মির্জাপুল বস্তিতে আগুন : দুই শতাধিক ঘর পানির অভাবে ভস্মীভূত

শনিবার, ২৫ জানুয়ারি ২০২০

চট্টগ্রাম অফিস : চট্টগ্রাম নগরীর চরম অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ কলোনির তালিকায় মির্জাপুল এলাকায় ডেকোরেশন গলির নাম নেই। অথচ গতকাল শুক্রবার সকালে ওই এলাকার সেই কলোনিতেই ভয়াবহ আগুনে পুড়ে গেছে বস্তির কয়েকটি কলোনির কমপক্ষে দুই শতাধিক পরিবারের ঘর। শীতের রাতে ঘরহারা এসব মানুষ এখন কোথায় আশ্রয় নেবেন তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। খুব ঘিঞ্জি ও সরু রাস্তার কারণে এবং পানির উৎস না থাকায় আগুন নেভাতে বেগ পেতে হয় ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের। সকাল ১০টায় আগুন লাগলেও সেই আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের প্রায় ৫ ঘণ্টা লাগে। এ কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও বেশি হয়েছে বলে স্থানীয় লোকজন, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা জানিয়েছেন।

নগরের পাঁচলাইশ থানার মির্জাপুল এলাকার শুলকবহরের পুরাতন ওয়াপদা সংলগ্ন ডেন্টাল মেডিকেলের পাশে ডেকোরেশন গলির বাবু কলোনিতে আগুন লাগে। বস্তির আশপাশের বিভিন্ন ভবনের বাসিন্দাদের মধ্যেও আগুনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সাইফ নামে একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, সকাল ১০টার দিকে ওই বস্তিতে আগুনের সূত্রপাতের পর তা ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ওই বস্তিসহ আশপাশের লোকজন আতঙ্কে ছোটাছুটি করেন। দুই থেকে আড়াইশ কাঁচাঘর রয়েছে ডেকোরেশন গলির বাবু কলোনিতে। মূলত নিম্ন আয়ের মানুষ এক কক্ষের এসব বাসায় ভাড়া থাকেন। প্রায় দুই ঘণ্টার আগুনে পুড়ে গেছে কলোনির বেশিরভাগ ঘর। তবে আগুনে কেউ হতাহত হয়নি।

আগ্রাবাদ ফায়ার স্টেশনের উপসহকারী পরিচালক ফরিদ উদ্দিন বলেন, আগুন নেভাতে ফায়ার সার্ভিসের পাঁচটি ইউনিটের ১৫ টি গাড়ি ঘটনাস্থলে গেলেও আগুন নেভাতে কাজ করতে পেরেছে অল্প কয়েকটি গাড়ি। রাস্তা সরু হওয়ার কারণে একসাথে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারেনি অন্য গাড়িগুলো। কাতালগঞ্জ মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল ফায়ার সার্ভিসের আরো ৯টি গাড়ি। দূর থেকে পাইপের সাহায্যে পানি ছিটিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কলোনির গলিগুলো খুব সংকীর্ণ হওয়ায় এবং সরু রাস্তার কারণেই এমন বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়েছে ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সকে। তিনি বলেন, ১১টার দিকে আগুন লাগার খবর পেয়ে আশপাশের সব ফায়ার স্টেশনের গাড়িকে ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। কয়েকটি স্টেশনের ১০-১৫টি গাড়ি পানি ছিটিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা চালায়। ঘিঞ্জি এলাকার কারণে অধিকাংশ গাড়ি ঘটনাস্থলের কাছে যেতে পারেনি। পরে ৮ থেকে ১২টি হোসপাইপ দিয়ে দূর থেকে পানি ছিটিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হলো, তা এখনো জানা যায়নি। বাবু কলোনির যে কোনো ঘর থেকে আগুন লেগে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।

পাঁচলাইশ থানার এসআই মো. আবু তালেব জানান, ডেকোরেশন গলির শেষ মাথায় বাবু কলোনির ভাড়াটিয়া লাকি আক্তারের টিনশেড বেড়ার ঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয় এবং পরে তা শাহনেওয়াজ কলোনি, খোকন কলোনি, শওকত নেওয়াজ কলোনি এবং মো. হোসেন কলোনিতে ছড়িয়ে পড়ে। এতে এসব কলোনির ১৬৩টি টিনশেড বেড়ার ঘর পুড়ে গেছে। তিনি বলেন, আগুনে কেউ হতাহত না হলেও তাড়াহুড়া করে ঘর থেকে বের হতে গিয়ে অনেকের হাতে-পায়ে চোট লেগেছে। তাদের রেডক্রিসেন্টের মাধ্যমে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. কামাল হোসেন বলেন, আগুনে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে দুপুরে খাবার বিতরণ করা হয়েছে। বিকেলে তাদের জন্য শুকনো খাবার এবং কম্বল বিতরণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, দুর্ঘটনায় সম্বল হারানো অসহায় মানুষের পাশে থাকবে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। তাদের সব ধরনের সহায়তা দেয়া হবে। অগ্নিকাণ্ডের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে প্রয়োজনে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।

সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব বস্তির বাসিন্দারা : আগুনে পুড়ে যাওয়া ঘরের বাসিন্দাদের আহাজারিতে চারিদিকের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। মাথার ওপর খোলা আকাশ ছাড়া যেন আর কিছুই রইল না তাদের। সবকিছু হারিয়ে এখন খোলা আকাশের নিচে বস্তিবাসীরা চেয়ে আছে সমাজের বিত্তবানদের দিকে। কিশোরগঞ্জের নুরনবী রাজমিস্ত্রী। স্ত্রী রোকেয়া বেগম গৃহকর্মীর কাজ করেন। এক ছেলে এক মেয়ে নিয়ে ছোট্ট সংসার তাদের, থাকতেন ডেকোরেশন গলির বাবু কলোনিতে। শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় নুরনবী বাসা থেকে বের হননি। স্ত্রী যথারীতি নগরীর সুগন্ধা আবাসিক এলাকায় গিয়েছিলেন কাজ করতে। আগুন লাগার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেন দাউ দাউ জ্বলছে নিজের সাজানো ঘর। খোঁজাখুঁজি করে স্বামী নুরনবীকে পেলেন রেডক্রিসেন্টের মোবাইল চিকিৎসা কেন্দ্রে। স্বামী নুরনবীর পাশেই ছিল তাদের দুই সস্তান। পরিশ্রম করে তিলে তিলে সঞ্চিত সম্পদ মুহূর্তেই ছাই হয়ে গেল। টিভি ও ফ্রিজসহ তার দেড় থেকে দুই লাখ টাকার মালামাল পুড়ে গেছে। চট্টগ্রাম জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা সজীব কুমার চক্রবর্তী বলেন, এখন পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষয়তির পরিমাণ ও পরিবারের সংখ্যা নির্ধারণ করা যায়নি। এগুলো সঠিকভাবে পাওয়া গেলে তাদের আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে।

রিকশাচালক মোহাম্মদ হানিফ বললেন, ‘বস্তির ৩ নম্বর গলির শেষ দিক থেকে আগুন ধেয়ে আসে। আমরা তখন দোকানে আড্ডা দিচ্ছিলাম। চোখের পলকে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের কেউ পানি নিয়ে, কেউ কাদামাটি-বালি নিয়ে দৌড়াচ্ছিলাম। কিন্তু আগুনের কাছে আমরা অসহায় ছিলাম। অল্প সময়ের মধ্যে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি এসে পৌঁছালেও আগুনের কাছে যেতে পারেনি। গাড়ি যদি স্পটে ঢুকতে পারতো তাহলে ক্ষয়ক্ষতি ৩০ ভাগও হতো না।’

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj