মুজিববর্ষে মুজিবাদর্শ

সোমবার, ২০ জানুয়ারি ২০২০

বঙ্গবন্ধু যখন পাকিস্তান থেকে মুক্তি পান, তার অন্তত ২৩ দিন আগে বাংলাদেশের বুকে উড়েছে লাল-সবুজ পতাকা। রক্তের মাঝে ফুটে ওঠা একটা দেশ, অথচ যার ডাকে বাঙালি জাতি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল যুদ্ধে, সেই মানুষটা জাতির মুক্তির বার্তাটি পেলেন ডিসেম্বরের পরে। মুক্তির পর তাকে সরাসরি আসতে হয় লন্ডনে। বন্দি থেকে মুক্ত হয়ে লন্ডনে এসে একজন মানুষের মর্যাদা হয়ে যায় সরাসরি একটা রাষ্ট্রের প্রধানের। রাষ্ট্রপ্রধানের মতোই তিনি আতিথ্য লাভ করেন ব্রিটেনের সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের। রাষ্ট্রপ্রধানের গুরুত্ব নিয়ে তিনি মুখোমুখি হন তখন বিশ্ব মিডিয়ার ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি।

দীর্ঘ নয় মাস কারাজীবনে বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্কহীন। তিনি ছিলেন প্রাণদণ্ডের জন্য প্রস্তুত। ফাঁসির আসামিদের সঙ্গে তাকে কনডেম সেলে রাখা হয়েছিল। শাসকরা তাকে কোনো পত্রিকা দিত না, এমনকি রেডিও পর্যন্ত ছিল তার ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। কিন্তু বন্দি অবস্থা থেকে বেরিয়ে বাংলা-বাঙালি আর বাংলাদেশ নিয়ে তার যে অভিব্যক্তি প্রকাশ পেয়েছে, তাতে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সংগ্রাম-সাধনার প্রজ্ঞাই দেখেছে সে সময়ের বিশ্ব। সদ্য স্বাধীন একটা দেশ নিয়ে তার প্রত্যাশা আর নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ের কথা শুনেছে বিশ্ব তখন এক সংগ্রামী মানুষের মুখ থেকে। একজন মানুষ কীভাবে ভালোবেসেছিলেন তার দেশকে, কী এক অসম্ভব নির্ভরতায় তিনি জনগণকে ‘ভায়েরা আমার’ হিসেবে আপন করে নিয়েছিলেন, তা সেদিনও পরিলক্ষিত হয় তার সংবাদ সম্মেলনে। দেশের রাজনীতির আলো-বাতাস থেকে দূরে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে যিনি দিন-রাত পাড়ি দিয়েছেন উৎকণ্ঠায়, অথচ নিজের প্রাণের চেয়েও তিনি ভালোবেসেছিলেন বাংলাদেশকে। তাইতো তিনি বলতে পেরেছিলেন, ‘আমি বেঁচে থাকলেও কিংবা মরে গেলেও আমার বাংলাদেশের জনগণ মুক্ত হবেই। কেউ তা রুখতে পারবে না।’

মুক্ত হয়েছিলও। সেই মুক্ত দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদা নিয়ে তিনি স্বাধীন বাংলার হয়ে প্রথম বিশ্বমিডিয়ার মুখোমুখি হয়েছিলেন লন্ডনে। শুধু একজন রাষ্ট্রপ্রধানই নন, জনগণের একজন বিপ্লবী নেতা হিসেবে তিনি ওইদিন কিছু কথা উচ্চারণ করেছিলেন, সেই কথাগুলো দিয়ে জনগণের নেতা হিসেবে তিনি তার জবাবদিহিতারই এক উজ্জ্বল স্বাক্ষর রেখেছেন। অথচ বঙ্গবন্ধু সারা বিশ্বে এমন এক উচ্চতায় গিয়ে পৌঁছেছিলেন যে, তখন বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি কথা তিনি তার নিজের মতো করে বলে দিলেই পারতেন। কিন্তু নয় মাসের বন্দিত্বে, সারা পূর্ব বাংলার রক্তাক্ত অধ্যায়সহ সারা বিশ্বের সঙ্গে তার বিছিন্নতায় রাজনৈতিক বিচক্ষণতায় কোনোই ফাঁক-ফোকর লক্ষ করা যায়নি। তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে বা তৈরি করতে ইচ্ছা প্রকাশ করে যদি কেউ বা কোনো রাষ্ট্র, তাহলে সে সম্পর্ক কি রাখতে চাইবেন বঙ্গবন্ধু। উত্তরটা চটজলদিই হ্যাঁবাচক তিনি বলে দিয়েছিলেন। কিন্তু যখনই ইসলামাবাদের প্রসঙ্গ টেনেছিলেন সাংবাদিক, তখন সেই ত্বরিত উত্তর ছিল, এটা আমার দেশের জনগণের সঙ্গে আলাপ করেই বলতে পারব।

বঙ্গবন্ধুর মুক্তিকালীন পাকিস্তানের নতুন প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টু বাংলাদেশ আর পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কটা আবারো বিবেচনা করতে আবেদন জানিয়েছিলেন তাকে। কিন্তু সেই একই উত্তর, ‘দেশের জনগণের সঙ্গে আলাপ ছাড়া কিছুই বলতে পারব না।’ এবং পরে তিনি জনতার পালস বুঝেই রেসকোর্সের ময়দানে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের বিবেচনা নাকচ করে দেন। কিন্তু এরপরও বঙ্গবন্ধু ছিলেন জনতার কণ্ঠস্বর। তিনি পাকিস্তানি শাসকদের ঘৃণা করেছেন, এদের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক রাখার পক্ষে কোনো যুক্তিই খোঁজে পাননি বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে, কিন্তু একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে একজন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের নেতা হিসেবে তিনি পাকিস্তানের জনগণের প্রতি কোনো বিদ্বেষ ছুড়ে মারেননি।

যুক্তরাজ্যের সেই সংবাদ সম্মেলনেই বলেছেন, ‘পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের ওপর আমার কোনো বিদ্বেষ নেই। আমি তাদের ভালোবাসি, শ্রদ্ধাও করি। তাদের প্রতি আমার সহানুভূতি আছে। আমার দায়িত্বে যেসব কর্মকর্তা ছিলেন, তারা আমার সঙ্গে সৌহার্দপূর্ণ আচরণ করেছেন।’

একটা দেশের সব মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিফলন হয়ে ওঠার কথা থাকলেও রাজনৈতিক কিংবা শাসন-শোষণের উচ্চাভিলাষের কারণেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রনায়করা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ৭ কোটি মানুষের বিপরীতে দাঁড়িয়েছিল, কিন্তু সত্যিকার অর্থে তখন পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের গোটা জনগণ বাংলাদেশের চলমান নৃশংসতার পক্ষে ছিল না। আর সে কারণেই হয়তো বঙ্গবন্ধুও পাকিস্তানের জনগণের বিপরীতে তার অবস্থান দাঁড় করাননি। এমনকি ১০ জানুয়ারি রেসকোর্সের ভাষণে তিনি সেই একই কথা উচ্চারণ করেছিলেন- যারা বাংলায় কথা বলে না, তাদের তিনি ‘বাংলার মানুষ’ হওয়ার জন্য আহ্বান করেছেন এবং মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই দেশবিরোধীদেরও দেখার আহ্বান করেন। যারা বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছে তাদের প্রতিও সহনশীল হতে আহ্বান করেন সবাইকে। বললেন ‘ভাইয়েরা, তাদের গায়ে হাত দিয়ো না; তারাও আমাদের ভাই।’ একজন নিরেট শত্রুকেও তিনি জনগণের হাতে তুলে দেননি। তিনি এদের পরিশুদ্ধ হতে বলেছেন। যারা ইয়াহিয়া প্রশাসনকে সহযোগিতা করেছে, বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছে, তাদের বিচারের ভার সরকারের ওপরই ছেড়ে দিতে তিনি আহ্বান করেছেন লাখো জনতার প্রতি, দেশবাসীর প্রতি এবং তার এ রকম সঠিক সিদ্ধান্ত এবং দুরদর্শিতাই যুদ্ধ-পরবর্তী ঘৃণা দ্বারা সৃষ্ট যে কোনো সহিংসতা থেকে মুক্ত থেকেছে বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধু তার লক্ষ্যে থাকতেন অবিচল। যে কথাটি বলতে হবে, সে কথাটাই বলতে পারতেন দ্বিধাহীন। তিনিই হয়তো সেই নেতা, যিনি ব্রিটেনে বসে একটা ভঙ্গুর দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে ব্রিটেনের সাংবাদিকদের সরাসরি বলতে পেরেছিলেন আপনারাও দায় এড়াতে পারেন না। যে ব্রিটেন সহায়তা করেছে যুদ্ধের দিনগুলোতে, সেই ব্রিটেনকে তিনি স্মরণ করিয়ে দিতে দ্বিধা করেননি তাদের শোষণ আর বাণিজ্যিক বাজারেও সমৃদ্ধ ব্রিটেনের অর্থনীতি।

যে ভারত কোটি মানুষকে জায়গা দিয়েছে, সৈন্য-অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেছে, সারা পৃথিবীর সমর্থন আদায় করতে যে রাষ্ট্রের প্রধান ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধু আর বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি, তার দেশ ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেই লন্ডন থেকে বাংলাদেশে আসতে দিল্লিতে যাত্রাবিরতি করেন। সেখানে তিনি ‘আমাদের জনগণের সবচেয়ে বড় বন্ধু ভারতের জনগণ’ হিসেবে সম্বোধন করেন, কিন্তু দেশেরই প্রয়োজনে ভারতেই ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আলাপে বাংলাদেশ থেকে সেনা প্রত্যাহারের অনুরোধ করেন, যা তিনি রেসকোর্সের জনসভায়ও উল্লেখ করেন। একটা দেশে বিদেশি সৈন্যের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর না-ও হতে পারে, এটা তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার শুরুতেই বুঝতে পেরেছিলেন এবং সে জন্যই এ অনুরোধ করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু দৃঢ়তার সঙ্গেই উচ্চারণ করেন- ‘আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান’। একজন বাঙালি হিসেবে তিনি নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন বাঙালি জাতির জন্য। একজন মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের একজন মানবতাবাদী। সবচেয়ে বড় কথাটি তিনি উচ্চারণ করতে পেরেছিলেন সে সময়ও, তিনি মুসলমান। কিন্তু জোর গলায় ‘মুসলমান’ বলার পরও তিনি ছিলেন উদার। ধর্মনিরপেক্ষভাবে দেশ পরিচালনাকে তিনি সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। মুসলমান কিংবা ইসলামকে কোনো কোনো প্রগতিশীল আজকাল ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার চেষ্টা চালান। কিন্তু একজন মুসলমান হয়েও রাষ্ট্রকে কীভাবে ধর্মীয় প্রভাবমুক্ত রাখা যায় তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ১৯৭১-এর চেতনার বাংলাদেশ। রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে গণতন্ত্রকে যেমন জনগণের অধিকার হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন তিনি, ঠিক তেমনি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে সমাজতন্ত্রকেও মূলমন্ত্রের একটি হিসেবে সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। আর এগুলোর সমন্বয়েই তিনি রেসকোর্স ময়দানে ঘোষণা করেছিলেন- ‘এ দেশের কৃষক-শ্রমিক, হিন্দু-মুসলমান সুখে থাকবে, শান্তিতে থাকবে।’

বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির জন্য, বাংলাদেশের জন্য একটা অধ্যায়। একটা জাতির উত্থানে, একটা দেশ বাংলাদেশের সৃষ্টিতে জনগণের নেতা হিসেবে তিনিই ছিলেন প্রধান। নেতা হিসেবে তিনি ছিলেন জনগণের। তিনি ছিলেন না কোনো মনীষী, ছিলেন না কোনো দরবেশ। তবে তিনি সাধক ছিলেন, বাঙালি জাতির উন্নয়নে তিনি সাধনা করেছেন শেষ সময় পর্যন্ত। একজন নেতা হিসেবে, জাতির পিতা হিসেবে তিনি একজন অসাধারণ মহান মানুষ ছিলেন। এই মানুষের জীবনাদর্শই একটা জাতিকে পথ দেখাতে পারে প্রতিদিন নতুন করে। তাকে নিয়ে, তার সংগ্রামমুখর বৈচিত্র্যময় জীবন যে কোনো প্রজন্মের জন্যই আলোকিত অধ্যায়। স্তাবকতা নয়, মুজিববর্ষে মুজিবাদর্শই চর্চিত হোক সারা বিশ্বময়, দেশ হোক আপামর জনগণের, যেমন চেয়েছেন বঙ্গবন্ধু তার সারা জীবনের সংগ্রাম-সাধনায়।

ফারুক যোশী : কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
অলোক আচার্য

সেলফিসাইডের ঝুঁকি!

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী

মাতৃভাষার চর্চা নিয়ে দ্বিচারিতা

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

অপ্রতিরোধ্য পিতৃতান্ত্রিকতা

মুহম্মদ জাফর ইকবাল

মাতৃভাষার জন্য ভালোবাসা

মযহারুল ইসলাম বাবলা

বাংলা ভাষার সংকট, ঘরে-বাইরে

Bhorerkagoj