ভ্র ম ণ : প্যাসিফিকে পাঁচ রজনি

শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২০

ইকতিয়ার চৌধুরী

[ পর্ব : ৮ম ]

কিন্তু সাগরে রাষ্ট্রদূতের নিরাপত্তার দায়িত্ব যে সে ‘নিজ স্কন্ধে’ তুলে নিয়েছে সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র নড়চড় নেই। সত্যি কথা বলতে কি ওয়েটের এই অযাচিত ভালো মানুষি আমার পছন্দ হচ্ছে না। আমি বিরক্ত হচ্ছি। এভাবে আমার প্রাইভেসি কেউ নষ্ট করুক তা আমি চাই না।

ওয়েটের আমার পিছে লেগে থাকা হতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা মনে পড়ল। কথাটি আমাকে বলেছিল আমাদের সহকর্মী ড. খলিল। খলিল বর্তমানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় কর্মরত। আমরা তখন দক্ষিণ চিন সাগরে কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে। সাগরে বলা ঠিক হলো না। আমরা ছিলাম ওই সাগরের সাবাং সৈকতে। সৈকতের নীল পানিতে খলিলের মেয়ে কর্নেলিয়া, আমার স্ত্রী লীনা ও ছেলে অলভ্য ঝাপাঝাপি করছিল। সাদা বালির সাবাং বিচ আসলে একটি বিলাসী রিসোর্ট। কোনো লোকজন না থাকায় তা ছিল নির্জনতায় নিমজ্জিত। খলিলের বউ কনা ভাবি তখনো পানিতে নামেনি। সে রিসোর্টের নারকেল গাছের ছায়ায় হ্যামকে শুয়ে সাগরের দিকে তাকিয়ে দোল খাচ্ছিল। তার অদূরেই দাঁড়িয়ে ছিল একজন সশস্ত্র নিরাপত্তা রক্ষী। সে দিকে তাকিয়ে খলিল বলল ‘ইউ মে হ্যাভ প্রিভিলেজ বাট ইউ মে নট হ্যাভ প্রাইভেসি।’

ফিলিপাইনের পালাওয়ানে ওই সফরে খলিল পরিবার ছিল আমাদের অতিথি। অনেকের মতে সাগর বেষ্টিত পালাওয়ান আইল্যান্ড ফিলিপাইনের সুন্দরতম স্থান। কারো কারো মতে আবার বোরাকাই। উত্তর দক্ষিণ কোনাকুনি লম্বা পালাওয়ানের পূর্বপাশে সাগর সুলে আর পশ্চিমে দক্ষিণ চীন সাগর যা প্রশান্ত মহাসাগরেরই অংশ। ছেঁড়া ছেঁড়া দ্বীপ ধরে পালাওয়ানের দৈর্ঘ্য সাড়ে ছয়শ কিলোমিটার সেখানে মূল ভূখণ্ড লম্বায় চারশ পঁচিশ কিলোমিটার। ম্যানিলা থেকে ফিলিপিন্স এয়ারলাইন্সে এক ঘণ্টা দশ মিনিটে গতকালই আমরা পালাওয়ানের রাজধানী পুয়ের্তো প্রিনসেসা এসেছি। পুয়ের্তো স্প্যানিস শব্দ। যার অর্থ দরজা। ফিলিপাইনের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন এবং সবুজ শহর হলো পুয়ের্তো প্রিনসেসা। আসার আগে পুয়ের্তোর মেয়র মি. এডওয়ার্ড হ্যাজের্ডোনকে জানানো হলো আমরা তার শহরে প্রাইভেট ভিজিটে আসছি। ব্যস, তারপর হতে আমরা তার আতিথেয়তা থেকে বেরিয়েই আসতে পারছি না। হোটেল ঠিক করা হয়েছিল আগেই। তার পরামর্শে আমরা তা বদলে হোটেল ফ্লেউরস-এ উঠলাম কারণ তার অফিস বলল অন্য জায়গায় থাকলে নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়ে যাবে। ‘হল অব ফেম’ পুরস্কার পাওয়া তার শহরে নিরাপত্তা ঝুঁকি কেনো বোঝা না গেলেও ধারণা করা গেল মেয়র মহোদয় আসলে তাদের যা ভালো সেসবের সঙ্গে বিদেশিদের পরিচিত করাতে চান। ফ্লেউরস ফাইভ স্টার হোটেল না হলেও ফোর স্টার। কিন্তু আতিথেয়তা চমৎকার, অবস্থান আরও চমৎকার। মি. এডওয়ার্ড খুব ক্যারিশম্যাটিক এবং জনপ্রিয় মেয়র। পর পর কয়েকটি মেয়াদে তিনি এই পদে নির্বাচিত হয়ে আসছেন। তিনি অত্যন্ত পরিবেশ সচেতন মানুষ এবং জীব বৈচিত্র্য রক্ষায় অগ্রণী ব্যক্তিত্ব।

প্রিনসেসা বিমান বন্দরে নিজে আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন। আমরা চলাফেরার জন্য তার বদন্যতায় দুটো বুলেট গ্রুফ গাড়ি এবং তিন চারজনের সশস্ত্র এসকর্ট পেলাম। এক একটি গাড়ির ওজন চারটন। আগমনের দিন রাতে সিটি হলে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সম্মানে নৈশভোজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনও করলেন। এডওয়ার্ডের ক্যারিশমার আরো পরিচয় মিলল যখন তিনি মঞ্চে উঠে শিল্পীদের সঙ্গে গাইলেন।

আজকে সাবাং বিচ অ্যান্ড রিসোর্টে আসার আগে তিনি আমাদের পাঠিয়েছিলেন আন্ডার রিভার ক্রুজে। সঙ্গে এসকর্ট ছাড়াও পর্যটন বিভাগের একজন গাইড। ফিলিপাইনে সিটি অফিসগুলোয় একজন করে ট্যুরিজম অফিসার রয়েছে। শহরে গুরুত্বপূর্ণ কোনো অতিথি এলে তাদের কাজ প্রটোকল করা। প্রাকৃতিক সপ্তাশ্চর্য প্রতিযোগিতায় এই আন্ডার গ্রাউন্ড রিভার আমাদের সুন্দরবনের প্রবল প্রতিদ্ব›দ্বী। আন্ডার গ্রাউন্ড কিংবা আন্ডার মাউনটেইন রিভারটি সুন্দরবনের মতোই ইউনেস্কো কর্তৃক ওয়ার্ল্ড ন্যাচারাল হেরিটেজ হিসেবে স্বীকৃত। দাবি করা হয় যে নদীটি আট কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ। কিন্তু পর্যটকরা যারা আমাদের মতো গুহা থেকে গুহান্তরে প্রবাহিত এই নদীতে ছোট্ট ডিঙিতে পরিভ্রমণ করেছেন তার দেড়-দুই কিলোমিটারের অধিক অভ্যন্তরে প্রবেশের অনুমতি পাননি। নদীপথটি কোথাও কোথাও সংকীর্ণ, শীতল ও অন্ধকারাচ্ছন্ন। সেখানে চামচিকে ও নানা পোকা মাকড়ের বসবাস। আন্ডার গ্রাউন্ড রিভার ক্রুজ কৌত‚হলোদ্দীপক কিন্তু তত প্রীতিকর কিছু নয়। বেলা একটার দিকে সেটি শেষ করে আমরা এসেছি সাবাং বিচ অ্যান্ড রিসোর্টে। রিসোর্টে কংক্রিটের স্ট্রাকচারে নিপা পাতার ছাউনি দেয়া কটেজ যেমন আছে তেমনি আছে লগ কেবিন। বার, রেস্টুরেন্ট, সুইমিং পুল। নিপা পাতা আমাদের গোলপাতা সমজাতের। সাবাং খুব এক্সক্লুসিভ রিসোর্ট। সামনে সমুদ্র পেছনে ঘন সবুজ গাছপালা। অরণ্যসম। কাছে ধারে কোনো জনপ্রাণী নেই। সঙ্গীনিকে নিয়ে সময় কাটানোর উপযুক্ত জায়গা হতে পারে এটি। সাগর ¯œানের পর আমরা লাঞ্চ করব। তার মেনুও ঠিক করে দিয়েছেন এডওয়ার্ড।

পর্যটনের মেয়েটি আছে ছায়ার মতো। তারচেয়ে বেশি ছায়ার মতো আছে এসকর্ট। কী টয়লেট, সুইমিংপুল, লাউঞ্জ, কফি শপ যেখানেই আমরা সেখানেই তারা। কাঁধে ঝোলানো স্টেনগান। নির্বাক। ভাবলেশহীন। এখন আবার দাঁড়িয়ে আছে সাগর পাড়ে। নারকেল ছায়ায়। হ্যামকে কাত হয়ে আছেন কনা ভাবি। কনা-খলিলের ছেলে সাত আটের কিফির পা হাঁটু অবধি ভিজে উঠছে আছড়ে পড়া সমুদ্র জলে। আকাশে রোদ। ঝকমক করছে দক্ষিণ চীন সাগরের নীল জল। এত স্বচ্ছ, পরিস্কার সাগর জল বহুদিন আমি দেখিনি। তাতে খলিল আমি দুজনেই সাঁতরিয়েছি খানিকক্ষণ। সাঁতরানোর বিরতিতে যখন কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে তখন সে বলল কথাটা এসকর্টের দিকে তাকিয়ে। মনে হলো নিজেকেই। ‘ইউ মে হ্যাভ প্রিভিলেজ বাট ইউ মে নট হ্যাভ প্রাইভেসি।’

পালাওয়ে আসার মাত্র তিন সপ্তাহ আগের ঘটনা এটি। মাত্র তিন সপ্তাহের ব্যবধানে ওয়েটের অতি দায়িত্ববোধের কারণে প্যাসিফিকে কথাটির তাৎপর্য ভালোই অনুভূত হচ্ছে আমার। কিন্তু তাকে তো বলা যায় না তার এত সতর্কতার প্রয়োজন নেই।

জেলি ফিশ লেক শেষ করে আমরা এলাম লাঞ্চে। সবার ভেজা শরীর। গা মুছে নিলাম। প্যাকেট লাঞ্চ। সাগরেই লাঞ্চ। ছোট্ট একটি বিচে। বিচ যতটুকু সাগরের মাঝে ভূমিখণ্ডও ততটুকুই। একটি পাহাড়ের কোলে শুয়ে আছে তা। পাহাড়ে বৃষ্টি¯œাত গাছপালা। বিচে কাঠের দু-তিনটে কটেজ। উপরে শুধু ছাউনি। বাংলো ধরনের একটি বড় ঘরও রয়েছে। কাঠের মেঝে। তার সামনে বারবিকিউয়ের চুলো। অদূরে একটি ল্যাট্রিন। অবস্থা ভালো নয়। সার্ভিস ল্যাট্রিন- পানির ব্যবস্থা নেই। সেখানে যেতে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। ঢোকার মুখে একটি ড্রাম। ড্রামে পানি থাকার কথা। নেই। প্রয়োজন বলে কথা। এত যে পরিচ্ছন্ন জাপানি নারীরা তারাও প্রয়োজনীয় কতটুকু সেরে নিলো জলের জোগান ছাড়াই। আহা চারদিকে এত জল কিন্তু ব্যবহারের জন্য এক মগ পানিও নেই ল্যাট্রিনটিতে।

প্যাকেট লাঞ্চ দেয়া হলো সবাইকে। সুদৃশ্য একটি বক্সে। জাপানিজ খাবার। একটি পোরসন সুসি, সাসেমি ইত্যাদি। আরেকটি খোপে সব্জি। সিদ্ধ। ব্রোকলি আর অ্যাসপারাগাছ। রাইস। ডেজার্ট হিসেবে ফ্রুটস। সবাইয়ের জন্য প্রোটিন আছে সেই মেন্যুতে। পোর্ক বা শুয়োরের মাংস। আমি ছাড়া। হাইড বলল, স্যরি, আপনার জন্য কোনো প্রোটিন নেই। আমরা চেষ্টা করেছিলাম পোর্কের বদলে বিফের জন্য কিন্তু রাত করে বুকিং আপনার তখন আর বিকল্প ব্যবস্থার সময় ছিল না।

অসুবিধা নেই। প্রোটিন ছাড়াও যথেষ্ট খাবার রয়েছে। মোর দ্যান এনাফ।

হাইড আমার হাতে একটি বক্স ধরিয়ে দিল। বলল, লাঞ্চের পর আমরা মিল্কি ওয়েতে যাব। দম থাকলে পানির নিচে ডুব দিয়ে হোয়াইট ক্লে তুলবেন। গায়ে মাখবেন- ত্বকের জন্য ভালো।

চারটার মধ্যে কোরোর ফিরতে পারব তো।

পারব। সময় আছে। মিল্কি ওয়ে থেকে সম্ভব হলে কায়াকিংয়েও যাব আমরা।

আমরা কথা বলছিলাম বড় বাংলোটিতে। ধুলোয় তার কাঠের মেঝেটি অপরিচ্ছন্ন। হাইড ফুঁ দিয়ে তা একটু পরিষ্কার করে সেখানে দুটো ক্যান রাখল। একটি বিয়ারের, অন্যটি কোকের। বোটে এতক্ষণ তা বিশাল আইস বক্সে ডোবানো ছিল। বললাম, আমাকে একটি লাইট কোক দেয়া যায়।

অবশ্যই।

বোটে পানীয়ের জোগান পর্যাপ্ত। সারাদিন যথেষ্ট ফ্লুইড গেছে শরীরে।

কটেজগুলোতে আমার সঙ্গীরা চার-পাঁচজন করে বসে। সবাই আমাদের প্রতীক্ষা করছে। হাইড সেদিকে এগিয়ে গেল। আমি ভাবছি সারাদিন একসঙ্গে আছি, জাপানিগুলো ভদ্রতা করেও আমাকে তাদের সঙ্গে বসতে বলছে না। তারা শুধু নিজেদের মাঝেই নিবিষ্ট। একটি কটেজে ইয়োকোদের সঙ্গে বসেছিল এক জোড়া জাপানি। জোড়ার ছেলেটির সঙ্গে আমার বোটে কথা হয়েছে। টোকিও থেকে এসেছে সে। আমি সেদিকে এগিয়ে যাই। হাতে আমার খাবারের বক্স। বললাম, আমি কি তোমাদের সঙ্গে বসতে পারি?

অবশ্যই।

সমস্বরে বলল তারা। মনে হলো যতটা নিষ্প্রাণ আমি তাদের ভাবছি ততটা আড়ষ্ট তারা নয়। টোকিওর পাশে আসন নেই আমি। একটু বাদে টোকিও জিগ্যেস করল, কোত্থেকে আসছ তুমি?

অনুমান কর।

ইন্ডিয়া।

বিদেশিরা সবাই এই ভুল করে। সাব-কন্টিনেন্টের মানুষ দেখলেই তারা ভাবে ইন্ডিয়া। পাকিস্তান কিংবা বাংলাদেশ আসে পরে।

না, বাংলাদেশ।

তাকে শুধরে দেই।

ও!

তুমি?

যদিও সে টোকিও থেকে এসেছে বলেছে কিন্তু দেখে জাপানি মনে হচ্ছে না।

আমি আসলে ব্রাজিলিয়ান। যদিও জাপানে সেটেল্ড হয়ে গেছি।

ব্রাজিলিয়ানের জাপানি বউ। বললাম, ব্রাজিলের সঙ্গে জাপানের যোগাযোগ বা সম্পর্ক কেমন?

ভালো। আমার দেশের অনেক মানুষ আছে সেখানে।

আমার ধারণা ছিল না দেশ দুটির মধ্যে সম্পর্ক এত ঘনিষ্ঠ যে লাতিন আমেরিকার একটি দেশের অনেক মানুষ এশিয়ার এই দেশে থাকতে পারে। জাপানিজ দলটির সঙ্গে আমার মিথস্ক্রিয়ার প্রধান অন্তরায় তারা প্রায় সবাই ইংরেজি বলতে পারে না। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অনেক জাপানিজের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে। তাদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বন্ধুত্বপূর্ণ পেয়েছি। ব্রাজিলিয়ান ভদ্রলোক চমৎকার ইংরেজি বলেন। খেতে খেতে আমাদের গল্প জমে ওঠে। সে আমাকে ভারতীয় ভাবলেও বাংলাদেশকে খুব ভালো জানে। বলল, আমি তোমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম-একাত্তরের যুদ্ধ, পাকিস্তানের সঙ্গে আলাদা হয়ে যাওয়া সব খবর রাখি।

আমি আশ্চার্য হয়ে বলি, স্ট্রেঞ্জ। কীভাবে তা সম্ভব হলো। বিশেষ কোনো আগ্রহ?

কিছুটা। আমার বিষয় আসলে ইতিহাস। আমি তোমাদের নেতা বঙ্গবন্ধুর নামও এক সময় স্মরণ করতে পারতাম।

বললাম, তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

হ্যাঁ, হ্যাঁ।

মিল্কি ওয়েতে হোয়াইট ক্লে তোলার মতো দম আমার ছিল না। রাষ্ট্রদূত হবার মতো বয়সী একজন মানুষের তা থাকতে পারে কিনা আমার জানা নেই। সেখানে বোট নোঙর করার পর প্রথমে জলে নামল হাইড। তার পিছে ওয়েট। সত্যিই সাগরের এই অতি সামান্য একটি অংশের পানিকে সাদার মতো লাগছে। আমি প্রথমে পা সোজা করে পানিতে নিচের দিকে নামতে থাকলাম। পা দিয়ে কাদা ছোঁয়া সম্ভব হলেও হাতে তা তোলা সম্ভব হলো না। অনেকবার ডুব দিয়ে চেষ্টা চলল পুরো গ্রুপের। মেয়েরা ডোবার চেয়ে হাসাহাসি করছে বেশি। তারা বোধহয় জানে এই দম তাদের নেই। এখন তাদের পুরুষরা কে কতটুকু পারে সেটুকু দেখাই মুখ্য। দশ পনের মিনিট চেষ্টা চলল। কাউকে আমি বিজয়ী হয়ে ভেসে উঠতে দেখলাম না। একেক জন জলে ডুব দিচ্ছে আর তার নারী আগ্রহে প্রতীক্ষা করছে ক্লে হাতে তার বিজয়ী হয়ে ফেরার। সে দৃশ্য যখন ধরা থাকল তখন হাইড ডুবে কাদা তুলে আনল। বেশ কয়েকবার। বোটের একটি বালতি ভরে গেল তাতে। ওয়েটও তুলতে পারল তবে হাইডের মতো নয়।

আমরা সাদা কাদায় মাখামাখি হচ্ছি। জাপানি কাপল্্গুলো একে অপরের শরীরে কাদা মাখতে সাহায্য করছে। তার সঙ্গে চলছে খিলখিল হাসি। কাদা ফুরিয়ে গেলে হাইড তা তুলে আনছে আবার। বোটের ডেক কাদা পানিতে একাকার। ওয়েট মাঝেমধ্যেই তা ধুয়ে দিচ্ছে। গড়িয়ে পড়ছে তা প্যাসিফিকের শান্ত জলে। মিল্কি ওয়ে প্যাসিফিকের কোয়ায়েট জোনে। তা ‘বিউটি মাড প্যাক’ হিসেবেও পরিচিত। সারা পালাওয়ে ছেঁড়া ছেঁড়া পাহাড়। মিল্কি ওয়েও কতকটা পাহাড়ে ঘেড়া। সাগরের দুর্বার ঘূর্ণি আর উত্তাল ঢেউ এখানে নেই। মনে হয় পাহাড় তা ঠেকিয়ে রেখেছে। বলাই বাহুল্য এখানে জলের গভীরতাও কম। কোনো কোনো স্থানে তা হাইডের দমের মধ্যে। আমার সারা শরীরে কাদা। মুখে কাদা। সাবানের মতো মাখিয়ে নিয়েছি। বালতি থেকে কাদা নিতে গিয়ে একে অপরের সঙ্গে গা লাগালাগি হয়ে তা মিশে যাচ্ছে অন্যের দেহেও। আমি সেখান থেকে বোটের সামনে চলে আসি। ডেক ছাড়িয়ে শেষ প্রান্তে পেছন ফিরে বো’তে গিয়ে বসি। আমার মুখোমুখি দলের অন্যেরা। তারা কাদায় মাখামাখি হচ্ছে। নারী পুরুষ সবাই বারো আনা নগ্ন। মেয়েদের পরনে শুধু ব্রা আর প্যান্টি। সুইমিং কস্টিউম। আমার নিজের পরনেও কেবলমাত্র সুইমিং কস্টিউম। ভাবছি কাদামাখা শরীরে খানিকক্ষণ বসে থাকব। এই অল্প সময়ে হোয়াইট ক্লের ঔষধি গুণ শরীর কতটুকু ধরতে পারবে জানি না তবে বেশি সময় বসে থাকাও তো সম্ভব নয়। সারাদিনই তো পানিতে আছি। শেষে ঠাণ্ডা লেগে না যায়। আমার তরুণ-তরুণী সঙ্গীদের কথা আলাদা। তারা বয়সে নবীন- দেহের সামর্থ্যও বেশি। ভাবছি ভালোভাবে ¯œান সেরে পোশাক পরে নেব। আর তো আমাদের পানিতে নামা নেই। বসে বসে আমি পাহাড়ের সবুজ, সবুজের গোড়ায় পাথুরে জমিনের এবড়ো-থেবড়ো রূপ দেখতে থাকি। দেখি বাতাসে ঝিরঝির করা জল। কাদা মাখামাখি চলছে।

কায়াকিংটা আমাদের খুব ভালো গেল। আবহাওয়া ছিল চমৎকার। বিউটি মাড প্যাকেই আমরা গোসল সেরে শুকনো কাপড় পরে নিলাম। সেখান হতে মেরিন লেকে এলাম আমরা। পন্টুন নোঙর করা ছিল লেকটায়। পন্টুনের উপরে শক্ত প্লাস্টিকের তৈরি অনেকগুলো কায়াক বা ছোট্ট ডিঙি। উপুড় করে রাখা। হ্যারল্ড, হাইড আর ওয়েট তা পানিতে নামিয়ে দেয়। দুটো করে আসন প্রতিটি কায়াকে। আমরা একে একে তাতে চড়ে বসি। ইয়োকো আর সাচিকো উঠলো একটিতে। ওয়েট আমার সঙ্গী হলো। তাকে কিছু বলা বা আমন্ত্রণ জানানোর প্রয়োজন পড়ল না। সারাদিনের মতো নিজ দায়িত্বে সে এই করণীয় নিজের মনে করল। আমি পেছনে-সামনে ওয়েট। চলার শুরুতে সে আমাকে জিগ্যেস করল, স্যার, কায়াকিংয়ের অভ্যেস আছে তো?

অভ্যেস নেই। তবে এক আধবার করেছি।

আমি তাহলে পেছনে বসি।

দরকার নেই। প্লাস্টিকের ডিঙি-এর নিয়ন্ত্রণ তো কোনো বড় কিছু নয়।

আমার জন্য আরো কিছু নয়। আমার শৈশব কেটেছে ঝড়, বৃষ্টি, বন্যা দেখে। বর্ষার পানিতে আমাদের উঠোন নিমজ্জিত হতেও দেখেছি আমি। আমার এই জীবনে দু-তিনবার তো বটেই। আমাদের নিজেদেরই একটি বড় নৌকা আর একটি ডিঙি ছিল। আর আমাদের এক্সটেন্ডেড ফ্যামিলি ধরলে নৌকার সংখ্যা সাত আটটি তো হবেই। শৈশবে নৌকা চালনা আমাদের জন্য ছিল দুর্বার আকর্ষণ। আমাদের কায়াক চলছে। ভালোই চলছে। তবে সঙ্গীদের কায়াকের ঘুরপাক থেকে মনে হলো তাদের অধিকাংশের নৌকা চালানোর অভ্যেস নেই। সেটি অবশ্য সমস্যা হলো না। কিছুক্ষণ মকশ করার পর সবাই স্বাচ্ছন্দ্যে তা চালাতে লাগল। শুধু ইয়োকো আর সাচিকোর ডিঙি বারে বারে ঘুরে যাচ্ছিল। হেসে লুটোপুটি খাচ্ছিল তারা। প্রত্যেক ডিঙিতেই অন্তত একজন করে পুরুষ আছে। শুধু তাদেরটি ছাড়া। বললাম, তোমাদের একজন আমাদেরটায় আস আর ওয়েট তোমাদেরটায় যাক।

প্রথমে তারা রাজি হলো। পরে মনে হলো যেভাবে তারা কায়াকিং করছে সেও তো আরেক মজা। সে আনন্দ ছাড়তে তারা আর আগ্রহ দেখাল না।

ওয়েট থাকায় আমার অনেক সুবিধে হলো। এই পরিবেশ তার পরিচিত। সে আমাকে ওই সবের বর্ণনা দিচ্ছিল। তাছাড়া মেরিন লেকের একটা অংশ খুবই গভীর আর অসম্ভব নির্জন। একটি অংশ হলেও বিশালতা কম নয়। তার কালো পানিতে চোখ রাখলে গা ছমছম করে। কায়াকের ভায়া ডেক তো এক প্রকার ওই পানিতে ডুবে আছে। আর এ তো বিচ্ছিন্ন লেক নয়। প্রশান্ত মহাসাগরেরই একটি অংশ। বিপুল বিশাল মহাসাগরের সেখানে নীরব, নিঃস্তব্ধ ছমছম ছাড়া আর কিছু নেই। নেই কোনো জনমানুষ- শুধু আমরা কতিপয় এই অভিযাত্রী পর্যটক ছাড়া। আর আছে সামুদ্রিক কোরাল, পাখি এবং প্যাসিফিকের অধিবাসী মাছেরা। লেক পেরিয়ে আমরা ম্যানগ্রোভ ফরেস্টে এলাম। ওয়েটের চেনা পথ। আমরা তাই সবার আগে আগে চলতে পারছিলাম। লেক পেরিয়ে এভাবে অনেক দূর চলে আসায় ডিঙি থামিয়ে অপেক্ষা করতে করতে একটি মাছের দেখা পাওয়া গেল। মাছটি আমাদের ছুরি ফিশের মতো লম্বা। চ্যাপ্টাও। স্বচ্ছ অগভীর জলে তার নিরুদ্বেগ চলাফেরায় মনে হলো বউকে ডেরায় রেখে সে তার জমিদারি দেখতে বেরিয়েছে। তার সাদা সরীসৃপ জাতীয় শরীর যেন পানির মধ্যে ছুটে বেড়ানো একটি খাপ খোলা তলোয়ার। আমাদের ডিঙি সে খেয়াল করেনি। যখন খেয়াল করল তখন তো আমরা তার তিন-চার হাত দূরে। আমি জীবনে প্রথম মাছের ভোঁ দৌড় দেখলাম। এমন ত্বরিত গতিতে সে ভোঁ মারল তাকে তখন মানুষের মতোই বুদ্ধিমান মনে হলো। ম্যানগ্রোভ বনের মধ্য দিয়ে চলছি। কোথাও কোথাও স্রোত। কেন স্রোত বুঝতে পারলাম না। কোথাও কোথাও জল খুবই অগভীর। ওয়েট পা নামিয়ে কায়াক ঠেলছে। হাত দিয়ে তুলে আনছে সামুদ্রিক শামুক জাতীয় দু-একটি তাজা প্রাণ। সে একটি সি কিউকাম্বার তুলে আনল। বলল, এতে প্রাণ আছে।

কিউকাম্বারটি মোটা। আট দশ ইঞ্চি লম্বা। শশার মতো।

প্রাণ আছে তবে তুললে কেন, ছেড়ে দাও।

ওয়েট ততক্ষণে কিউকাম্বারটির পেট ফেড়ে ফেলেছে। সেখান থেকে বেরুচ্ছে জেলি জাতীয় বাদামি তরল।

বললাম, এভাবে প্রাণীটিকে হত্যা করা তোমার ঠিক হলো না।

না, ও মারা যাবে না। সমুদ্রের জলে পড়লে আবার ঠিক হয়ে যাবে।

উত্তর দিল ওয়েট আর পরক্ষণেই সি কিউকাম্বারটি ছুড়ে মারল জলে। দুপাশে ম্যানগ্রোভ। তার মাঝ দিয়ে কোথাও কোথাও সরু নালা দিয়ে চলছি আমরা। সহযাত্রীদের কায়াকের সঙ্গেও ঠোকাঠুকি হচ্ছে কখনও। তখন কারো কারো কায়াক কাত হয়ে ঢুকে যাচ্ছে ম্যানগ্রোভে। খলখল করে হেসে উঠছে তাদের সঙ্গীনিরা। প্রশান্ত মহাসাগরের বিশালতায়- তার নির্জনতায় ওই নারী কণ্ঠকে মনে হচ্ছে কোনো স্বর্গীয় স্রোতধারার কলকল। ওয়েটকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি বিয়ে করেছ? ফ্যামিলি আছে?

ইয়েস স্যার, আমার একটি ছেলেও আছে।

গুড।

ওয়েট কী যেন ভাবল একটু। আচমকা বলল, আপনার কি কোনো মেয়ে লাগবে স্যার। লোকাল গার্ল।

আমি আশ্চর্য হলেও এ প্রস্তাব আমার কাছে অপ্রত্যাশিত নয়। পৃথিবীর কত জায়গায়ই তো গেছি। এমন প্রস্তাব কোনো নতুন কিছু নয়। প্রায় বিশ বছর আগে ইজিপ্টের আলেকজান্দ্রিয়ায় এক সন্ধ্যায় হাঁটছিলাম। হোটেল মেট্রোপলিটনের সামনের ফুটপাত ধরে। (চলবে)

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj