নারী ও মহানুভব বঙ্গবন্ধু

সোমবার, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০

বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দেশের মানুষের প্রতি তার উপলব্ধিও ছিল পিতার মতো। তিনি সারাজীবন বৈষম্যমুক্ত সমাজ ও রাষ্ট্র গড়তে সংগ্রাম করেছেন। সমাজ সংস্কার বিশেষ করে নারী অধিকার রক্ষায়ও তার ছিল অসামান্য অবদান। নারী-পুরুষের সমতা, নারীর ক্ষমতায়ন-নারীর সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর অবদানের কিছু দিক সম্পর্কে বিশিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নিয়ে সাজানো হয়েছে অন্যপক্ষের এবারের আয়োজন। প্রতিবেদক সেবিকা দেবনাথ।

বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘নারীদেরও পুরুষদের মতো সমান অধিকার এবং তা রাজনীতির ক্ষেত্রেও। আওয়ামী লীগ যেমন অসাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাস করে তেমনি নর-নারীর সমান অধিকারেও বিশ্বাস করে। আওয়ামী লীগেও নারী নেতৃত্ব গড়ে তোলা দরকার।’ নিজের এই বক্তব্যের প্রতিফলন বঙ্গবন্ধু ঘটিয়েছিলেন দলের ভেতরে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায়। তার রাজনীতির সঙ্গে প্রথম থেকেই কিছু নারী নেতৃত্বের নামও আমরা জানতে পারি। যেমন- বদরুন্নেছা, আমেনা বেগম, জোহরা তাজউদ্দীন, বেগম নূরজাহান মুরশিদ প্রমুখ।

স্বাধীনতা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর খুব কাছে থেকে রাজনীতি করেছেন এবং মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছেন জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান অধ্যাপক মমতাজ বেগম এডভোকেট। তিনি বলেন, সেসময় নারী আন্দোলন এতটা শক্তিশালী ছিল না। কিন্তু বঙ্গবন্ধু প্রথম থেকেই নারীর ক্ষমতায়নের দিকে নজর দিয়েছিলেন। ১৯৭২-এর সংবিধানে বঙ্গবন্ধু নারী-পুরুষের সমঅধিকার নিশ্চিত করেছেন। ১৯৭২ সালে প্রণীত প্রথম ও মূল সংবিধান এবং পরবর্তী সময়ে কয়েকটি সংশোধনীতে নারীদের বাড়তি সুযোগ-সুবিধা ও সংরক্ষিত অধিকার দেয়ার কথা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সংযোজন করা হয়। সংবিধান জাতীয় সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য ৬৫নং ধারার মাধ্যমে সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করে। ১৯৭৩ সালে সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা ছিল ১৫টি। সাধারণ আসনের নির্বাচনেও নারীদের প্রতিদ্ব›িদ্বতা করায় কোনো বাধা রাখা হয়নি। এ আসনগুলো দশ বছরের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়। জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে নারীদের উৎসাহিত করা এবং নারীর সম্ভাবনাময় নেতৃত্বের যোগ্যতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৭৩ সালে দুজন নারীকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে বন্যা প্রতিরোধক বাঁধ নির্মাণকাজের উদ্বোধন করতে বঙ্গবন্ধু যান পাবনার বেড়া উপজেলার বসন্তপুর গ্রামে। ওই অনুষ্ঠানে কয়েকজন নারী বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে তাদের নির্যাতিত হওয়ার ভয়ঙ্কর সব ঘটনার কথা বলেন। তাদের কথায় বঙ্গবন্ধুর চোখ ছলছল করে উঠে। তাদের পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আদেশ দেন বঙ্গবন্ধু। পরে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু বলেন, “আজ থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দ্বারা নির্যাতিতা মহিলারা সাধারণ মহিলা নয়, তারা এখন থেকে ‘বীরাঙ্গনা’ খেতাবে ভূষিত। কেননা দেশের জন্যই তারা ইজ্জত দিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের চেয়ে তাদের অবদান কম নয় বরং কয়েক ধাপ উপরে, যা আপনারা সবাই জানেন, বুঝিয়ে বলতে হবে না। তাই তাদের বীরাঙ্গনার মর্যাদা দিতে হবে এবং যথারীতি সম্মান দেখাতে হবে। আর সেই সব স্বামী বা পিতাদের উদ্দেশ্যে আমি বলছি যে, আপনারাও ধন্য। কেননা এ ধরনের ত্যাগী ও মহত স্ত্রীর স্বামী বা পিতা হয়েছেন। তোমরা বীরাঙ্গনা, তোমরা আমাদের মা।” বঙ্গবন্ধু প্রথম পঞ্চবার্ষিক (১৯৭৩-১৯৭৮) পরিকল্পনায় স্বাধীনতা যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা, সমাজকল্যাণ বিভিন্ন কর্মসূচি গৃহীত হয়।

এ প্রসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা ও মানবাধীকার কর্মী রোকেয়া কবীর বলেন, বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘ধর্ষিতা মেয়ের বাবার নামের জায়গায় আমার নাম লিখে দাও। আর ঠিকানা লেখ ধানমণ্ডি ৩২…। মুক্তিযুদ্ধে আমার মেয়েরা যা দিয়েছে সেই ঋণ আমি কিভাবে শোধ করব?’ স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু নির্যাতিত নারীদের ‘বীরাঙ্গনা’ খেতাবে ভূষিত করেন। তিনি এভাবে নারীদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। ব্যক্তি জীবনে বঙ্গবন্ধু তার স্ত্রী ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের পরামর্শ গুরুত্বসহকারে গ্রহণ করতেন।

একাত্তর সালে নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত নারী ও শিশুদের পুনর্বাসন এবং আবাসনের জন্য বঙ্গবন্ধু গড়ে তুলেছিলেন বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় মহিলা পুনর্বাসন সংস্থা। কবি সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছিল সেই সংগঠন। সেই সংস্থার পরিচালক ছিলেন সমাজকর্মী মালেকা খান। তিনি বলেন, দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, যেসব শিশু জন্মাবে তাদের জন্মাতে দাও। অনেক দম্পতি সন্তানের জন্য হাহাকার করে। তাদের সেই শিশুদের দেয়া যেতে পারে। ১৯৭২ জুড়ে দেশে অনেক যুদ্ধশিশুর জন্ম হয়। বীরাঙ্গনা ও যুদ্ধশিশুদের গ্রহণে সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের মানুষ প্রস্তুত ছিল না। বঙ্গবন্ধু সরকার এ সময় বিদেশে যুদ্ধশিশুদের দত্তকের ব্যবস্থা করেন। এর জন্য প্রয়োজন ছিল আইনের। এই সমস্যা সামাধানে তিনি আন্তর্জাতিক শিশু দত্তক আইন এবং গর্ভপাত আইন নামে দুটি অধ্যাদেশ জারি করেন।

তিনি জানান, বাংলাদেশের পরিবার পরিকল্পনা সমিতি, বাংলাদেশ সেন্ট্রাল অর্গানাইজেশন ফর রিহ্যাবিলিটেশন, মাদার তেরেসার মিশনারিজ অব চ্যারিটির মাধ্যমে বহু যুদ্ধশিশুকে বিদেশে দত্তক দেয়া হয়। এই প্রতিষ্ঠানগুলো দত্তক হয়নি এমন শিশুদের বিভিন্ন শিশুসদনে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়।

কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বলেন, বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়লে বুঝতে পারা যায় নারীদের ব্যাপারে তার কী ধরনের ধারণা ছিল। ’৫২’র ভাষা আন্দোলনে নারীদের অংশগ্রহণ নিয়ে তিনি লিখেছিলেন। ’৫৪ সালের নির্বাচনে এক বৃদ্ধার কথাও তিনি বলেন যার কথা বঙ্গবন্ধুর লেখায় উঠে এসেছে। নারীর মর্যাদা কখনো হেয় করেননি বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু কখনো নির্যাতিত নারী শব্দটি উচ্চারণ করেননি। নারীরা মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন। তিনি নারীদের ন্যায়ের পক্ষে সর্বদা অবস্থান নিয়েছিলেন। যুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাত্মক সহায়তা দিয়েছিলেন এদেশের বীর নারীরা।

নারীদের সামাজিক সম্মান নিশ্চিত করতেও বঙ্গবন্ধু নিয়েছিলেন নানা উদ্যোগ। ১৯৭৪ সালে মুসলিম বিবাহ এবং বিবাহ রেজিস্ট্রিকরণ আইন প্রণীত হয়েছিল। যৌতুক প্রথা উচ্ছেদে বঙ্গবন্ধু বাংলার যুবকদের আহ্বান জানান যে, তারা যেন কোনো যৌতুক না নিয়ে একটি বেলি ফুলের মালা নিয়ে বধূবরণ করেন। নারী উন্নয়নকে গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি এ খাতে অর্থ বরাদ্দ দেয়া।

নারীদের সম্মান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম নারী সংগঠন মহিলা সংস্থার ভিত্তি রচনা করেন। শিশু ও কিশোরীদের আত্মমর্যাদাবোধ প্রতিষ্ঠা, দেশপ্রেম ও নৈতিকতার শিক্ষায় শিক্ষিত করতে বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তান গার্লস গাইড এসোসিয়েশনকে ঢেলে সাজান এবং পুনর্গঠিত করেন।

শহীদদের স্ত্রী ও কন্যাদের জন্য চাকরি ও ভাতার ব্যবস্থা করা, মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি, প্রজনন স্বাস্থ্য, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধসহ আরো অনেক ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা, মেধা, মহানুভবতা এবং প্রজ্ঞার ছাপ স্পষ্ট।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj