ন্যায় বিচারের আশায় ৩২ বছরের অপেক্ষা

মঙ্গলবার, ২১ জানুয়ারি ২০২০

সমরেশ বৈদ্য, চট্টগ্রাম থেকে : বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ‘চট্টগ্রাম গণহত্যা’র মতো বর্বরোচিত ঘটনাটি একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। দীর্ঘ ৩২ বছর পর গতকাল সোমবার ইতিহাসের গণধিকৃত এই হত্যাকাণ্ডের বিচারে ৫ আসামির মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন নি¤œ আদালত। সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শী ও মামলায় যারা আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন তাদের জবানিতেই উঠে এসেছে যে, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করতেই সে সময়কার পুলিশ কমিশনার মির্জা রকিবুল হুদার নির্দেশে তার গাড়ি ও তাকে লক্ষ্য করেই গুলি করেছিল পুলিশ।

সামরিক স্বৈরাচার হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরকারের শেষ দিকে ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বন্দরনগরীর লালদীঘি ময়দানে এক জনসভায় যাওয়ার পথে পুরাতন বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে তার গাড়িবহরে নির্বিচারে গুলি চালায় পুলিশ। এতে ২৪ জন নিহত এবং কমপক্ষে দুই শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। ঘটনাটি ‘চট্টগ্রাম গণহত্যা’ হিসেবে পরিচিতি পায়।

২০১৮ সালের ১ নভেম্বর ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে চট্টগ্রামের ১৭টি প্রকল্পের উদ্বোধনের সময় চট্টগ্রামের এই গণহত্যার বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আক্ষেপ করেছিলেন। সেদিন যে ১৭টি প্রকল্প প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে উদ্বোধন করেছিলেন তার মধ্যে ‘১৯৮৮ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নিহত ২৪ জন নেতাকর্মীসহ গণতন্ত্রকামী বীর শহীদদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ’ ছিল একটি। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কৃর্তপক্ষ।

সেই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘সেই মামলা এখনো শেষ হলো না, সেটা আমার দুঃখ।’ সেই ভিডিও কনফারেন্সে চট্টগ্রামে সমবেতদের মধ্যে নগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ইব্রাহিম হোসেন চৌধুরী বাবুল ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারির সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী আবারও বিষয়টির অবতারণা করে বলেন, ‘আপনি সেদিনের স্মৃতি মনে করিয়ে দিলেন। সেদিন সরাসরি গুলি ও লাঠিচার্জ করা হয়েছিল। এখনো মামলাটি শেষ হয়নি। মামলাটি যিনি করেছিলেন তিনিও এখন বেঁচে নেই। আপনি একজন আইনজীবী, আপনারা উদ্যোগ নেন মামলাটা যেন দ্রুত শেষ হয়।’ সেদিন প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ‘যে পুলিশ কর্মকর্তা সেদিন গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, বরং খালেদা জিয়ার সময়ে তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল।’

এই মামলার অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী ও মামলার সাক্ষী ছিলেন চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি অঞ্জন কুমার সেন। গতকাল সোমবার রায় ঘোষণার পর প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, রায়ে আমি মোটামুটি সন্তুষ্ট। তবে শুধু ৫ জন কেন, আমার জানামতে সেদিন অন্তত ১৫/২০ জন পুলিশ জননেত্রী শেখ হাসিনার গাড়িবহরকে লক্ষ্য করে এবং আন্দোলনকামী জনতার প্রতি নির্বিচারে গুলি করেছিল। তাদেরও শাস্তি হওয়া প্রয়োজন ছিল। তবে ৩২ বছর পরও যে আপাতত এই রায়টি হয়েছে তাও কম নয়।

তিনি সেদিনের ঘটনার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, আমি পেশাগত দায়িত্ব পালনে চলে গিয়েছিলাম চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে। সেখানে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেত্রী ও ১৫ দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাসহ অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে বহন করা ‘ট্রাকমঞ্চটি’তে আমাকে তুলে নেন দৈনিক সংবাদের তৎকালীন চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান জাফর ওয়াজেদ, যিনি এখন বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের ডিজি হিসেবে কর্মরত।

অঞ্জন সেন বলেন, সেই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর চট্টগ্রামে সম্মিলিত পেশাজীবী সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে একটি গণতদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছিল। সেই গণতদন্ত কমিশনের অনুসন্ধানে দেখা গিয়েছিল, সেদিন পুলিশ শুধু আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে বহনকারী গাড়ি লক্ষ্য করেই গুলি ছোড়েনি, তারা অন্তত ২২টি স্পটে আন্দোলনকারী জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে এই হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়েছিল।

প্রবীণ এই সাংবাদিক বলেন, সেদিন সরাসরি শেখ হাসিনাকে লক্ষ্য করেই গুলি করা হয়েছিল, কিন্তু অত্যন্ত সৌভাগ্যক্রমে নেত্রী সেদিন রক্ষা পান। এরপর চট্টগ্রামে তৎকালীন বার কাউন্সিলের সদস্য জালাল উদ্দিন আহমদসহ অন্যান্য আইনজীবীরা নেত্রীর গড়িটিকে ঘিরে মানববর্ম তৈরি করে পাহাড়ের ওপর আদালত ভবনে নিয়ে যান।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj