মধ্যযুগের মুসলিম মহিলা কবি : রহিমুন্নিসা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র

শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২০

শাহানা ইসলাম

চিরায়ত বাংলার ষড়ঋতুর পালা বদলের খেলায় যেমন করে প্রকৃতির অঙ্গের রূপ বদলায় তেমন করে বদল হয় মানবকুলের স্থান-কাল-পাত্র, বদল হয় মানব মনের সূ² রেণু-অনুরেণুর। কোনো কোনো শিল্পের আলোকধারায় বয়ে আনে পরিবর্তনের বারতা। মূর্ত হয়ে ওঠে মানব জীবনের চলমান বাঁক। যে যুগে নারীরা ছিল পর্দার অন্তরালে, জীবনের বাঁকে বাঁকে ছিল বঞ্চনা, কুসংস্কারের বেড়াজালে নারী সমাজ ছিল শিকলবন্দি সে যুগে নিজের অন্তঃগভীরের দুঃখ-সুখের অনুভূতি প্রকাশ করার লক্ষ্যে হাতে কলম তুলে নিয়েছিলেন মধ্যযুগের প্রথম মুসলিম মহিলা কবি রহিমুন্নিসা। দৌলত উজির বাহরাম খাঁর লাইলী-মজনু, মহাকবি আলাওলের পদ্মাবতী কাব্য অনুবাদ করেছিলেন এই প্রথিতযশা মহিলা কবি। কবি তার স্বামীর আদেশই ‘পদ্মাবতী’র, পাণ্ডুলিপিটি তৈরি করেছিলেন। পাণ্ডুলিপি শেষে অনুলেখিকা তার চমৎকার একটা আত্মবিবরণী দিয়েছিলেন-

শুন গুণি গণ, হই এক মন,

লেখিকার নিবেদন।

অক্ষর পড়িলে, টুটাপদ হৈলে,

শুদরিঅ সর্বজন।

পদ এই রাষ্ট, হেন মহা কষ্ট,

পুঁথি সতী পদ্মাবতী।

আলাওল মণি, বুদ্ধি বলে গুণী,

বিরচিল এ ভারতী।

পদের উকতি, বুঝি কি শকতি,

মুই হীন তিরী জাতি।

স্বামীর আদেশ, মানিয়া বিশেষ,

সাহস করিলু গাঁথি-

লেখিকার লঘু ত্রিপদী ছন্দের বর্ণনায় বুঝা যায় তিনি তার স্বামীর প্রতি অনুরাগী ছিলেন। তার স্বামী ছিলেন সাহিত্যানুরাগী। কবি জমিদার বংশের বউ হয়ে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার পর তার সাহিত্যের কৃপাণকে আরো বেশি শান দিয়েছিলেন তার স্বামীর সহযোগিতায়। শুধু তাই নয়, ব্যক্তি মানুষ হিসেবে তার স্বামী ছিলেন কোমল মনের সুমনা বৃত্তি সম্পন্ন একজন মানুষ। স্বামীর প্রতি প্রশংসা করে বলতে গিয়ে কবি বলেছেন-

‘মোর প্রতি রস রাজ।

রসিক সমাজ, ব্রত ধর্ম কাজ,

উপেক্ষা না করে চিত।’

ইতিহাসের পাতায় চোখ দিলে আমরা দেখতে পায় বেগম রোকেয়ার পাশে যেমন ছিলেন তার স্বামী সাখাওয়াত হোসেন, সতীদাহ প্রথা রোধে যেমন এগিয়ে এসেছিলেন রাজা রাম মোহন রায়। বিধবা বিবাহ আইন প্রচলনে ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তেমন যুগ হতে যুগান্তরে নারী-পুরুষের বিবাদ-বিভাজনের মধ্যে দেবতা তুল্য এক শ্রেণির এই পুুরুষরা সেই থেকে আজ অবধি নারীদের দিয়ে গেছেন- যাচ্ছেন প্রেম-ভালোবাসা আর অধিকার আদায়ের অমিয়তা।

চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী উপজেলার মেখল গ্রামে কবির শ্বশুরালয় ছিল। তার স্বামীর নাম ছিল আহমদ আলি চৌধুরী। হাটহাজারীর বিখ্যাত জমিদার জান আলি চৌধুরীর প্রথম পুত্র আহমদ আলি চৌধুরীর সাথে কবি রহিমুন্নিসার বিবাহ হয়। কবির দাদা শ্বশুরের নাম ছিল গোলাম হোচন। বাল্য বয়সে কবি তার পিতা আবদুল কাদির শাহকে হারিয়েছিলেন। পিতার মৃত্যুর পর মাতা আলিমন্নিচার তত্ত্বাবধানে আবুল হোসেন নামের পটিয়া নিবাসী এক পণ্ডিতের কাছ হতে শিক্ষা লাভ করেন। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আবিষ্কৃত কবি দৌলত উজির বাহরাম খাঁ বিরচিত লাইলী মজনু কাব্যের পাণ্ডুলিপি শেষে অনুলেখিকা রহিমুন্নিসার যে আত্মপরিচয় প্রকাশ পায় তা থেকে বুঝা যায় যে কবি রহিমুন্নিসার পূর্বপুরুষ ছিলেন কুরাইশ বংশোদ্ভূত। কবি তার আত্মপরিচিতি বর্ণনায় বলেছেন,

পীর হই রহে চট্টগ্রামেতে আসিআ।।

সেক কোরসের বংশে জনম হইআ।

বহু সিস্ব করিলেক এথাতে রহিআ।।

তাহান মুরব্বীগণ দুক্ষিত হইআ।

মক্কা দেশ হন্তে এথা রহিল আসিয়া।।

সুকে যদি কথ দিন কাটিলেক কাল।

দান ধর্ম পুণ্য কর্ম করিল বিসাল।।

জম হন্তে বলবন্ত কারে না দেখিআ।

স্বোর্গ পুরে জাই দেহ রহিলেক গিআ।।

মুই হত অভাগিনী দেখ বোদ লোক।

বুদ্ধি স্থিত না হইতে পিতা পরলোক।।

কারবালা যুদ্ধের পর কবি রহিমুন্নিসার আদি পুরুষ বাগদাদ হতে এসে বিহারের মুঙ্গেরে বসতি স্থাপন করেন। পলাশী যুদ্ধে নবাব সিরাজ-উদ-দৌল্লার পরাজয়ের পর বাংলার বুক যখন ইংরেজদের করাল চাবুকে জর্জরিত তখন নবাব মীর কাশিম তার রাজধানী মুর্শিদাবাদ থেকে মুঙ্গেরে স্থানান্তর করেন। নবাব মীর কাশিমের সাথে ইংরেজদের পর পর কয়েকটা যুদ্ধ হয়, ঘেরিয়া, কাটোয়া, উদয়নালা-বক্সার। নবাব মীর কাশিম পরাজিত হয়ে পালিয়ে অযোধ্যার নবাব সুজাউদ্দৌলার নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেন। নবাবের পরাজয়ের পর ইংরেজদের হাতে যখন মুঙ্গের বাসী মুসলিমরা অত্যাচারিত হয়েছিল তখন কবি রহিমুন্নিসার বংশধরেরা মুঙ্গের হতে চট্টগ্রামে আগমন করেন। যা কবি পয়ার-খর্বছন্দে উল্লেখ করেন-

নাম গোত্র বিরচিয়া করিমু বর্ণন।

কর্ণগতে শুন মন দিয়া কবিগণ।।

জংলী শাহা নাম করি গুণে অনুপাম।

আহালে কোরেশ বংশে উৎপত্তি তাহান।।

যখনে ইমাম-সঙ্গে দাসীর নন্দন।

ধর্ম ছাড়ি সজ্জ হৈল করিবারে রণ।।

হোচেনের সেনাপতি মিলি কত লোক।

ঈশ্বর স্মরিয়া মনে জানি কর্ম ভোগ।।

কত কত বহিত্র যে পূর্ণ সাজ করি।

বাগদাদে আসিলা ইমাম আজ্ঞা ধরি।।

তথা হস্তে আর কত মুঙ্গেরে আসিল।

সে মুলুক নৃপ সঙ্গে বহু যুদ্ধ হৈল।।

অগ্রগামী হইয়া ইংরাজে যুদ্ধ দিল।

দৈবদশা ফিরিঙ্গীর বিজয় হইল।।

মুখ্য মুখ্য সবের বহুল রতœ ধন।

লুটিয়া করিল খয় যত পাপিগণ।।

অনেক লাঘবে নিজ জন্মভূমি ছাড়ি।

চট্টগ্রামে আসিয়া রহিলা বাস করি।।

পির হই শিষ্য কৈলা কত কত গ্রাম।

প্রকাশ হইল তান যশ কৃতি নাম।।

কবি রহিমুন্নিসার পিতামহ জংলী শাহা ইসলামাবাদ খ্যাত চট্টগ্রামে আগমন করেন এবং শুলক বহরে বসতি স্থাপন করেন। জঙ্গী শাহ নাম ধারণ করে পীর হিসেবে অসংখ্য লোককে মুরিদ করে দ্বীনের পথে এনে নিজের প্রতিভাকে বিকশিত করে চট্টগ্রামে বিখ্যাত হন। কবির জন্ম চট্টগ্রামের শুলক বহরে ১৮৪৬ খ্রিস্টাব্দে। কবির বাল্যকাল কেটেছে শুলক বহরে তার পিত্রালয়ে। ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ আবিষ্কৃত কবি দৌলত উজির বাহরাম খাঁ বিরচিত লায়লী মজনু কাব্যের পাণ্ডুলিপি শেষে অনুলেখিকা রহিমুন্নিসা তার আত্মপরিচিতি এভাবেই তুলে ধরেন-

শুন এবে নিবেদন করি অনুপাম।

হেরিআ লেখিলুম পৌস্তক মনুরম।।

যদি সে য়ক্ষর ভুল হৈলে কদাচন।

তাকে শুদজ্জিতে মুই করি নিবেদন।।

গুনিনের চরণেতে করি পরিহার।

অপবাদ ক্ষেমিবারে আরতি আমার।।

মুই অতি খিনমতি দুক্ষিত তাপিত।

বংশ গ্রাম কহি কিছু শুনহনি নিচিত।।

ছিরিমতি ক্ষুদ্র অতি রহিমন্নিচা নাম।

শুলকবহর নামে গ্রাম অনুপাম।।

পীতায়তি শুদ্ধমতি আবদুল কাদের।

ছুপি খান্দানে তাঁই আছিল শুধির-

বাংলার আদি অধিবাসীদের ভাষা ছিল অস্ট্রিক। আর্যদের আগমনের পর ধীরে ধীরে এই ভাষা হারিয়ে যায়। আর্যদের আদি ভাষার নাম ছিল প্রাচীন বৈদিক ভাষা। পরবর্তীকালে এই ভাষাকে সংস্কার করা হয়। পুরনো ভাষাকে সংস্কার করা হয়েছে বলেই এই ভাষাকে সংস্কৃত ভাষা বলা হয় তবে সাহিত্যের জন্ম চর্যাপদ হতে’ই বলে ধারণা করা হয়। মধ্যযুগের কবি রহিমুন্নিসার লিখন পদ্ধতিতে প্রাচীন শৈলী লিপির চাপ দেখা যায়। কবির ছিল তিন ভাই, আবদুল গফুর শাহ, আবদুল জব্বার শাহ, আবদুস সাত্তার শাহ। আবদুল গফুর শাহ মারা যাওয়ার পর ভাইয়ের শোকে কবি রচনা করেন ভ্রাতৃবিলাপ। নিজের ভিতরকার অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে কবি লিখেছিলেন,

মিত্রের প্রাণের প্রাণ, ভ্রাতৃ মোর রূপবান,

নাম তার আবদুল গফুর

আঘ্রানের পক্ষ দিন, শুক্রবার শুভ চিন,

ভ্রাতৃ মোর গেল স্বর্গপুর।।

ফেলি মাও ভাই বোন, ভ্রাতা মোর সুখ মন,

স্বর্গপুরে গেলা মনোরঙ্গ।

ভুরূযুগ অতি টান, নয়ান কটাক্ষ সান,

স্বরগের হুর মনোভঙ্গ।।

ভাবে মগ্ন হই মতি, প্রভু হন্তে মাগি গতি,

ভ্রাতৃ মোর লৈ গেল বরিয়া।

পুষল মাসেতে দুখ, কহিতে বিদরে বুক,

তোমা শোকে ফাটি যায় হিয়া।।

পুরিলে নিবন্ধ আয়ু, বন্ধন না হয় বায়ু,

সেই ছিদ্রে যমে দিল কোল।

দিবানিশি অভিপ্রায়, কান্দ এ অভাগী মায়,

না শুনিয়া তোমা সুধা বোল।।

সাহিত্য জীবনের কথা বলে, যাপিত জীবনের ক্লান্তি-ক্লেশ, দুঃখ-বিরহ, সুখ-স্বপ্নের মনোভাব কালির আঁচড়ে ফুটে উঠে। বিরহ-বেদনা ভরা মন যখন আঁতিপাঁতি করে খুঁজে সুখের আলো তখন কালি-কলমে, শিল্পীর তুলির আঁচড়ে অন্তঃদাহের দাগগুলো রূপান্তরিত হয় শিল্পকর্মে। কবি রহিমুন্নিসা ও তেমন তার যাপিত জীবনের সুখ-দুঃখের অনুভূতির কথা ফুটিয়ে তুলেছিলেন তার কাব্য গ্রন্থে। কবি রহিমুন্নিসার ছিল দুই মেয়ে এক ছেলে। সায়েমান খাতুন, দোরদানা খাতুন। ছেলে সিদ্দিক আহমদ চৌধুরী। ছেলে সিদ্দিক আহমদ চৌধুরীর ছিল চারপুত্র ও তিন কন্যা। মেয়ে দোরদানা খাতুনের বিয়ে হয় চট্টগ্রামের পতেঙ্গায়। বিবাহের কিছুদিন পর দোরদানা খাতুন তার স্বামীর হাতে শহীদ হন। কন্যার মৃত্যু শোকে কবি রহিমুন্নিসা রচনা করেন দোরদানা বিলাপ। গাঁথাটির কোনো নাম পাওয়া যায়নি। ডক্টর এনামুল হকের মতে, ইহা কতকগুলি বিলাপের সমষ্টি বলিয়া, ইহাকে ‘দোরদানা-বিলাপ’ আখ্যায় অভিহিত করা চলে। কন্যা শোকে কবি লিখেছিলেন,

‘মোর কন্যা তোর হস্তে শহীদ হইল।।

আপনার তিরী বলি না কৈলা বিচার।

কি উত্তর দিবি যাই গোচরে আল্লার।।

স্বর্গবাসী হুর সব হরষিত হৈয়া।

কন্যা মোর নিল আসি আগু বাড়াইয়া।।

পিতায়ে কান্দন করে আর্তনাদ ছাড়ি।

কোথা লুকাইল মোর দোরদানা সুন্দরী-

কবি তার লেখনীর মাধ্যমে তার অন্তরের যে বিলাপ-আকুতি প্রকাশ করেছেন তাতে বুঝা যায় যে, বাল্যকাল হতেই কবিকে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের মুখোমুখি হতে হয়েছে। পিতৃ স্নেহ হতে অল্প বয়সে বঞ্চিত হলে ও কবির মাতা তার অন্তরে যে দ্বীপ শিখা জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন তার আলো কবি বিকশিত করে গেছেন মধ্যযুগের সাহিত্যের পাতায়-পাতায়।

বাংলা সাহিত্যের কাল বিচারে বাংলা সাহিত্যকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ, আধুনিক যুগ। মধ্যযুগে সাহিত্য চর্চা পুঁথির মাধ্যমে হতো। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য ছিল মূলত কাব্য সাহিত্য। যা লেখা হতো তালপাতা, ধাতুর পাত, কাঠ, পাথর, তুলট কাগজে। কবি রহিমুন্নিসা তার কাব্য লিখেছিলেন তুলট কাগজে। মধ্যযুগের কবিদের মধ্যে শাহ মুহম্মদ সগীর, সারিবিদ খান, দৌলত উজির বাহরাম খান যেভাবে বাংলা সাহিত্যে নিজেদের কৃতিত্ব রেখে গেছেন কবি রহিমুন্নিসা পর্দার অন্তরালে থেকে ও নিজের প্রতিভাকে প্রকাশ করে গেছেন তার আপন যোগ্যতায়। যে যুগে সতীদাহ প্রথায় পুড়েছিল বঙ্গ নারীরা। সে যুগে একজন মুসলিম নারী কুসংস্কারের বেড়াজালের ভিতর থেকে নিজ প্রতিভাকে প্রকাশ করার মতো যে যোগ্যতা দেখিয়েছিলেন তা বাংলার ইতিহাসে বিরল। কবি রহিমুন্নিসা বাংলা সাহিত্যের যে পথ ধরে হেঁটেছিলেন সে পথের উত্তরসূরিরা পরবর্তী সময়ে বাংলার ইতিহাসে নিজ নিজ প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে গেছেন, বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামাল, জাহানারা ইমাম হতে আরো অনেকে। ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দে কবির স্বামী আহমদ আলী মৃত্যুবরণ করেন। স্বামীর মৃত্যুর পর কবি তার সাহিত্যচর্চার পরিসমাপ্তি ঘটায়। তখন তার বয়স ছিল বায়ান্ন বছর। নাত-নাতনি নিয়ে তিনি ছিলেন তার পুত্রের সংসারে। গবেষক লেখক আবদুল হক চৌধুরী, ডক্টর এনামুল হক, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, বদিউজ্জামসহ যারা রহিমুন্নিসাকে নিয়ে লিখে গেছেন তাতে বুঝা যায় কবি রহিমুন্নিসা সংসার ধর্মে যেমন একজন সুশীল রমণী ছিলেন তেমনি তিনি ছিলেন সংস্কৃতিমনা বিদূষী একজন নারী। খোদাভীরু এই কবি তার নিজের হাতে কুরআন শরিফ লিখেছিলেন যা তার মা আলিমন্নিচা পাঠ করতেন। তিনি নিজের হাতে লিখেছিলেন কায়দা আমপারা। সংসার জীবনের প্রাত্যহিক কাজ করার পাশাপাশি তিনি যেমন সাহিত্যচর্চা করতেন তেমনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজও পড়তেন। কবির পিতামহ জঙ্গী শাহের মাজার আজো অক্ষয় হয়ে আছে চট্টগ্রামের শুলকবহরে। একুশে পদকপ্রাপ্ত আবদুল হক চৌধুরীর রচনাবলিতে উল্লিখিত রহিমুন্নিসার মৃত্যু হয় ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে। হাটহাজারীর প্রাচীন মেখল গ্রামের অন্তর্গত বর্তমান রহিমপুর গ্রামে জানে আলী চৌধুরী বাড়ির সামনের পুকুর পাড়ে-বাড়ির প্রায় চৌহদ্দির মধ্যে তাদের পারিবারিক মসজিদ এবং মসজিদ সংলগ্ন দক্ষিণ পার্শ্বে তাদের পারিবারিক কবরস্থান অবস্থিত। সেখানে কবি রহিমুন্নিসা তার স্বামী ও পুত্র পাশাপাশি কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন। বর্তমানে কবরের প্রস্তর ফলকে লেখা আছে রহিমুন্নিসার মৃত্যু হয় ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে। একুশে পদকপ্রাপ্ত গবেষক আবদুল হক চৌধুরীর রচনাবলি ও আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদের ‘আবদুল হক চৌধুরী ও তার গবেষণাকর্ম’ বইয়ে উল্লেখ আছে রহিমুন্নিসার মৃত্যু হয় ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে। সফল গবেষক লেখক আবদুল হক চৌধুরীর লেখা ও কবি রহিমুন্নিসার কবরের বর্তমান ফলকে তার মৃত্যু সাল সম্পর্কে যা উল্লেখ রয়েছে তা হতে বুঝা যায় যে, মধ্যযুগের প্রথিতযশা এই মহিলা কবির মৃত্যু হয় ১৯১৫-১৯১৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে।

রেডিও বাংলাদেশ চট্টগ্রাম কেন্দ্রের ১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘কেউ ভোলে না কেউ ভোলে’র নির্ধারিত কথিকা ছিল : ‘চট্টগ্রামের প্রাচীন মহিলা কবি শ্রীমতি রহিমুন্নিসা’। অনুষ্ঠানে কবি সম্পর্কে কথিকা পাঠ করার জন্য কর্তৃপক্ষ আমন্ত্রণপত্র পাঠালে গবেষক লেখক আবদুল হক চৌধুরী রহিমুন্নিসা সম্পর্কে জানতে কবির পৌত্রী ফাতেমা খাতুন চৌধুরাণীর সাথে সাক্ষাৎ করেন তার কনিষ্ঠ পুত্র ফজলুস সোবহান চৌধুরীর কাজীর দেউড়ীর বাড়িতে ১৯৮৬ সালে। তখন ফাতেমা খাতুন চৌধুরাণীর বয়স ছিল ছিয়াশি বছর। ফাতেমা খাতুন চৌধুরাণী ছিলেন প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ফজলুল কবির চৌধুরীর মাতা। চট্টগ্রাম রাউজান থানার বর্তমান সংসদ সদস্য রাউজানের রূপকার হিসেবে বিবেচিত রেলপথ মন্ত্রণালয় বিষয় সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী এমপির দাদি। একুশে পদকপ্রাপ্ত গবেষক আবদুল হক চৌধুরী ফাতেমা খাতুন চৌধুরাণীর সাক্ষাৎকারে রহিমুন্নিসা সম্পর্কে যা জানতে পারলেন, ‘তের বছর বয়সে আমার বিয়ে হয়। তখন আমার দাদি রহিমুন্নিসা জীবিত ছিলেন। বিয়ের আগে আমি ও আমার পিঠাপিঠি ছোট ভাই ওবাইদুর রহমান দাদির সঙ্গে এক বিছানায় ঘুমোতাম। আমরা ভাই-বোন দুজন দাদিকে নিজ নিজ দিকে ফিরে ঘুমোবার জন্য বায়না ধরতাম। বেশি জ্বালাতন করলে দাদি বিরক্ত হয়ে বলতেন, আমি তোমাদের কারো দিকে ফিরে ঘুমোব না। আমি আল্লার দিকে ঘুমোব। অর্থাৎ চিৎ হয়ে ঘুমোব। আমার বিয়ের দুই বছর পর, আমার পনের বছর বয়সে দাদি রহিমুন্নিসার মৃত্যু হয়। তখন পহেলা ইংরেজ-জার্মানির যুদ্ধ চলছিল। রহিমুন্নিসার লেখা দুটি পঙ্ক্তি কম্পিত কণ্ঠে ফাতেমা খাতুন চৌধুরাণী গেয়ে শুনিয়েছিলেন:

নবী বংশ এজিদার যুদ্ধেতে পড়িল।

মোর কন্যা তোর হস্তে শহীদ হইল।।

মধ্যযুগের এই মহিলা কবির পিতৃকুল যতই প্রতিক‚লতার অবসান করুক না কেন বংশ পরিক্রমা অনুসারে এই কবির পিতৃকুল আর শ্বশুরকুল দুই-ই যে উচ্চ বংশীয় তা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে প্রমাণিত।

আজ বাংলা সাহিত্য আধুনিকতায় পরিপুষ্ট। আজকের বাংলা সাহিত্য আধুনিক ভাবধারায় যতই পুষ্ট হোক না কেন সেই আদি সাহিত্য যেন আজকের আধুনিক সাহিত্যের প্রেরণার উৎস। মধ্যযুগের কবি রহিমুন্নিসা আজকের বাংলার মুসলিম নারীর সাহিত্য রচনার যে শেকড় প্রোথিত করে গেছেন তার পথ ধরে বাংলার মুসলিম নারীরা আজ নিজ নিজ প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে যাচ্ছেন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসজুড়ে। বাংলা সাহিত্যের আলোক ধারাকে সমুজ্জ্বলিত করে তোলার লক্ষ্যে কবি রহিমুন্নিসা যে ভূমিকা রেখে তা আজন্ম অক্ষয় হয়ে থাকবে বাংলার ইতিহাসে।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj