যে আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে

শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২০

রেজাউল করিম খোকন

আজ এপ্রিলের ২৮ তারিখ। ১৯৭১ সাল।

গতকাল শেরপুরে পাক হানাদার বাহিনী ঢুকেছে। তাদের দখলে যাওয়ার পর পর এখানকার পরিবেশ পরিস্থিতি পুরোপুরি পাল্টে গেছে। পাকিস্তানি সৈন্যরা ব্যাপক গণহত্যা চালিয়েছে শেরপুরে ঢোকার সময়ে।

সীমান্ত ঘেঁষা হওয়ার পাশাপাশি এখানকার অধিবাসীদের বেশিরভাগ হিন্দু হওয়ায় জগতপুরে গণহত্যা মাত্রাটা একটু বেশি ঘটেছে।

দীনেশ তার বাবা ধরণীকান্ত ও মা সুভাষিণীকে নিয়ে প্রাণ বাঁচাতে বিলের পানিতে ডুব দিয়েছিল। একটানা বেশ অনেকক্ষণ ধরে বুক সমান পানিতে ডুব দিয়ে লুকিয়ে ছিল তারা। খুব কাছেই হানাদার পাক বাহিনী চলে এসেছিল। পানির নিচে নিশ্বাস চেপে একটানা কতক্ষণ আর থাকা যায়। ডুব দিয়ে থাকতে গিয়ে দম বন্ধ হয়ে এসেছিল। আর থাকতে না পেরে বাবা-মা দুজনে পানি থেকে উপরে মাথা তুলেছিলেন বুক ভরে নিশ্বাস নিতে। কিন্তু বিলের পাশেই সে সময় সতর্ক দৃষ্টি নিয়ে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিল পাকিস্তানি সৈন্যরা। হাতে অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত ছিল তারা। বিলের মধ্যে হঠাৎ ভেসে ওঠা ধরণীকান্ত এবং তার বউ সুভাষিণীকে দেখে তারা রাইফেল তাক করে। গর্জে ওঠে রাইফেল। দীনেশের বাবা-মা দুজনেই সঙ্গে সঙ্গে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।

বাবা-মা পানিতে ছটফট করতে করতে মারা গেলেও সন্তান হয়ে দীনেশকে অসহায়ের মতো পানির নিচে ডুব দিয়ে থাকতে হয়। কিছুক্ষণ সময় পেরিয়ে যায় এভাবে। তারপর পানি থেকে সতর্কভাবে মাথা তুলে চারপাশটা দেখে সে। নাহ, হানাদার বাহিনীর লোকজন আশপাশে কোথাও নেই। বিলের পানির নিচে আরো কেউ ডুব দিয়ে লুকিয়ে থাকতে পারে, হানাদারদের ধারণার বাইরে ছিল।

বিলের পানিতে তখন বাবা-মায়ের লাশ ভাসছে, তাদের রক্তে লাল বর্ণ ধারণ করেছে বিলের পানি। পানি থেকে বাবা-মায়ের নিথর দেহ দুটি তুলে আনে দীনেশ। এভাবে চোখের সামনে একসঙ্গে বাবা-মাকে নির্মমভাবে মারা যেতে দেখে বিমূঢ় হয়ে গেছে সে। চিৎকার করে কাঁদতে চাইলেও পারছে না। সব কান্না বুকের মধ্যে আটকে আছে। এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে কী করবে, সে ভেবে পায় না। বিপদ মোকাবেলা করার জন্য আশপাশের কাউকে সাহায্য-সহযোগিতা করতে ডাকবে, তারও কোনো সুযোগ নেই। গ্রামে আশপাশের বাড়িঘরে কেউ নেই এখন।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণে তছনছ হয়ে গেছে পুরো জনপদ। আতঙ্কে-ভয়ে সবাই বাড়িঘর ছেড়ে প্রাণ নিয়ে পালিয়েছে। দীনেশের পরিবারটাই ছিল শুধু। তারাও গ্রাম ছেড়ে দূরে কোথাও নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাবে কালপরশু, ভেবেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর যাওয়া হয়নি। বাবা-মা দুজনকেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। এতবড় দুঃখের বোঝা বইতে অনেক কষ্ট হয় দীনেশের। সারা জীবন এই কষ্টের বোঝা বয়ে বেড়াবে কীভাবে, ভাবতে গিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়ে সে।

গ্রাম থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের ক্যাম্পে ফিরে গেলে বাড়ির পুকুর পাড়ে নিজে কোদাল দিয়ে গর্ত করে বাবা-মায়ের মৃতদেহ পুঁতে রাখে দীনেশ। পুরোহিত ডেকে ধর্মীয় আচার মেনে শ্মশানে নিয়ে দাহ করার পরিস্থিতি নেই। এখন দেশজুড়ে চলছে হানাদার দানবদের তাণ্ডব। এখন শোক সহ্য করে সেটাকে শক্তিতে পরিণত করতে হবে, সিদ্ধান্ত নেয় চোখের সামনে নির্মমভাবে মৃত্যুবরণকারী নিরপরাধ বাবা-মায়ের এক অসহায় সন্তান দীনেশ চন্দ্র।

হারাধনের বয়স আট বছর। গ্রামের সাধারণ সহজ-সরল কিশোর। গত কয়েকদিনের ঘটনায় নিম্নবিত্ত কৃষক পরিবারের ছেলেটি হতবাক হয়ে গেছে। হেসে-খেলে গ্রামের সবুজ-শ্যামল প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে চমৎকার সময় কেটে যাচ্ছিল। এখানে অসুরের কালো ছায়া গ্রাস করবে, গ্রামের শান্ত সুনিবিড় পরিবেশ হঠাৎ করে অশান্ত-অস্থির হয়ে উঠবে, আতঙ্ক এসে ভর করবে চারপাশে- ভাবেনি কেউ কোনোদিন।

জগতপুর গ্রামে আচমকা পাকিস্তানি আর্মিরা হামলা করে। কেউ ধারণা করতে পারেনি এই গ্রামে হানাদার বাহিনী চলে আসবে এভাবে। হারাধনের বাবা হেমচন্দ্র। বয়স পঞ্চাশ ছুঁয়েছে। সাধারণ কৃষক মানুষ। রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে ফসল উৎপাদনে নিজেকে নিয়োজিত রাখে সারা বছর। এর বাইরে সে অন্য কিছু জানে না, জানতেও চায়নি কোনোদিন। নিরীহ, নির্বিরোধী, সহজ-সরল কৃষক মানুষ হিসেবে গ্রামের সবাই তাকে জানে।

জগতপুর গ্রামে পাকিস্তানি সৈন্যরা হঠাৎ করে যখন আক্রমণ করে গ্রামবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত। দিগি¦দিগশূন্য হয়ে এদিক-ওদিক ছুটতে থাকে গ্রামের নারী-পুরুষ সবাই।

গোলাগুলি শুরু হলে হারাধন গ্রামের অন্য সবার সঙ্গে রাংগাবিলের দিকে চলে যায়। বাবা-মায়ের কথা মনে পড়তে একটু পিছিয়ে তাদের খুঁজে পেতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে এই কিশোর ছেলেটি।

হারাধন হঠাৎ ছুটতে থাকা লোকজনের পেছনে একটু পিছিয়ে থাকা বাবা হেমচন্দ্রকে দেখতে পায়। তার মনে যে আশঙ্কা, আতঙ্কভাব জেগেছিল- তা অনেকটা হালকা হয় বাবাকে দেখতে পেয়ে। তার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

হেমচন্দ্র অন্য সবার মতো দ্রুত ছুটতে পারছিল না। এমনিতেই তার বয়সটা বেশি, তার ওপর ঘাড়ের ওপর ধানের ভাঁড় নিয়ে ছুটছিল মানুষটা। আতঙ্কে ভয়ে, চরম অনিশ্চয়তায় আশপাশ ঠিকঠাক মতো দেখে ছুটতে পারছিল না। হঠাৎ কিছু একটার সঙ্গে হোঁচট লাগে পায়ে। ঘাড় থেকে ধানের ভাঁড়টা ছিটকে পড়ে, মাটিতে সব ধান ছড়িয়ে পড়ে। হেমচন্দ্র নিজেও মাটিতে পড়ে যায় বেকায়দা অবস্থায়। উঠে বসতে চেষ্টা করে।

পেছন পেছন হারাধনের মাও ছুটে আসছে। স্বামীকে মাটিতে পড়ে যেতে দেখে থমকে দাঁড়ায় হারাধনের মা। দ্বিধাদ্ব›েদ্বর দোলচালে পড়ে ভাবতে থাকে কী করবে সে এখন। বউকে এ অবস্থায় হঠাৎ পথে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অস্থির হয়ে পড়ে হেমচন্দ্র। এখানে এ অবস্থায় দাঁড়িয়ে পড়লে পেছনে ছুটে আসা পাকিস্তানি সৈন্যদের অস্ত্রের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে হবে। তখন আর রক্ষা নেই। বেঘোরে প্রাণ দিতে হবে।

হেমচন্দ্র চেঁচিয়ে বলতে থাকে, ‘অ্যাই মালা, এইভাবে খাড়াইয়া থাহিস না, পোলাডা গেছে গা, তুইও চইলা যা। এইখানে খাড়াইয়া পড়লে গুলি খাইয়া মরবি। তুই শিগগির যা, আমিও যাইতাছি।’

মাটি থেকে উঠে দাঁড়াতেই এক ঝাঁক বুলেট এসে বিদ্ধ হয় তার পিঠে। পাকিস্তানি সৈন্যদের মেশিনগানের বুলেট বুকের একপাশ ছিন্ন করে বেরিয়ে যায়। হেমচন্দ্র মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তার ছেলে হারাধন এবং বউ মালা ছুটতে ছুটতে পেছনে মেশিনগান গর্জে ওঠার শব্দ শুনতে পায়। পেছনে ফিরে দেখার জন্য দাঁড়ানোর সুযোগ নেই। দাঁড়ালেই মেশিনগানের বুলেট এসে বিদ্ধ হবে শরীরে। প্রাণপণে ছুটতে গিয়ে একসময় মা এবং ছেলে উপলব্ধি করে নিজের জীবনের মায়া না করে যে মানুষটা তাদের সাবধান করেছে, দ্রুত ছুটে পালাতে বলেছে, তাকে তারা চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলেছে। আর ফিরে আসবে না মানুষটা।

শেরপুরের ঝিনাইগাতি থানার ধানশাইল ইউনিয়নের জগতপুর গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ হিন্দু হওয়ার কারণে পাকিস্তানি সৈন্যদের নির্মমতার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে গোটা জনপদ এবং এখানকার মানুষজন। একজনকেও জীবিত রাখা যাবে না, সবাইকে শেষ করে দিতে হবে- তেমন পরিকল্পনা নিয়ে হামলা করেছে এখানে।

আগে থেকেই এখানকার কিছু মানুষ রাজাকার হিসেবে নাম লিখিয়েছে। পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে থেকে যদি লুটপাট করে বড় লোক হওয়া যায়, মন্দ কি- তেমন চিন্তাভাবনা তাদের। রাজাকারদের সহযোগিতা পেয়েই পাকিস্তানি সৈন্যরা জগতপুর গ্রামে ঢোকার সাহস করেছে। স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতা পেয়ে সকালে তিন দিক থেকে ব্রাশ ফায়ার করতে করতে গ্রামে ঢুকেছে সৈন্যরা। নির্বিচারে মানুষ মারছে তারা। মা-বাবার সামনে সন্তানকে আবার সন্তানের সামনে মা-বাবাকে কিংবা ভাইয়ের সামনে বোনকে, বোনের সামনে ভাইকে পাখির মতো গুলি করে মারছে।

মানুষ মারতে তাদের হাত কাঁপছে না। হৃদয় টলছে না। বরং এক ধরনের উল্লাস করছে। তাদের আনন্দ-উচ্ছ¡াস ছড়িয়ে পড়ছে চোখে মুখে চেহারায়।

‘শালা, মালাউন, হিন্দুস্থান কা পেয়রি দোস্ত, সবকো জান সে মারোঙ্গা, কোই নেহি বাঁচেঙ্গা, হাম সব কো মারেঙ্গা’, পাকিস্তানি সৈন্য সারফারাজ দম্ভ নিয়ে উচ্চারণ করে।

হাতে থাকা মেশিনগান দিয়ে গুলি ছুড়তে ছুড়তে উল্লাস করতে থাকে বিশালদেহী হাবিলদার মেজর সারফারাজ। তার চোখে মুখে মানুষ হত্যার নেশা ছড়িয়ে পড়েছে।

তাদের সামনে যারা পড়ছে তারাই মরছে। কেউই রক্ষা পাচ্ছে না। চোখের পলকে গান পাউডার ছিটিয়ে বাড়িঘর জ¦ালিয়ে-পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে। মায়া করে যারা গ্রাম ছেড়ে পালাতে দ্বিধা করছিল কিংবা কোনো কারণে পেছনে পড়েছিল অথবা প্রিয়জনকে সঙ্গে নিতে প্রাণের মায়া উপেক্ষা করে কিছুটা সময় ক্ষেপণ করেছে ঘাতকের বুলেট তাদের আর বাঁচতে দেয়নি।

মাত্র দেড়-দুই ঘণ্টায় গোটা জগতপুর গ্রামটা ধ্বংস হয়ে গেছে। গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে শুধু নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, বৃদ্ধ মানুষের মৃতদেহ। কোথাও বাড়ির আঙিনায় আবার ধান ক্ষেতে নয়তো পুকুর পাড়ে কিংবা মেঠো পথে পড়ে আছে অগণিত মানুষের লাশ। শুধু হিন্দুরাই নয়, এই গ্রামের মুসলমানরাও হানাদারদের হামলা থেকে রেহাই পায়নি। কেউ দুঃস্বপ্নেও কোনোদিন ভাবেনি গোটা গ্রামটা এভাবে শ্মশানে পরিণত হবে। ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে একসময় রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা পাশের গ্রামের দিকে পা বাড়ায়। রাজাকাররা তাদের পথ চিনিয়ে নিয়ে যায়। এখানকার পথঘাট, রাস্তা কিছুই চেনেনা তারা। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে রাজাকারদের সব কিছুই চেনাজানা, পরিচিত।

সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত তাণ্ডবলীলা চালিয়ে তারা জগতপুর ছেড়ে চলে যায়।

এরপর আত্মীয়স্বজন প্রিয়জনের খোঁজে গ্রামের লোকজন বনবাদাড় এবং আখক্ষেত, পাটক্ষেত থেকে বেরিয়ে আসে। প্রাণ বাঁচাতে তারা সেখানে লুকিয়েছিল। ধ্বংসস্ত‚পের মধ্যে নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকে অসহায় মানুষগুলো। এখানে কে, কাকে সাহায্য করবে। কান্নায় বুক ফেটে গেলেও কেউ কাঁদতে পারে না। বুকের মধ্যে অনেক দুঃখ, কষ্ট, বেদনা, শোকের যন্ত্রণা জমে শক্ত পাথর হয়ে গেছে। এত এত নারী-পুুরুষ-শিশু গুলিবিদ্ধ হয়ে মরেছে। সবাইকে কবর দেয়া কিংবা শ্মশানে নিয়ে দাহ করার মতো অবস্থা নেই। মাত্র কয়েকজনকে নতুন কাফনের কাপড়ে দাফন করা সম্ভব হয়েছে কোনোভাবে। আর কিছু মৃতদেহ জানাজা ছাড়াই মাটি চাপা দিতে হয়।

তিন-চার দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকে অগণিত মৃতদেহ। শিয়াল-শকুনে খাওয়া একজনের অর্ধেক লাশ পাওয়া যায় তিন দিন পরে। বীভৎস অবস্থা চারদিকে। যেন নরক নেমে এসেছে জগতপুর গ্রামে।

চোখের সামনে আপনজন বন্ধু-বান্ধব চেনাজানা পরিচিত প্রতিবেশীদের ভয়ঙ্কর নির্মমতার শিকার হতে দেখে অমলেশ নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। ঢাকা কলেজে পড়ে সে। বাবা-মা অনেক স্বপ্ন দেখে তাকে নিয়ে। ছেলে ঢাকা শহরে গিয়ে লেখাপড়া করছে। পাস-টাস করে একদিন বড় কিছু হবে। নামডাক ছড়িয়ে পড়বে গ্রামে। সবাই তখন কত সম্মান করবে।

মার্চে উত্তাল ঢাকা শহরের বিক্ষুব্ধ রূপ দেখেছে অমলেশ। এমনিতে লেখাপড়া নিয়ে মেতে থাকা ছেলে সে। কিন্তু ৭ মার্চ রমনা রেসকোর্স ময়দানে সহপাঠী বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে গিয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯ মিনিটের ভাষণ শুনতে শুনতে বিভোর হয়ে পড়েছিল অমলেশ। বাঙালি স্বাধীনতার জন্য আরো আগে থেকেই নানা সংগ্রাম-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অনেকটা সময় পার করলেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাদের কোনো দাবি মানছিল না। ’৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুলভাবে জয়ী হলেও জনরায়কে অগ্রাহ্য করে পাকিস্তানি শাসকরা স্বৈরশাসনের ভয়াবহ প্রকাশ ঘটিয়েছে। তাই তো রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ডাক দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু। তার উদাত্ত আহ্বান দেশজুড়ে অসাধারণ জাগরণ সৃষ্টি করেছে। সেই থেকে অমলেশ নিজেকে একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী ভাবতে শুরু করেছে। ঢাকা থেকে অনেক কষ্টে শেরপুরে গ্রামের বাড়িতে ফিরেছে সে। আশপাশের বাড়ির অনেকেই সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে মুক্তিযোদ্ধার ট্রেনিং নিয়ে অপারেশনে নেমেছে। অমলেশ গত কয়েকদিন ধরে অনেক চিন্তাভাবনা করেছে। এভাবে আর বাড়িতে বসে থাকার কোনো মানে হয় না। গ্রামজুড়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা যে ধরনের নির্মমতার প্রকাশ ঘটিয়েছে এর আগে কেউ কোনোদিন দেখেনি এবং শোনেনি এমন নৃশংসতার কথা।

এতদিনেও মুক্তিযুদ্ধে সে যোগ না দিয়ে ঘরে বসে আছে।

অমলেশ নিজেকে বড্ড অপরাধী ভাবতে থাকে।

আর এক মুহূর্তও দেরি করা যাবে না। এক্ষুনি বেরিয়ে পড়তে হবে।

সীমান্ত এলাকাতেই তাদের বাড়ি। কিছুটা পথ হাঁটলেই সীমান্তে পৌঁছে যাবে সে। তবে এ পথটা অনেক বিপদসংকুল। পাকিস্তানি সৈন্যদের তীক্ষè দৃষ্টি এই পথের ওপর। কারণ তারা জেনে গেছে এ পথ ধরে ছেলেরা দলে দলে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিয়ে আবার এ পথেই ফিরে আসছে। এসেই তারা অপারেশন চালাচ্ছে, গেরিলা আক্রমণে নাস্তানাবুদ করে তুলছে পাকিস্তানি বাহিনীকে। চৌকষ এবং মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রে সাজ্জিত একটি সেনাবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে দিশাহারা হয়ে পড়ছে।

বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দেয়ার পর থেকে গোটা দেশ জেগে উঠেছে। যার যা কিছু রয়েছে তাই নিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রতিরোধে সশস্ত্র যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে। পাকিস্তান বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে আটক করে নিয়ে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষকে বন্দি করতে পারেনি তারা। এক বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে তারা এখন স্বাধীনতা যুদ্ধে শামিল হয়েছে। তার জাদুকরী আহ্বান স্বাধীনতার ডাকে সাড়া দিয়ে গোটা দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়াই শুরু করেছে।

অমলেশ নিজের চোখে আজ দেখেছে পাকিস্তানি বাহিনীর ভয়ঙ্কর নির্মমতার প্রকাশ। জগতপুর গ্রামে প্রলয় নেমে এসেছে যেন। তাদের হত্যাযজ্ঞের প্রতিশোধ নিতে হবে। এজন্য নিজের জীবন যদি হারাতে হয় তাতেও কোনো দুঃখ থাকবে না। স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণের জন্য চরম আত্মত্যাগ করতে হলেও হাসিমুখে প্রাণ দিতে রাজি সে। বাঙালিদের মহান নেতা বঙ্গবন্ধু আজ পাকিস্তানিদের হাতে আটক অবস্থায় আছেন। তাকে যে কোনো সময়ে মেরে ফেলতে পারে পশ্চিম পাকিস্তানিরা। তিনি নীতির প্রশ্নে কোনোভাবেই আপস করছেন না। বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবি থেকে পিছিয়ে আসেননি জীবনের মায়া করে। তিনি যদি এতবড় ত্যাগ স্বীকার করতে পারেন তাহলে আমরা পারব না কেন? আমরা তো এই মহান নেতার আদর্শ বুকে লালন করছি। আমরাও পিছিয়ে থাকব না। প্রতিশোধ নেব, প্রতিরোধ করব, আমার প্রিয় বাংলাদেশকে স্বাধীন করতে যা করা দরকার তাই করব, বিড় বিড় করে উচ্চারণ করে অমলেশ।

এখন সে ঘোরের মধ্যে হাঁটতে শুরু করেছে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে জগতপুর গ্রামে। চারপাশে অন্ধকার গাঢ় হয়ে আসছে। এই অন্ধকারে পথ চলতে সুবিধা। পাকিস্তানি সৈন্য আর রাজাকার-আলবদরদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে রাতের অন্ধকারে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ওপাড়ে ভারতে চলে যেতে হবে তাকে। অমলেশ আর কিছু ভাবতে পারে না। দ্রুত পা চালায়। অন্ধকার দুর্গম পথ ধরে হাঁটতে থাকে। কতক্ষণে সীমান্ত পাড়ি দেবে- তেমন চিন্তা তার মাথায়।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj