ওরাই প্রথম

সোমবার, ২০ জানুয়ারি ২০২০

হাজারো প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে নারীর অগ্রযাত্রা এখন দৃশ্যমান। শুধু তা-ই নয় বাধার পাহার ডিঙিয়ে নারীরা সমাজে সৃষ্টি করছেন দৃষ্টান্ত। নিজ সমাজে ইতিহাস সৃষ্টিকারী এমনই তিন নারী রূপানন্দা রায়, সাদিয়া আক্তার পিংকি ও সনু রানী দাস। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভেতরে রূপানন্দা প্রথম নারী যিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত প্রথম তৃতীয় লিঙ্গের প্রতিনিধি পিংকি। আর নারায়ণগঞ্জের টানবাজার সুইপার কলোনির প্রথম মেয়ে গ্র্যাজুয়েট সনু। এই তিন নারীর প্রতিবন্ধকতা জয়ের গল্প নিয়ে অন্যপক্ষের এবারের আয়োজন। প্রতিবেদনটি লিখেছেন সেবিকা দেবনাথ।

ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নারীদের পিছিয়ে থাকা কষ্ট দেয় রূপানন্দাকে

রাঙামাটি শহরের রাজবাড়ি এলাকার অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা বিক্রম রায় ও বিপাশা রায়ের ছোট মেয়ে রূপানন্দা। সেখানেই বেড়ে ওঠা। তবে বাবার কাজের সূত্রে এক সময় ঢাকায় চলে আসতে হয়। এখানেই মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক। পড়াশোনায় ভালো ফলাফল করে চাকমা জাতিগোষ্ঠীর রূপানন্দা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানে ভর্তি হয়েছিলেন ২০০৭ সালে। এখানে পড়ার সময় ২০০৯ সালে অস্ট্রেলিয়া সরকারের বৃত্তি পেয়ে পাড়ি জমান অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেডে। ইউনিভার্সিটি অব অ্যাডিলেড থেকে ২০১২ সালে প্রথম শ্রেণি পেয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। রেজাল্ট ভালো হওয়ায় পিএইচডি করার কথা ভাবতে থাকেন রূপানন্দা। তার পিএইচডির বিষয় ছিল বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিক-সংক্রান্ত নীতিমালার মূল্যায়ন। রূপানন্দার নির্বাচিত বিষয় শিক্ষকদেরও বেশ পছন্দ হয়। এ জন্য শিক্ষকরাও তার প্রশংসা করেন। গবেষণার কাজে ছয় মাস বাংলাদেশে ছিলেন রূপানন্দা। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে জমা দেন পিএইচডি অভিসন্দর্ভ। গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর সমাবর্তনে তাকে ডিগ্রি দেয়া হয়। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমন অর্জন নতুন কিছু নয়। কিন্তু রূপানন্দার এ অর্জনের সঙ্গে তৈরি হয়েছে নতুন এক ইতিহাস। বাংলাদেশে যে ৫০টির বেশি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী রয়েছে তাদের ভেতরে রূপানন্দাই প্রথম নারী যিনি এ ডিগ্রি অর্জন করেন।

এ অর্জনে রূপানন্দার আনন্দ আর কষ্ট এই দুই রকম অনুভূতিই হয়েছে। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রথম নারী হিসেবে এমন অর্জনে তিনি যেমন আনন্দিত তেমনি উচ্চ শিক্ষায় এখনো এই জনগোষ্ঠীর নারীদের পিছিয়ে থাকার চিত্র তাকে কষ্টও দেয়।

তৃতীয় লিঙ্গ নয়, নারী পরিচয়েই থাকতে চান পিংকি

ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর উপজেলার দোড়া ইউনিয়নের সোয়াদি গ্রামের দরিদ্র পরিবারে জন্ম হয় সাদিয়া আক্তার পিংকির। বাবা নওয়াব আলী শিক্ষক ছিলেন। কিন্তু ছোটবেলায় বাবা মারা যায়। তখন মা, চার ভাই-বোনের পরিবারে বড় হয়েছেন পিংকি।

জীবনের নানান চড়াই-উৎরাই পার করে এলাকার বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেতে পেরেছিলেন পিংকি। যখন তিনি বড় হতে থাকেন স্থানীয় লোকজন তাকে ‘হিজড়া’ বলে কুট‚ক্তি করত। অসম্মান করে নানা কথা বলত। কেউ মিশতে চাইত না। ক্রমেই পিংকির গণ্ডি ছোট হয়ে আসতে থাকে। অভিমানে ১৫ বছর আগে উপজেলার বলুহড় বাস স্ট্যান্ডের কাছে বাসা ভাড়া নিয়ে একাই সেখানে থাকতে শুরু করেন। পরে তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। রাজনীতির ব্যস্ততার মাঝে নিজেকে ডুবিয়ে রাখতেন। তিন বছর উপজেলা যুব মহিলা লীগের আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সমাজের সব বাধা-কুসংস্কারকে পেছনে ফেলে মানুষের কল্যাণে তিনি দীর্ঘদিন কাজ করে যাচ্ছেন। সিদ্ধান্ত নেন এলাকার মানুষ এবং তৃতীয় লিঙ্গের অধিকার আদায়ের জন্য নারী ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করবেন। যেই ভাবনা সেই কাজ। ২০১৮ সালের ১৫ অক্টোবর উপজেলা নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিপুল ভোটে জয়ী হন পিংকি। গড়লেন এক ইতিহাস। দেশে প্রথমবারের মতো নির্বাচিত তৃতীয় লিঙ্গের ভাইস চেয়ারম্যান তিনি।

লিঙ্গ বৈষম্য দূর করে সমাজের অবহেলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তৃতীয় লিঙ্গের অধিকার আদায়ে আমৃত্যু কাজ করে যেতে চান সাদিয়া আক্তার পিংকি।

নিজেকে সুইপার পরিচয় দিতে এখন গর্ববোধ করেন সনু

সনু রানী দাস। নারায়ণগঞ্জের টানবাজার সুইপার কলোনিতেই তার জন্ম, বেড়ে ওঠা এবং বিয়ে। নিচু বর্ণের লোক হিসেবে প্রতি পদে পদেই নিগ্রহ ও বৈষম্য দেখেই বড় হয়েছেন সনু। নিজেও শিকার হয়েছেন এমন নিগ্রহ ও বৈষম্যের। পড়াশোনা কিংবা বড় চাকরি তাদের কাছে অধরা স্বপ্নের মতো।তবে সেই অধরা স্বপ্নকে অনেকটা বাস্তবে রূপ দিয়েছেন সনু। ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা বহুবার তার পথ আগলে রাখতে চেয়েছে। কিন্তু সনু অদম্য। সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে ২০০৬ সালে মাধ্যমিক, ২০০৮ সালে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। এক বছর বিরতি দিয়ে ২০১০ সালে ডিগ্রিতে ভর্তি হন। ২০১৪ সালে স্নাতক পাস করেন সনু। এই কলোনি থেকে প্রথমবারের মতো কোনো মেয়ে গ্র্যাজুয়েট হলো। দলিত নারীর প্রতিনিধি হিসেবে সনু বৃটেন, সুইজারল্যান্ড এবং ব্রাজিলেও গিয়েছেন। তুলে ধরেছেন তার সম্প্রদায়ের বাস্তব পরিস্থিতি। এই অবস্থা কলোনির মানুষের কাছে সনুর সম্মান বাড়িয়েছে। তবে এ যাত্রাপথ মোটেও মসৃণ ছিল না।

সনু জানান, নিজের পরিচয় গোপন করতে বস্তির পেছনের দরজা দিয়ে মুখ ঢেকে বের হতো সে। স্কুলে দলিত স¤প্রদায় বলে কেউ তাদের সঙ্গে মিশতে চাইত না। ওই সময় শুধু শিক্ষার্থীরা নয়, স্কুলের শিক্ষকরাও তাদের মেনে নিত চাইত না।

সুইপার হয়ে স্কুলে পরিচয় দিতে এক সময় লজ্জা পেলেও এখন সনু গর্বের সঙ্গে পরিচয় দেন ‘আমি সুইপার’ বলে। সনু স্বপ্ন দেখেন, ভালো একটা চাকরির এবং সেখান থেকে নিজ স¤প্রদায়ের জন্য কিছু করার।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj