স্কুলপড়–য়া প্রজাপতি

বুধবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২০

পাখি আর ছড়া : মেহেরুবা নিশা

– বাবা, প্রজাপতি কি স্কুলে যায়?

– প্রজাপতি! স্কুলে! না মা!

চার বছরের ছোট্ট ছড়ার প্রশ্ন শুনে অবাক বাবা!

– তাহলে পাখি? পাখি স্কুলে যায়?

– না তো! কোন পাখিকেও তো স্কুলে যেতে দেখিনি!

– তাহলে আমিও যাব না।

কি মুশকিল! গতকাল ছড়াকে স্কুলে ভর্র্তি করানো হয়েছে। আগামীকাল তার প্রথম ক্লাস। কিন্তু সে কিছুতেই স্কুলে যেতে চাইছে না!

বাবা বললেন- মামণি, তুমি তো মানুষ! মানুষকে স্কুলে যেতে হয়।

– তুমি যে আমাকে প্রজাপতি বলো! আর মামণি পাখি বলে!

বাবা এবার চুপ। আদর করে তিনি মেয়েকে লক্ষী প্রজাপতি বলে ডাকেন। মামণি ডাকেন মিষ্টি পাখি বলে। সে কথাই এখন বলছে দুষ্টু মেয়েটা!

রাতে শুয়ে শুয়ে কত গল্প শোনাল তাকে মামণি। বলল- জানো মা, আমিও ছোটবেলায় স্কুলে যেতাম। কত্ত বন্ধু ছিল আমার! খেলা করতাম আর কত কিছু যে শিখতাম সারাদিন!

– পড়তে না মামণি?

– হুম, পড়তামও!

– লিখতে?

– হ্যাঁ, লিখতামও।

– আর ছবি আঁকতে না?

– হুম, তা-ও আঁকতাম।

– এখন তাহলে যাও না কেন?

– এখন তো আমি বড় হয়ে গেছি। তাই।

– তাহলে আমিও যাব না। আমিও বড় হয়ে গেছি। তুমিই তো বলেছো!

মামণি এবার চুপ। সেদিন তিনি ওকে ভাত মেখে নিজে নিজে খেতে বলেছিলেন। বলেছিলেন, বড় হয়ে গেলে নিজে নিজে খেতে হয়। সে কথাই এখন বলছে দুষ্টু মেয়েটা!

কত কিছু করে, কত কথা বলে তাকে বোঝানো হচ্ছে! কিন্তু সে কিছুতেই স্কুলে যেতে চাইছে না। মামণি আর বাবাকে রেখে সে কি করে স্কুলে যাবে? আর তার খেলনা ক্যান্ডি ডল? ছোট্ট বেড়াল পিপি? বারান্দার টবে শিউলি ফুলগাছটা? এরাই বা ওকে ছেড়ে থাকবে কি করে? সারাদিন তো ওদের সঙ্গে খেলা করেই দিন কাটে তার! এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল ছোট্ট মেয়েটা।

হঠাৎ মিষ্টি একটা গন্ধে ঘুম ভাঙল ছড়ার। চোখ মেলতেই দেখে একটা ছোট্ট প্রজাপতি উড়ে বেড়াচ্ছে ঘরে। প্রজাপতিটার ঠোঁটে একটা ফুল। কি মিষ্টি তার ঘ্রাণ! উড়ে উড়ে এবার প্রজাপতিটা ওর হাতের ওপর বসল। আর ফুলটা দিয়ে বলল- কেমন আছো ছড়া?

প্রজাপতির মুখে মানুষের মতো কথা শুনে অবাক হলো সে।

বলল- আরে! তুমি কথা বলতে পারো?

– হুম। শুধু কথা না। আমি ছড়াও বলতে পারি। শুনবে?

– শোনাও তো।

প্রজাপতিটা যখন ছড়াকে ছড়া শোনাচ্ছিল, ঠিক তখনই কোথা থেকে যেন উড়ে এল এক পাখি। পাখির কাঁধে ব্যাগ। সে এসেই কিচির-মিচির শুরু করে দিল।

ছড়া ওর ছোট্ট আঙুল ঠোঁটে ঠেকিয়ে বলল- শ্শশ্ আস্তে পাখি, আস্তে। বাবা আর মামণি ঘুমাচ্ছে তো!

পাখি বলল- এখনো ঘুমাচ্ছে? এদিকে তো আমাদের স্কুলে যাওয়ার সময় হয়ে এল। এই প্রজাপতি, তুমি স্কুলে যাবে না? চল, চল।

ছড়া অবাক হয়ে বলল- আরে! তোমরা স্কুলে যাও?

পাখি বলল- হ্যাঁ। যাইতো।

-বাবা যে বলে পাখিরা স্কুলে যায় না! প্রজাপতিরাও না!

– বাবা ঠিকই বলেছে। কারণ, যখন আমরা স্কুলে পড়তে যাই, তখন তো আর পাখি বা প্রজাপতি হয়ে থাকি না। বলল প্রজাপতি।

– তাহলে?

পাখি বলল- মানুষের কাছে গেলে আমরা মানুষ হয়ে যাই।

– তাহলে আমার কাছে এলে কি করে?

– তুমি তো এখন একটা প্রজাপতি! প্রজাপতিটা বলল।

নিজের দিকে তাকিয়ে ছড়া তো অবাক! তাইতো! সে তো একটা প্রজাপতিই! কি সুন্দর রঙিন দুটো পাখা তার!

এবার তো তুমি পাখি হয়ে যাচ্ছো! পাখিটা বলল।

ছড়া এবার তাকিয়ে দেখল যে সে সত্যি সত্যি একটা পাখি হয়ে যাচ্ছে! এইতো তার দুটো ডানা, আর কি সুন্দর ছোট্ট একটা ঠোঁট!

পাখি বলল- আসলে তুমি তো একটা পাখি।

– আর প্রজাপতিও। প্রজাপতিটা বলল।

শুধু যখন বাবা-মামণি আর অন্য মানুষের সঙ্গে থাকো, তখন তোমাকে মানুষের মতো দেখায়। -পাখিটা বলল।

ছড়া মনে মনে ভাবল, বাবা আর মামণি যে তাকে আদর করে প্রজাপতি আর পাখি বলে ডাকে, তা তো ঠিকই! সে তো আসলেই একটা প্রজাপতি, একটা পাখি, আবার মানুষও!

হঠাৎ প্রজাপতি চিৎকার করে উঠল- এই পাখি, এই, জলদি চলো, স্কুলে যেতে দেরি হয়ে যাচ্ছে।

ছড়া বলল- তোমরা আর আসবে না? আর দেখব না তোমাদের?

পাখি বলল- নিশ্চয়ই। কাল স্কুলে গেলেই তুমি দেখতে পাবে আমাদের। তুমি যে স্কুলে ভর্তি হয়েছো, সে স্কুলেই পড়ি আমরা। তবে স্কুলে আমরা পাখি আর প্রজাপতি হয়ে থাকব না। মানুষের সঙ্গে থেকে মানুষ হয়ে যাব।

এই বলে ওরা উড়ে চলে যেতে লাগল।

ছড়া চেঁচাতে থাকল- দাঁড়াও, দাঁড়াও, আমাকেও নিয়ে যাও। আমিও স্কুলে যাব।

ছড়ার চিৎকারে ঘুম ভাঙল মামণির। সে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে চিৎকার করে বলছে- আমাকেও নিয়ে যাও। আমিও স্কুলে যাব।

নিশ্চয়ই কোনো স্বপ্ন দেখেছে! ভাবল মামণি। তিনি ওকে ঘুম থেকে ডেকে তুললেন। ঘুম থেকে উঠে চোখ কচলাতে কচলাতে ছড়া বলল- মামণি, পাখি আর প্রজাপতিও স্কুলে যায়। আমিও যাব।

মামণি তো অবাক। এত কথা বলে, এত কিছু করেও যাকে স্কুলে যেতে রাজি করানো যাচ্ছিল না, সে এমনি এমনি রাজি হয়ে গেল!

আসলে তো আর এমনি এমনি না! রাতে স্কুলপড়–য়া পাখি আর প্রজাপতিটা এসেছিল না ওর কাছে, ওদের জন্যই তো সে স্কুলে যেতে চাইল! কিন্তু এই কথাটা কি আর মামণিকে বলা যাবে? যাবে না। কারণ, মামণি তা বিশ্বাসই করবে না! বড়রা তো এমনই! ছোটদের কথা বিশ্বাসই করতে চায় না!

ইষ্টিকুটুম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj