থানা হেফাজতে আবু বক্করের মৃত্যু : পায়ে-মাথায় আঘাতের চিহ্ন, উত্তাল এফডিসি

মঙ্গলবার, ২১ জানুয়ারি ২০২০

কাগজ প্রতিবেদক : রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা হেফাজতে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) কর্মকর্তা আবু বক্কর সিদ্দিকের (৪৫) মৃত্যুর ঘটনায় তোলপাড় চলছে। আবু বক্করের গলায় কালো দাগ এবং পায়ে ও মাথায় আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ।

এ ঘটনায় বিচারের দাবিতে গতকাল সোমবার সকালে বিএফডিসির সামনের সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে মৃতের সহকর্মীরা। কোনোভাবেই পুলিশ এ ঘটনার দায় এড়াতে পারে না বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম। থানা হেফাজতে আবু বক্করের মৃত্যুতে কারো দায়িত্বে অবহেলা থাকলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে বিবৃতি দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।

এর আগে, গত রবিবার ভোরে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল হাজতখানা থেকে আবু বক্করকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করে ঢামেক হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশের দাবি- এটি আত্মহত্যা। তবে মৃতের সহকর্মী ও স্বজনরা দাবি করেছেন, থানা হেফাজতে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে আবু বক্করকে।

গতকাল বিকেলে আবু বক্করের লাশের ময়নাতদন্ত শেষে ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, মৃতদেহের গলায় কালো দাগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া তার মাথায় ও পায়ে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তবে এই আঘাত তার মৃত্যু হওয়ার মতো নয়। মৃতদেহ থেকে নেক টিস্যু, ভিসেরাসহ আলামত সংগ্রহ করে হিস্টোপ্যাথলজিতে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে রিপোর্ট আসলে সব মিলিয়ে পর্যালোচনা করে পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট দেয়া হবে।

আবু বক্করকে নির্যাতন করেই মেরে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তার সাবেক স্ত্রী আলেয়া ফেরদৌসী। সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন, চিকিৎসকের বক্তব্যেও নির্যাতনে মৃত্যুর বিষয়টি উঠে এসেছে। আমরা এর বিচার চাই। তাকে মাথায় আঘাত করেই মারা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে সিসিটিভির যে ফুটেজ দেখানো হয়েছে তার সঙ্গে আবু বক্করের কোনো মিল নেই। কারণ ফুটেজের ওই লোকের পরনে জিন্স প্যান্ট ও অ্যাশ কালারের গেঞ্জি, আর আবু বক্করের পরনে ছিল টাউজার ও টি শার্ট।

এদিকে, গতকাল সকাল ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত বিএফডিসির সামনের সড়ক অবরোধ করে আবু বক্করকে হত্যার বিচার চেয়ে বিক্ষোভ করেছে বিএফডিসির সব শ্রেণির কর্মচারীরা। এ সময় উভয় পাশের সড়কে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে পুলিশের আশ্বাসে তারা সড়ক ছেড়ে দেয়।

বিএফডিসির ফ্লোর ইনচার্জ সাইদুল ইসলাম বলেন, একটা সুস্থ মানুষকে মোটরসাইকেল থেকে গ্রেপ্তার করে থানায় নেয়ার পর সেখানে কীভাবে তার মৃত্যু হলো? থানা হাজতে তো তার নিরাপদে থাকার কথা। এ মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। জুনিয়র ক্যামেরা সহকারী মোতালেব হোসেন বলেন, আমরা তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ওসি আলী আজমের ফাঁসি চাই। কেন এমন ঘটল, আমরা তা জানতে চাই।

বিএফডিসির তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী ট্রেড ইউনিয়নের নেত্রী ফিরোজা বেগম বলেন, আবু বক্করকে গ্রেপ্তার করা হলো শনিবার। তখনও তার বিরুদ্ধে মামলা হয়নি। মামলা হয়েছে রবিবার। মামলা হওয়ার আগেই তাকে নির্যাতন করা হয়েছে। জানালার গ্রিলের সঙ্গে কেউ চাদর দিয়ে আত্মহত্যা করতে পারে না। তার শরীরে দাগ, গলায় চিকন দাগ, চাদর দিয়ে আত্মহত্যা করলে তার গলায় মোটা দাগ থাকবে।

তিনি আরো বলেন, আবু বক্কর সরকারি কর্মকর্তা। ঢাকার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে শেওড়াপাড়ার একটি কেন্দ্রের সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, এমন চিঠিও আসছে। তার সঙ্গে পুলিশ এমন আচরণ করল কীভাবে? আমরা এর বিচার চাই।

এদিকে, গতকাল ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুলিশ সার্ভিস এসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির ফুল দেয়ার পর সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেছেন, গ্রেপ্তার আসামি থানা হেফাজতে আত্মহত্যা করলে পুলিশের দায় এড়াতে পারে না। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় পুলিশ হেফাজতে থাকা এক আসামির মৃত্যু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এই মৃত্যু আত্মহত্যা বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে কেউ দোষী প্রমাণিত হলে তার বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

গতকাল দুপুরে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া এন্ড পিআর) মো. সোহেল রানা স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, হেফাজতে মৃত্যু নানা কারণে হতে পারে। নির্যাতনের অভিযোগ যেমন উঠে আসে, তেমনি অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যুর উদাহরণও রয়েছে। হেফাজতে আত্মহত্যাজনিত মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে কখনো কখনো। পুলিশি হেফাজতে যে কারণেই মৃত্যু ঘটুক না কেন, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা পুলিশ সদস্যদের কোনো গাফিলতি, বিচ্যুতি বা অপরাধ প্রমাণিত হলে তার বা তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই উপযুক্ত আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

প্রসঙ্গত, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্ক গড়া এবং ছবি তুলে ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগে এক নারী মামলা করার পর গত শনিবার এফডিসির ফ্লোর ইনচার্জ বাবুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ৪৫ বছর বয়সী বাবু সেই রাতেই থানা হাজতে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন বলে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা পুলিশের ভাষ্য।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj