অবহেলিত সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলররা : সারথী ভৌমিক

সোমবার, ২০ জানুয়ারি ২০২০

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে রাজধানীতে এখন উৎসবের আমেজ। প্রচার ও প্রচারণা চলছে জোরেশোরে। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা দিচ্ছেন নানান প্রতিশ্রæতি। কিন্তু সংরক্ষিত ওয়ার্ডের নারী কাউন্সিলর প্রার্থীরা অনেকটাই হতাশ।

সিটি করপোরেশন আইন অনুযায়ী, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সাধারণ কাউন্সিলররা একটি ওয়ার্ড থেকে এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলররা ৩টি ওয়ার্ড থেকে নির্বাচিত হন। সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করলেও সব ক্ষেত্রে নারী বিবেচনায় তাদের অবহেলা বা কোনো বৈষম্য করা যাবে না। এ বিষয়ে হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবে তা দৃশ্যমান নয়।

স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচিত হওয়ার পর সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর ও সাধারণ কাউন্সিলরদের মধ্যে নাগরিক সেবায় কাজ করার তেমন পার্থক্য নেই। তাদেরও পুরুষ কাউন্সিলরদের মতো এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখার কথা। কিন্তু কোনো পরিপত্র না থাকায় সংরক্ষিত আসনের নারী কাউন্সিলররা কোনো উন্নয়নমূলক কাজ করতে পারেন না। কাজের ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা কম। ফলে জনগণকে দেয়া প্রতিশ্রæতি পালন করা সম্ভব হয় না।

সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলরদের অভিযোগ, নারী কাউন্সিলরদের তিনটি ওয়ার্ডের দায়িত্ব পালন করতে হলেও তাদের সম্মানী ভাতার পরিমাণ খুবই সামান্য। জনবলের অভাব আছে। বরাদ্দ অর্থের অভাবে সব ওয়ার্ডের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয় না। নিজ নিজ দলের মধ্যে পুরুষ সদস্যরা চান না নারীরা এগিয়ে আসুক। মনোনয়ন দেয়ার ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে ব্যক্তিগত ইচ্ছা প্রতিফলিত হয়। নারী-পুরুষের সমতা রেখে মনোনয়ন দেয়া হয় না। উন্নয়ন কাজ দেখাশোনা করতে গিয়ে কোনো কোনো নারী কাউন্সিলরকে লাঞ্ছিত পর্যন্ত হতে হয়েছে।

আসন্ন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ৪৩টি সংরক্ষিত ওয়ার্ড। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৮ এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ২৫টি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এক নারী কাউন্সিলর জানান, এলাকার মানুষ বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে তাদের কাছে এলেও তারা কিছু করতে পারেন না। এলাকার উন্নয়নমূলক কাজ নিয়ে তারা একটু তৎপর হলেই পুরুষ কাউন্সিলররা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। পুরুষ কাউন্সিলর দ্বারা লাঞ্ছিতও হয়েছেন। এ বিষয়ে মেয়রসহ অনেকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেও কোনো বিচার পাননি। এসব কারণে নারী কাউন্সিলররা নিজেকে গুটিয়ে নেন।

১৫ বছর ধরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ২৭, ২৯ ও ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন শামসুন নাহার ভূঁইয়া। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশনে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য কমিটি করা হয়। এসব কমিটিতে নারী ২/৩ জন ছাড়া বাকি সবাই পুরুষ। অথচ নারী কাউন্সিলররা নির্বাচনের মাধ্যমে এই পদে আসেন। সিটি করপোরেশনের প্রতিটি কাজে নারীদের সমান সুযোগ দিতে হবে।

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৮, ৯ ও ১০ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর প্রার্থী মিনু রহমান বলেন, অর্থের অভাবে আমরা কাজ করতে পারি না। তিনটি ওয়ার্ডের দায়িত্বে আমি, কিন্তু রবাদ্দ দেয়ার ক্ষেত্রে অনেক স্বল্পতা থাকে। এ অবস্থার পরিবর্তন দরকার।

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৬, ১৭, ২১ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর ও প্রার্থী নারগীস মাহতাব বলেন, আমরা একজন পুরুষের চেয়ে মেধা-শ্রম বেশি দিয়ে থাকি। আমি তিনটি ওয়ার্ডের কাউন্সিলর। একটি ওয়ার্ডের পুরুষ কোনো কাউন্সিলরের সমান সুযোগ দিলে তো হবে না। আমাকে তিনটি ওয়ার্ডের কথা চিন্তা করে মানুষের সেবা করতে সুযোগ দিতে হবে।

নারী কাউন্সিলররা জানান, নারী কাউন্সিলরদের কাজের পরিধি বর্তমানের চেয়ে আরো বাড়ানো, নাগরিক সেবায় তাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, শুধু নামমাত্র কাউন্সিলর হিসেবে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে সংযুক্ত না রেখে নগর উন্নয়নে তাদের সরাসরি দায়িত্ব প্রদান, কাউন্সিলর কার্যালয় না থাকা, এলাকাভিত্তিক নির্দিষ্ট কাজ ভাগ করে দেয়া, পুরুষ কাউন্সিলরদের মতো নারী কাউন্সিলরদেরও নিজ নিজ এলাকায় বিশেষ বাজেট প্রদান, নাগরিক দুর্দশা লাঘবে সরাসরি প্রকল্প গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নের ক্ষমতা প্রদান, মেয়রের সব কাজে অংশগ্রহণ করে দেশের উন্নয়নে সরাসরি ভূমিকা পালনের সুযোগ প্রদানসহ বর্তমানের চেয়ে আরো বেশি কার্যকর ভূমিকা থাকতে মন্ত্রীর সাহায্য চেয়েছেন নারী কাউন্সিলররা। একইসঙ্গে নামমাত্র কাউন্সিলরের অপবাদ থেকে পরিত্রাণ দিয়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে নাগরিকদের আসল প্রতিনিধি করতে অফিস বা কার্যালয় স্থাপনসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জোর দাবিও জানানো হয়েছে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, দেশের সব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় নির্বাচিত সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলরদের নগর উন্নয়নে সংস্থার নিয়মিত কার্যক্রমে আরো সক্রিয় ও কার্যকর জনপ্রতিনিধি হিসেবে তৈরি করতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj