যে রাতে আমার স্ত্রী

শুক্রবার, ২৪ জানুয়ারি ২০২০

আন্দালিব রাশদী

ধারাবাহিক উপন্যাস : পর্ব ৯

যদিও নিজের কথা কিছু লিখেনি ছোট্ট চিঠিতে এটা আমার কাছে এটা নষ্ট শবনমও শপথ নিচ্ছে।

আমি বাইরে এসে দেখি আমার জুতো জোড়া শার্ট-প্যান্টের সাথে তেমন ম্যাচ করছে না। অন্তত একদফা পালিশ করা দরকার। আমার ঘরে জুতোর কালি আছে আমি নিশ্চিত, কিন্তু অনেকদিন ব্রাশটা চোখে পড়ছে না।

আমি কিছুদূর এগিয়ে পান-সিগারেটওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম, স্যু পালিশওয়ালা কোনদিকে?

পান-সিগারেটওয়ালা ঘাড় কাত করে আমাকে মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে বলল, জুতা ঠিকই আছে, পালিশ লাগবে না।

আমি যখন সরাসরি তার চোখের দিকে তাকালাম, বলল, সোজা পশ্চিমে, ওভারব্রিজের গোড়ায়। বেহুদা পয়সা খরচ করতে চান, করেন।

আমি রোজালিন ফার্নান্দেজকে বলছি আজকের দিনটা গেলে আর মাত্র দুটো দিন। তখন নব্বই দিন পুরো হবে। নব্বই দিন পুরো হলেই তালাক চূড়ান্ত। তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়াটা সহজ হবে।

রোজালিন ফার্নান্দেজ দূর দেশি কেউ নয়, ফার্মগেট এলাকার খ্রিস্টান পাড়ার মেয়ে, বটমলি হোমস স্কুল আর তেজগাঁও কলেজে পড়েছে। প্রোলেতারিয়েত একাডেমিরই টাইপিং ইনস্টাক্টর। টাইপ করার এবং টাইপিং স্পিড বাড়ানোর প্রশিক্ষণ দেয় শুক্র, শনি ছাড়া সপ্তাহে পাঁচদিনই আসে, বিকেল চারটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা। আমার তো কেবল শুক্র ও শনি। তবুও দু’একবার এ অনুষ্ঠানে সে অনুষ্ঠানে দেখা হয়েছে। আমার স্ত্রী আমাকে ছেড়ে যায় এমন একটা বদনাম আমাকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।

রোজালিন বলল, একই বদনাম তো আমাকেও বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। তিনটা হাজব্যান্ডের একজনকেও ধরে রাখতে পারিনি। শুধু প্রথম হাজব্যান্ডের সংসার থেকে একটা মেয়ে পেয়েছি, মিশেল নাম, বয়স সিক্সটিন প্লাস।

আমি বলি অবন্তীর চেয়ে সামান্য বড়।

আমি যদি রোজালিনকে নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি এটা হবে আমার জন্য একটা টার্নিং পয়েন্ট। শবনম সেধে আমাকে কোনো যাতনা দিচ্ছে এমন নয়, কিন্তু আমি যাতনা পাচ্ছি। আমি তার দলটাকে সহ্য করতে পারি না, পলিটিক্যাল সেক্রেটারিকে সহ্য করতে পারি না, খবরের কাগজে ছাপা তার হাসিমুখও আমাকে যাতনা দেয়।

যদি আমি রোজালিনকে বিয়ে করতে পারি এটা হবে আবদুল খালেকের তৃতীয় বিয়ে। আমার চেনাজানা আবদুল খালেকদের কেউই দ্বিতীয় বিয়েও করতে পারেনি।

আমি হবো রোজালিনের ফোর্থ হাজব্যান্ড।

পালিশওয়ালার বাক্সের উপর পাদানিতে আমার ডান পা। পালিশওয়ালা খানিকটা ঝুঁকে পড়ে ডান হাতে ব্রাশটা অবিরাম ডানে-বাঁয়ে চালিয়ে জুতোর উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে তুলছে। যখন আমার বাম পাটা পাদানিতে আমার ঠোঁটে মুচকি হাসি। শবনমের বলা একটা জোক মনে পড়ল;

এক মহিলা পঞ্চম বিয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সম্ভাব্য পাত্রদের একজন জিজ্ঞেস করল, তোমার ফার্স্ট হাজব্যান্ডের কি হয়েছিল?

বিষাক্ত মাশরুম খেয়ে মৃত্যু।

তোমার সেকেন্ড হাজব্যান্ডের কি হয়েছিল?

বিষাক্ত মাশরুম খেয়ে মৃত্যু।

তোমাার থার্ড হাজব্যান্ডের কি হয়েছিল?

বলল, তারও বিষাক্ত মাশরুম খেয়ে মৃত্যু।

তোমার ফোর্থ হাজব্যান্ডের কি হয়েছিল?

মহিলা দৃঢ়স্বরে বলল, বিষাক্ত মাশরুম খেতে রাজি হয়নি তাই পিটিয়ে মারতে হয়েছে।

জোকটা বলে শবনম নিজেই হো হো করে হেসে উঠল এবং আমাকে নিশ্চুপ দেখে বলল, পাঞ্চলাইনটা ধরতে পারোনি।

আমি বললাম, এটা তো পঞ্চাশ বছর আগেকার জোক।

শবনম বলল, এ জন্যই তোমার সাথে কথা বলতে আমার একটুও ইচ্ছে করে না।

রোজালিন আমাকে বলেছে, একটাই তো জীবন। অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছ, বাকিটা ভালোভাবে মানে একটু শান্তিতে কাটাতে চাই, মিশেলের বাবা মিশেরে জন্য যা রেখে গেছে তাতে কাজকর্ম না করলেও আমাদের ভালো কেটে যাবে। কিন্তু পাশে একটা মানুষ চাই। হয়ত তাকে কিছুই করতে হবে না, কিন্তু আমি ভাবব যেই মানুষটাই মিশেলের বাবা, সেই মানুষটার নামই নিরাপত্তা।

আমি বলেছি, আমি সম্ভবত সে রকম দায়িত্বশীল মানুষ নই।

রোজালিন বলেছে, আমি প্রায় পাঁচ বছর ধরে আপনাকে কমবেশি দেখে আসছি, আমার ভেতর আপনার জন্য একটা ভালোলাগাও তৈরি হয়েছে হয়ত এটাই ভালোবসার দিকে গড়াচ্ছে।

আমি হাঁ করে তাকিয়ে থাকি।

রোজালিন আবার মুখ খুলে, আমি মিশেলের সাথে কথা বলেছি। মিশেলের সেকেন্ড বার্থডের তিন দিন পর বরার্টের ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক হয়, অজ্ঞান অবস্থায় হৃদরোগ হাসপাতালে নেওয়া হয়, সরাসরি সিসিইউতে। সাত ঘণ্টা পর রাত বারোটার দিকে ডাক্তার এসে বলেন, সরি পেশেন্টকে রিভাইভ করানো গেল না। মিশেল বানিয়ে বানিয়ে বাবা সম্পর্কে এটা-ওটা বলে, আসলে বাবার কোনো স্মৃতিই তার নেই।

রোজালিন আমাকে আরো আশ^স্ত করে যে আমার সাথে তার একটি সম্পর্কের সম্ভাবনার কথা মিশেলকে বলেছে। আর মা ও মেয়ে দুজনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমার সাথে রোজালিনের বিয়েটা নিশ্চিত হলে দুজনেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করবে। মিশেল নিজের নামও ঠিক করেছে একজন বড় সেতারবাদকের পুরো নামটাই নিজের জন্য নিয়ে নেবে, তার নাম হবে রীনাত ফওজিয়া।

আমি বললাম, তার ডাকনাম, মানে রীনাতের ডাক নামটা আমি জানি- রিমি। মেয়েটা যখন এতোটুকু, তার বাবা, আমাদের মোবারক চাচাই মেয়েকে নিয়ে একটা বই লিখেছেন- রিমির কথা বলা। বেশতো রীনাত ফওজিয়া নামটি সুন্দর।

রোজালিন বলে, তাহলে আমার নামটা আপনি ঠিক করে দেবেন।

আমি বলি, শবনমের সাথে ডিভোর্সটা ফাইনাল হোক।

এমন চকচকে জুতো পায়ে আমি আগে অফিসে আসিনি। আমি সতর্ক থাকছি অসাবধানতাবশত কেউ না জুতোয় পা মাড়িয়ে দেয়। তাহলে শাইনিং ভাবটা ফিকে হয়ে যাবে।

আজকের দাওয়াত অনেকটা আমার সেধেই নেওয়া। আমি বলি রোজালিন, আমরা সন্ধ্যায় কোথাও চা খেতে পারি?

অবশ্যই পারি। কিন্তু খাওয়াটা হবে চায়ের চেয়ে একটু বেশি। ডিনারই বলতে পারেন। বত্রিশ নম্বর রোডের শুরুতে একটা চাইনিজ রেস্তোরাঁ আছে না- সানটুর ওখানে। কিন্তু আমি খাওয়াবো আবদুল খালেক সাহেব। তবে আপনার কাছে একটা অনুমতি চাইছি আমি সাথে একজন স্পেশাল গেস্ট নিয়ে আসব। আমার মেয়ে মিশেল আপনাকে দেখতে চেয়েছে।

তার মানে রীনাত ফওজিয়া আমাকে তার মায়ের জন্য অ্যাকসেপ্ট করতে পারে, আবার রিজেক্টও করতে পারে।

রোজালিন বলে, ধ্যাৎ আমি কি তাই বলেছি নাকি? আমি চাচ্ছি মিশেল নিজের মুখে বলুক, মা তুমি এগিয়ে যাও।

আমি অফিস থেকে দেরি করে বের হই। পুরোনা সাতাশ নম্বর রোডের একটি দোকান থেকে এক কৌটা বিদেশি চকোলেট কিনি- মিশেল কিংবা রীনাতকে দেব।

চকোলেটের দাম শোধ করতে টাকার জন্য পকেটে হাত দিলে টাকার সঙ্গে যে কাগজটি বেরিয়ে আসে তা হচ্ছে শবনমের ছোট্ট চিঠি; আমি বঙ্গভবন গেলে খুব খুশি হবে।

শবনম আর আমি সাড়ে তিন মাস আগেও আলাদা রুমে হলেও একই বাড়িতে থাকতাম। আমরা কদাচিৎ কথা বলতাম। শবনমই বলত, অবন্তী এক্সিলেন্ট রেজাল্ট করেছে, অবন্তীর ডান চোখে একটা অঞ্জলি হয়েছে স্কুলের বার্থ ডে-তে অবন্তী শাড়ি পরবে, অবন্তী টুয়েলভ ক্লাস শেষ করার পর দিল্লি ইউনিভার্সিটিতে পড়তে চাচ্ছে।

আমার জবাব, তা বেশ, তা বেশ। অবন্তীর জন্য টাকা লাগলে বলো কিন্তু।

তার দলের রাজনৈতিক কর্মীরা যখন বাসায় আসতে শুরু করল আমার মেজাজ সামলে রাখা কষ্টকর হয়ে উঠল।

আমার বিরক্তি তার না বোঝার কথা নয়। আমি বলেই ফেলেছি, তোমাদের পার্টি অফিসে শোয়ার জায়গা নেই, সেখানে থাকলেই পারো। তাহলে তোমার চামচাদের কষ্ট করে এতোদূর আসতে হয়।

শবনমও বলে, আবদুল খালেক, তুমি কাদের চামচা বলছ? দে আর মাই পার্টি ওয়ার্কার্স। আমাকে তাদের ওপর নির্ভর করতে হয়, তোমার ওপর নির্ভর করলে আমাকে থেমে যেতে হবে।

তিক্তস্বরে আমি বলি, তুমি থামবে কেন। তুমি ম্যাগলেভ ট্রেনের মতো সব রেলগাড়িকে টেক্কা দেবে তুমি বুলেট ট্রেনকে ছাড়িয়ে যাবে। তুমি থেমো না। থামলেই মৃত্যু, নিশ্চুপ হলেই মৃত্যু- সাইলেন্স ইজ ডেথ।

শবনম বলল, বিয়ের সময় তুমি জানতে না আমি পলিটিক্যাল অ্যাক্টিভিস্ট? ননসেন্স!

জানতাম। জানতাম বলেই এতোটা ছাড় দিয়েছি। আর নয়। এনাফ ইজ এনাফ।

তখন রাত সাড়ে এগারটা।

শবনম বলল, ফাইন, এতোটা ছাড় দেয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ।

সেই পোশাকই তার পরনে, কাপড় বদলানো হয়নি।

আমি রুমে ঢুকি। মূল দরজা খোলার শব্দ পাই।

প্রবল অস্বস্তি নিয়ে এক ঘণ্টারও বেশি সময় শুয়ে থাকার পর আবার উঠি। শবনমের রুমে উঁকি দেই, নেই। বাথরুমে নেই। মূল দরজায় যাই, খোলা।

আমি দরজা বন্ধ করি। শবনম এসে সারারাত ডাকাডাকি করলেও দরজা খুলব না।

শবনম সে রাতে ফেরেনি, পরের দু’দিনও না।

বাবার বাড়িতে নিজের রুম দখল সে কখনো ছাড়েনি। তার বাবা নেই প্রায় তিন বছর। যে বাড়িতে পলিটিক্যাল কর্মীদের আনাগোনা ঘটলে অন্তত বাড়ির কেউ অসন্তুষ্ট হবে।

চতুর্থ দিন দরজার তালা দিয়ে আরো দুটো কাগজ। একটির ওপর লেখা রেজাল্ট। অবন্তীর রেজাল্ট ভালো হয়নি। তিনটি বিষয়ে এ মাইনাস, একটিতে বি, বাকিগুলো এ; একটি এ প্লাসও নেই।

অপর কাগজটি আসলে তাদের পার্টি অফিসের লেটারহেড। এতে সম্বোধনহীন ছোট্ট চিঠি। বাবার বাড়িতে থাকছি, দরকার মনে করলে যোগাযোগ করো।

না, আমি দরকার মনে করি না।

শবনম মেহনাজ চিশতি, তোমার সঙ্গে আর একটি দিনও না।

ডিভোর্স নোটিশ আমি রাগের মাথায় পাঠাইনি। গত ক’বছর ধরে আমি যা করতে চেয়েছি, এটা তাই।

দুর্গা পূজা এবং আরো কোনো কোনো স্পেশাল ডে উপলক্ষে অবন্তীর বোর্ডিং স্কুল পুরো এক সপ্তাহ ছুটি। আমাদের সম্পর্ক এখন যেখানে এসে ঠেকেছে, শবনমকে আর দার্জিলিং আসা যাওয়া করতে বলা যায় না ভিসা দিতে আমাকে একদিন দেরি করিয়ে দিল। আমি যখন পৌঁছি দেখি অবন্তী শবনমের সঙ্গে বেরোচ্ছে।

শবনম আমাকে দেখে বলল, দু’জনের আমার কি দরকার ছিল? আমি বললাম, আমার মেয়ে আমি আসব না।

শবনম বলল, সেটা ঠিক, টাকাটা বেঁচে গেলে অবন্তীর জন্যই তো থাকত।

আমি বিড়বিড় করে বলি, শবনম চিশতি, তুমি আমাকে সেভিং শেখাচ্ছো? কিপ্টে বলে আমার যথেষ্ট বদনাম আছে।

অবন্তী বলল, থাক বাবা, এরপর তুমি এসো না। মা যখন খুব ব্যস্ত হয়ে পড়বে, মা-ই তোমাকে আসতে বলবে।

আচ্ছা অবন্তী, ভালো থেকো, বলে সেদিনই আমি কোলকাতা ফিরে আসি। কলেজ স্ট্রিটের পাশে একটা ছোট হোটেলে রাত কাটিয়ে পরদিনই ঢাকার বাস ধরি। পয়সা বাঁচাতে আমি বাসেই এসেছি।

(বার)

ভাইব্রেশনে রাখা ফোন হঠাৎ শরীরে শিহরণ তোলে। আমি পকেট থেকে বের করে স্ক্রিনে নাম দেখি; রোজালিন ফার্নান্দেজ।

রোজালিন বলে, শুনুন মিশেল এখনো বাসায় ফেরেনি। আমাদের সানতুরে পৌঁছতে একটু দেরি হবে, সাড়ে সাত কি পৌনে আট।

তখন সোয়া সাতটা, আমি রেস্তোরাঁর বাইরের খোলা জায়গাটায় পায়চারি করছি। মিশেলকে কি বলব, নিজে নিজে তার রিহার্সেল দিচ্ছি। ভাবছি এরকম একটা কথা বলা কি ঠিক হবে; আমার মেয়ে অবন্তী চাওয়াতেই আমি শবনম চিশতিকে বিয়ে করেছিলাম। এখন মিশেল তুমি যদি চাও তাহলেই আমি আর তোমায় বিয়ে করব।

তখন মিশেল যদি প্রশ্ন করে আপনার কি কোনো চাওয়া নেই? এ প্রশ্নের কি জবাব হবে?

আবার ফোনে ভাইব্রেশন। স্ক্রিনে রোজালিন ফার্নান্দেজ। রোজালিন বলল, একটা খারাপ খবর আছে। মিশেল তার বান্ধবীর মুশাররাতের বাসায় ছিল, হঠাৎ প্রচণ্ড পেটব্যথা শুরু হয়। খুব সিরিয়াস। বলল আমরা মিশেলকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে নিয়ে যাচ্ছি, আন্টি ইমার্জেন্সিতে চলে আসুন। আমি ওর আসতে দেরি দেখে একাই রওয়ানা হয়েছিলাম, এখন গন্তব্য বদলে ঢাকা মেডিকেলের দিকে যাচ্ছি।

আমি বার বার বললাম, আই অ্যাম সরি, ইটস স্যাড। মিশেলের ভালো ট্রিটমেন্ট লাগবে, দরকার হলে হসপিটালাইজড করতে হবে, আমিও আসছি।

আমিও পৌঁছি। মিশেল বান্ধবীর বাসায় ছিল এটা সত্যি। মুশাররাতদের গাড়িতে ঢাকা মেডিকেলের ইমার্জেন্সিতে আনা হয়েছে এটাও সত্যি, সিরিয়াস পেট ব্যথার বিষয়টি মিথ্যে। মিশেল আত্মহত্যার উদ্দেশ্যে অনেকগুলো ঘুমের ট্যাবলেট খেয়েছে, এ অবস্থায় ফেলে রাখলে মরারই কথা। ডাক্তার স্টোমাক ওয়াশ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এখন ওয়াশ চলছে।

ওয়াশ করার প্রক্রিয়াটি ভয়াবহ। ভারি ট্রলিতে শুইয়ে হাত-পা ট্রলির সঙ্গে বেঁধে মুখের ভেতর দিয়ে তীব্র গতির পানি ঢুকানো হয়। রোগী বারবার বমি করে পাকস্থলি খালি করে।

যে রুমে ওয়াশ দেওয়া হচ্ছে তার বাইরে মিশেলের মা রোজালিন ফার্নান্দেজ, বান্ধবী মুশাররাত, মুশররাত তার ফুপু পিংকিকে নিয়ে এসেছে, পিংকি একটি প্রাইভেট মেডিকেল কলেজে থার্ড ইয়ারে পড়ছে। হাসপাতালে রোগীর সঙ্গে এমন একজন শিক্ষার্থী কিংবা তরুণ ডাক্তার খুবই সহযোগী হয়ে উঠে। বাইরে দাঁড়িয়ে আমিও। পিংকি এগিয়ে এসে বলে, স্যার আমি আপনাকে চিনি, আমি পিংকি, আপনার কলেজে পাঁচ মাস পড়েছি। তারপর বাবার সঙ্গে কাতার চলে যাই। বাবা বিমানের স্টেশন ম্যানেজার ছিলেন।

আমি ওহ আচ্ছা, তাই নাকি বলে এ পর্বটা শেষ করতে চাই। কিন্তু পিংকি জিজ্ঞেস করে বসে শবনম ম্যাম কেমন আছেন? কী যেন নাম আপনাদের মেয়েটার? শবনম ম্যাম আর আমি ফেসবুক ফ্রেন্ড। স্যার আমি কবিতা লিখি, এবার আমার বই বেরিয়েছে, বইয়ের নাম ‘আমি বনলতা সেন’ আমি ‘পিংকি বিভোর’ নামে কবিতা লিখি। স্যার, আমি একটা বই পাঠাবো আপনাকে। ঠিকানা দিন।

কলেজে পাঠিয়ে দিয়ো।

পিংকি বলল, না, আমি বাসায় গিয়ে নিয়ে আসব।

আমি কোনোভাবে কবি পিংকি বিভোরকে এড়িয়ে রোজালিনকে বলি, আমাকে এখানে দেখলে মিশেলের ভিন্ন কোনো রিঅ্যাকশন হতে পারে, আমি বরং যাই। আর মাত্র কয়েকটা দিন, শবনমের সঙ্গে ব্যাপারটা চূড়ান্ত হোক। আমরা আগের জায়গাতেই যাবো, মিশেলও থাকবে।

রোজালিন হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, বলল, এই মিশেল হারামজাদি আমার মুখ একেবারেই সহ্য করতে পারে না। আমাদের ডিনার প্রোগ্রামটা ভণ্ডল করার জন্য সে ইচ্ছে করেই এ কাজটা করেছে।

এই মুহূর্তে আমি মিশেল এবং পিংকি বিভোর দুজনকেই এড়াতে চাই।

আচ্ছা রোজালিন, আমি বলে করিডোর দিয়ে দ্রুত পা চালাতে থাকি, আমি পিংকির কণ্ঠ স্পষ্ট শুনতে পাই, স্যার, আমি বই নিয়ে শিগগির আপনার বাসায় আসছি।

যতো দামি চকোলেটই হোক, এ অবস্থায় চকোলেট দেওয়া যায় না, আমি দিইনি। কাগজের প্যাকেটটা আমার হাতেই ছিল। থাকুক, পরে দেওয়া যাবে। আমি জানি, একবার দেখা হলে আমি মিশেলকে ট্যাকল করতে পারব।

আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে দোয়েল চত্বর হয়ে বাংলা একাডেমি অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন, টিএসসি পর্যন্ত হেঁটে এসে ফ্লাঙ্ক হাতে ভ্রাম্যমাণ চা-ওয়ালার কাছ থেকে ছ’টাকায় এককাপ চা কিনে খাই। আমি গোলচক্কর ঘুরে আবারও হাঁটতে থাকি। ঢাকা ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরি, কবি নজরুলের সমাধি আর্ট কলেজ পেরিয়ে জাদুঘর বরাবর রাস্তা পেরিয়ে ফুলের দোকানের সামনে। আরো কিছুটা হেঁটে শিশুপার্কের গেট বরাবর তীব্র জ্যামের কারণে ভারি পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িগুলোর ফাঁকফোঁকর দিয়ে রাস্তা পার হই। ধুলোর আস্তরণ পড়েছে আমার জুতোর ওপর।

অন্তত পনের বছর পর রমনা পার্কে ঢুকি, আরো ভেতরে গিয়ে কংক্রিটের বেঞ্চে বসি। হেলান দেই, আকাশে চোখ রাখি। চাঁদ এতো গোল কেন? পূর্ণিমা নাকি?

আমি প্যাকেট খুলে চকোলেটের সুন্দর কৌটাটা বের করি, একটা চকোলেট বের করি। খাই। দারুণ মজাতো।

তাহলে আমি এমন মজার একটা জিনিস কিনে খাই না কেন?

আর একটা চকোলেট মুখে দেই, এটার স্বাদ ভিন্ন স্ট্রবেরির নাকি? আরো একটা কামড় বসাতেই ভেতর থেকে জুস বেরিয়ে আসে। পরবর্তী প্রায় একটা ঘণ্টা আমি একটার পর একটা চকোলেট খেয়ে কৌটাটা খালি করি।

খালি কৌটাটি ডিসকাস থ্রো-র মতো করে নিক্ষেপ করি। বাচ্চারা কেন চকোলেট পছন্দ করে বুঝতে পারি। চকোলেট উজ্জীবিতও করে।

চকোলেটের কাঁচামাল হচ্ছে কোকো, ব্রাজিলে সবচেয়ে বেশি উৎপন্ন হয়। চকোলেট অর্থনীতির উপর আমাকে কিছুটা পড়াশোনা করতে হবে। একটা লেকচারও দেবো।

আমি লম্বা পথ হেঁটে রমনা পার্কের শেরাটন হোটেল প্রান্ত (নাম বদলে আবার আগের ইন্টারকন্টিনেন্টালে ফিরে গেছে) কিংবা মিন্টু রোড প্রান্ত দিয়ে বের হই।

টের পাই, একটি ম্যাসেজ এসেছে। ফোন টিপি, রোজালিন ফার্নান্দেজ : সরি, সন্ধ্যাটা নষ্ট হয়ে গেল। মিশেলকে নিয়ে বাসায় ফিরছি।

হঠাৎ আমি পিছলে পড়তে পড়তে উঠে দাঁড়াই। ম্যাসেজ পরার সময় রাস্তার দিকে তাকাইনি। তরতাজা কোনো গরুর সদ্য ত্যাগ করা একদলা গোবরে আমার ডান জুতোর প্রায় পুরোটাই দেবে গেছে।

আর একটু এগিয়ে দেখি রাস্তার পাশে জমে থাকা বৃষ্টির পানি অগভীর পানিতে জুতোটা নাড়াচাড়া করে ধুতে চেষ্টা করি। চাঁদের আলোয় বুঝতে পারি পানিতে গোবর মিশে পানির রংটা কালচে সবুজ হয়ে গেছে।

আমি হাঁটতে থাকি। যখন পরিবাগ ফুট ওভারব্রিজ বাংলা মোটর পান্থকুঞ্জ পেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফার্মগেট পৌঁছি তখন আমার ভাত খেতে ইচ্ছে করে।

(চলবে)

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj