর জন্য বিপজ্জনক এবং খুবই ক্ষতিকর; ডায়রিয়া নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে রোগীকে অবশ্যই নিকটস্থ হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে নিতে হবে। ডায়রিয়া রোগীর জন্য ডাবের পানি, ভাতের মাড়, চিড়ার পানি, ডালের পানি, চালের গুঁড়ার জাউ ইত্যাদি।

শিশুদের ডায়রিয়া থেকে রক্ষা করতে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করা একান্ত জরুরি। রান্নায় বিশুদ্ধ পানির ব্যবহার করতে হবে; খাবার টাটকা থাকতেই খেতে হবে; বাসি ও পচা খাবার খাওয়া উচিত নয়; ফ্রিজ না থাকলে খাবার ভালোভাবে গরম করে সংরক্ষণ করতে হবে; অরক্ষিত বা ময়লাযুক্ত খাবার খাওয়া উচিত নয়, এতে ডায়রিয়া বা ভাইরাসজনিত জন্ডিস হওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি; স্যানিটারি ল্যাট্রিন ব্যবহার করতে হবে, এতে রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়। কারো ডায়রিয়া হলেও তা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়। খাবার সব সময় ঢেকে রাখতে হবে। খোলা খাবারে মাছি বসে রোগজীবাণু অতি সহজে ছড়াতে পারে। বাড়ি ঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। শিশুদের হাতের নখ নিয়মিত কেটে দিতে হবে, জামা কাপড় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। খাবার আগে এবং মলত্যাগের পর ভালোভাবে সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার করাতে হবে। শিশুদের এ ব্যাপারে অভ্যস্ত করতে হবে।

যদি কোনো শিশু ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়, তাহলে করণীয় সম্পর্কে প্রতিটি অভিভাবককে সচেতন থাকতে হবে। নিতে হবে উপযুক্ত ব্যবস্থা। তবে আগে বুঝতে হবে ডায়রিয়ার লক্ষণ। শিশু যদি ঘন ঘন পাতলা পায়খানা করে, বমি করে, ঘন ঘন মানে দিনে বা প্রতি ২৪ ঘণ্টায় তিন বারের বেশি পাতলা পায়খানা করে; এতে শিশুর শরীর থেকে প্রয়োজনীয় পানি এবং লবণজাতীয় পদার্থ বেরিয়ে যায়। রোগীর শরীরে দেখা দেয় নানা জটিলতা। তাই সবসময় কয়েকটি খাবার স্যালাইনের প্যাকেট ঘরে রাখতে হবে।

ডায়রিয়ার জন্য পানি অনেকটা দায়ী। পুকুর, নদী, খাল-বিল, ক‚প অথবা কোনো খোলা স্থান থেকে পানি সংগ্রহ করে তা বিশুদ্ধ করে পান করা যায়। পানি সংগ্রহ করে প্রথমে পরিষ্কার কাপড় বা ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে নিতে হবে। একনাগাড়ে ৩০ মিনিট পানি ফুটাতে হবে, বুদবুদ উঠলে আরো ১০ মিনিট ফুটাতে হবে। এছাড়া ১০ লিটার পরিমাণ পানিতে ১৫ মিলিগ্রামের ২টি পানি বিশুদ্ধকরণ বড়ি অথবা ৩২ ফোঁটা বা ২ মিলি লিটার ক্লোটেক ভালোভাবে মিশিয়ে কমপক্ষে আধা ঘণ্টা পরে পানি পান করা যায়।

ডায়রিয়া একটি সাধারণ রোগ হলেও অসাবধানতায় শিশুর মৃত্যুর কারণ হতে পারে। গরম ও শীতে শিশুর বাড়তি যতœ, সাবধানতা অবলম্বন, বিশুদ্ধ পানি, টাটকা ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে অতি সহজেই শিশুকে ডায়রিয়ার হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব।

পরামর্শ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj