নগরে নারীর নিরাপত্তা : প্রতিশ্রæতি ও বাস্তবতা

সোমবার, ২৭ জানুয়ারি ২০২০

সেবিকা দেবনাথ

পরিবার থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট, গণপরিবহন, কর্মক্ষেত্র কোথাও নিরাপত্তা নেই নারীর। গণপরিবহনেও ঘটছে ধর্ষণের মতো ঘটনা। রাজধানী ঢাকাসহ সবখানে রাস্তায়, পথেঘাটে, বিশেষ করে সন্ধ্যার পর নারীর নিরাপত্তার বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে সবাইকে। আসন্ন ঢাকার দুই সিটি কপোরেশনের নির্বাচনের প্রার্থীরাও এই বিষয়টিকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। দিচ্ছেন নারীর জন্য নিরাপদ নগরী গড়ে তোলার প্রতিশ্রæতি।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা একশনএইড বাংলাদেশ বছর চারেক আগে ‘নিরাপদ নগরী, নির্ভয় নারী’ শিরোনামে একটি গবেষণা প্রতিবেদনে নারীর জন্য নিরাপদ নগরীর একটি ধারণা দিয়েছে। গবেষণা বলছে, নিরাপদ নগরী সেটিই, যেখানে নারী সহিংসতা ও বৈষম্যের শিকার হন না। নারী নিজেকে একঘরে মনে করেন না। ভয় বা হয়রানি ছাড়া তিনি জীবনযাপন করেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আশ্রয় ও পানি পান। মনের আনন্দে চিত্তবিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নেন। এখানে নারী বলতে ওই নারীর জন্ম হতে পারে শহরে অথবা তিনি অভিবাসীও হতে পারেন, হতে পারেন ছাত্রী বা পর্যটক। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। গবেষণা বলছে, নারীর প্রতি সহিংসতা নিরসনে বাংলাদেশে সমন্বিত আইন আছে। তবে গণপরিসরে নারীদের যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট আইন নেই। আবার যে আইন আছে সেখানে যৌন হয়রানি বন্ধে সরাসরি কোনো বিধান নেই। যে কারণে জনপরিসরে যৌন হয়রানি হলে আইনিভাবে প্রতিকার খুবই কম পান নারীরা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অবস্থার উন্নতিতো হয়ইনি বরং পরিস্থিতি আরো জটিল ও অবনতি ঘটেছে।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য- এসডিজির ৫ ধারায় লিঙ্গ সমতা এবং নারী ক্ষমতায়নের কথা বলা হয়েছে। এ লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যমে নারীদের সব বৈষম্য ও সহিংসতা দূরীকরণ, গৃহস্থালি কাজের স্বীকৃতি প্রদান, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ও নেতৃত্বের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে উপযুক্ত ও প্রয়োগযোগ্য আইন প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে।

২০১৯ সালের আগস্ট মাসে বিশ্বের নিরাপদ শহরগুলোর এক তালিকা প্রকাশ করে ব্রিটিশ গবেষণা ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ)। শহরগুলোর ডিজিটাল নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যগত নিরাপত্তা, অবকাঠামোগত নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এই চারটি বিষয়কে নির্বাচন করে নিরপাদক শহরের তালিকায় দেখা গেছে অনিরাপদ শহরের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম।

একশন এইড বাংলাদেশ-এর তথ্য মতে, ধর্ষণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের কারণে রাতে ঘর থেকে বাইরে যেতে চান না ৬২ শতাংশ নারী। এ ছাড়া একা ঘরের বাইরে যেতে চান না ৬০ শতাংশ, নির্দিষ্ট এলাকা এড়িয়ে চলেন ৪৭ শতাংশ, নির্জন ও জনবহুল স্থান এড়িয়ে চলেন ২৬ শতাংশ, গণপরিবহনে চড়া এড়িয়ে চলেন ১৩ শতাংশ এবং রঙিন পোশাক পরা ছেড়ে দিয়েছেন ২১ শতাংশ নারী। আর জাতীয় কন্যাশিশু এডভোকেসি ফোরামের তথ্য মতে, প্রায় ৯৮ শতাংশ নারী ও কন্যাশিশু পাবলিক প্লেসে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ঢাকা সিটিতে বসবাসরত নাগরিকদের নাগরিক অধিকার ক্রমান্বয়েই হারিয়ে যেতে বসেছে। এর সঙ্গে নারীর নিরাপত্তাহীনতা ঘরে-বাইরে প্রতিটি ক্ষেত্রে চরমে পৌঁছেছে। নাগরিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সিটি করপোরেশন নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই নির্বাচনের মাধ্যমে নাগরিকদের হারানো অধিকার ফিরে আসুক এবং ঢাকা নগর নারী বান্ধব হিসেবে, নারীর জন্য নিরাপদ নগর হিসেবে গড়ে উঠুক এমনটাই আমাদের প্রত্যাশা।

মানবাধিকার কর্মী খুশী কবির বলেন, বাংলাদেশের নগরের নাগরিকরা প্রাপ্ত অধিকার থেকে বঞ্চিত। সেখানে নারীরা আরো বেশি বৈষম্যের শিকার। নগরের নারীরা বিভিন্ন ধরনের পেশায় যুক্ত থাকায় গতিশীলতা বেড়েছে। তবে নারীরা রাস্তাঘাটে, গণপরিবহনে, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাবে বিভিন্ন সহিংসতার শিকার হচ্ছে। রাজধানীসহ জেলা শহরগুলো নারীদের জন্য নিরাপদ নয়। অন্দরমহলেও তারা ধর্ষণসহ নানা ধরনের যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।

নারীর জন্য নিরাপদ নগর গড়তে করণীয় বিষয়ে স্থপতি ও বিশিষ্ট নগর পরিকল্পনাবিদ মোবাশ্বের হোসেন বলেন, ঢাকার প্রত্যেক এলাকায় নারীদের জন্য নিরাপদ টয়লেটের ব্যবস্থা থাকতে হবে, ফুটপাত দখলদার মুক্ত করতে হবে, গণপরিবহন ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে।

একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, নগরের অর্ধেক জনসংখ্যা নারী হলেও নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়নে নারীর চাহিদা ও আকাক্সক্ষার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনায় আসে না। নগর উন্নয়নে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পরিকল্পনা প্রণয়ন, প্রকল্প ডিজাইন, বাস্তবায়ন ইত্যাদি বেশিরভাগ কাজে নারীদের সংখ্যা কম থাকায় নারী ব্যবহার বান্ধব নগর কাঠামো তৈরি হয় না। ফলে রাস্তাঘাট, ফুটপাত, মার্কেট, শপিংমল, পরিবহন ব্যবস্থা, পাবলিক টয়লেট, পার্ক, উন্মুক্ত স্থানসহ সব গণপরিসরে নারীদের ব্যবহার উপযোগিতা সীমিত ও ঝুঁকিপূর্ণ।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj