চীন-মার্কিন চুক্তি : বিশ^বাণিজ্যে ফের শান্তির সুবাতাস

শনিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২০

কাগজ ডেস্ক : চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য চুক্তি সাধারণ দৃষ্টিকোণ থেকে দুই দেশের মধ্যে ১৮ মাসের বাণিজ্য দ্ব›েদ্বর অবসান হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন এখনো বহু পথ পারি দিতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। ব্যবসায়িক নেতাদের মত এই চুক্তির পরও অজস্র বিষয় অমীমাংসিত থেকে গেছে। এই চুক্তিরে কোথাও বলা হয়নি, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্র আরোপিত শুল্ক সম্পূর্ণভাবে বিলোপ করবে। এই অতিরিক্ত শুল্ক বিশ^ বাণিজ্যের জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। তবে স্বাক্ষরকারী দুই দেশই বলছে বাণিজ্য যুদ্ধের পরিপূর্ণ সমাপ্তির জন্য আরো আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। অবশ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলছেন, এই চুক্তি তার দেশ ও তার নীতির বিজয়ের বহিঃপ্রকাশ।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রেরও দাম্ভিকতা দেখানোর কিছু নেই। কারণ এটি চূড়ান্ত কিছু নয়। তবে দুই দেশ যদি প্রথম ধাপের এই চুক্তির প্রতি যথেষ্ট সম্মান দেখায় তবে এই চুক্তি ভালো ফল নিয়ে আসবে। চীন প্রতিশ্রতি দিয়েছে তারা মার্কিন পণ্যের আমদানি বৃদ্ধি করবে। ২০১৭ সালে তারা ২০ হাজার কোটি ডলারের মার্কিন পণ্য আমদানি করেছিল। এর বদলে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে আরোপিত কিছু শুল্ক প্রত্যাহারের বিষয়ে রাজি হয়েছে।এ বিষয়ে চীন-যুক্তরাষ্ট্র চেম্বারের চেয়ার জেরেমি ওটারমান বলেন, সামনের দিনগুলোতে অনেক বেশি কাজ করতে হবে। আজকের দিন অবশ্যই উপভোগ্য কিন্তু খুব দ্রুতই দ্বিতীয় ধাপের চুক্তি টেবিলে তুলতে হবে। ২০১৮ সাল থেকে বাণিজ্য যুদ্ধে লিপ্ত আছে এই দুই দেশ। তারা একে অপরের ৪৫ হাজার কোটি ডলার পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্কারোপ করেছে। তীব্র বাক্যবাণে পরস্পরকে জর্জরিত করা, চরম উত্তেজনা কিংবা পিছু হটে ‘যুদ্ধবিরতি’র নরম সুর- এসব কিছুই দেখা গেছে দুই বছরের আমেরিকা-চীন বাণিজ্য বিরোধে। অবশেষে দুই দেশের নেতারা এই যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চীনা নেতারা এই চুক্তিকে বলছেন ‘উইন-উইন’। আর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলছেন, চুক্তি মার্কিন অর্থনীতিতে পরিবর্তন ঘটাবে। কিন্তু এই দুবছরের বাণিজ্য আলোচনা, যা ছিল দেশ দুটির জন্য রোলার কোস্টারের মতো, যা শেষ পর্যন্ত একটি জায়গায় এসে থামতে পেরেছে। ফল যা-ই হোক, এই বাণিজ্য যুদ্ধ চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক এমনকি বিশ্ব অর্থনীতির গতি-প্রকৃতির নতুন রূপ দিয়েছে নিঃসন্দেহে।

এই সময়ে যা যা পরিবর্তন এসেছে : বাণিজ্য যুদ্ধ শুরুর পর দুদেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি অনেক কমেছে, যদিও এখনো তা অনেক বেশি আছে। গত বছর নভেম্বর পর্যন্ত এক বছরে আগের বছরের চেয়ে ঘাটতি কমেছে প্রায় ৬ হাজার কোটি ডলার এবং এখন এ ঘাটতির পরিমাণ ৩৬ হাজার কোটি ডলার। তবে এ ঘাটতি কমানোর মূল্য স্বরূপ দুদেশের মধ্যে বাণিজ্য কমেছে প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলারের।

চীনে মার্কিন কৃষিপণ্য রপ্তানি কমেছে : ট্রাম্পের শুল্ক ব্যবস্থায় প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে চীন আর তার সবচাইতে বড় আঘাত এসে পড়েছে মার্কিন কৃষকদের ওপরেই। কারণ চীনে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিজাত রপ্তানি আড়াই হাজার কোটি ডলার থেকে কমে এখন সাতশ কোটি ডলারের নিচে। এটাই সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে কম।

হ্রাস পেয়েছে চীনা বিনিয়োগ : যুক্তরাষ্ট্রে চীনা কোম্পানির বিনিয়োগ ২০১৬ সালে ছিল ৫ হাজার ৪ কোটি ডলার আর ২০১৮ সালে এটি হয়েছে নয়শ সাত কোটি ডলার। আর ২০১৯ সালের প্রথম অর্ধেকে এটা ছিলো মাত্র আড়াইশ কোটি ডলার। চীনা কোম্পানিগুলো বাণিজ্য নিয়ে উত্তেজনাকে নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে বিনিয়োগে অনিচ্ছা প্রকাশ করে। এ ছাড়া বিনিয়োগকে কঠোর নিরীক্ষার আওতায় আনার যুক্তরাষ্ট্রর নীতি ও চীনের মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ শক্ত করাও ছিল এর উল্লেখযোগ্য কারণ।

তমসাচ্ছন্ন বাণিজ্য পরিবেশ : ইউএস চায়না বিজনেস কাউন্সিলের হিসেবে চীনে যেসব আমেরিকান উদ্যোক্তা কাজ করছে তাদের মধ্যে শতকরা ৮১ শতাংশ মনে করেন বাণিজ্য যুদ্ধ তাদের ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। অথচ ২০১৭ সালে মাত্র ৪৫% আমেরিকান কোম্পানির এ ধরণের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ ছিল।

বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় ধাক্কা : যুক্তরাষ্ট্রের আশংকা তাদের প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার চেয়ে তিন শতাংশ কম হবে এবং এর একটি বড় কারণ বাণিজ্য যুদ্ধ। বিশ্লেষকরা বলছেন, এর পুরো প্রভাব বুঝতে কয়েক বছর সময় লেগে যাবে। চীনের প্রবৃদ্ধিও নি¤œমুখী। ২০২০ সালে দেশটির প্রবৃদ্ধি আগের বছরের তুলনায় শতকরা ৬ ভাগ কমতে পারে বলে বলছে বিশ্বব্যাংক। তিন দশকের মধ্যে এটাই হবে সবচেয়ে কম। আবার দুটি বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তির মধ্যকার এ লড়াইয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিশ্ব অর্থনীতিও।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বিচ্ছিন্নতার লক্ষণ : একটি বাণিজ্য চুক্তি সত্ত্বেও বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার প্রযুক্তিগত বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি বাড়ছে। চীনা টেলিকম কোম্পানি হুয়াওয়ে ও আরো কিছু কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো তাদের সঙ্গে ব্যবসা করতে পারছে না। আবার বেইজিংও একই ধরনের কালো তালিকা করেছে। মনে করা হচ্ছে, আমেরিকায় থাকা চীনা কোম্পানিগুলোকে পর্যবেক্ষণের আওতাতেই রাখবে যুক্তরাষ্ট্র।

নতুন চীন-মার্কিন চুক্তিতে যা থাকছে : চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়িয়ে ২০০ বিলিয়ন ডলারের ওপরে নিয়ে যাবে, যা ২০১৭ সালের সমপরিমাণ হবে। কৃষিপণ্য আমদানি বাড়াবে ৩২ বিলিয়ন ডলার, শিল্পপণ্য আমদানি করবে ৭৮ বিলিয়ন ডলার, বিদ্যুৎ আমদানি ৫২ বিলিয়ন ডলার এবং সেবা খাতে চীন আমদানি করবে ৩৮ বিলিয়ন ডলার। নকল ঠেকাতে যথেষ্ট ব্যবস্থা নিতে একমত হয়েছে চীন। আর ট্রেড সিক্রেট চুরির ব্যাপারে কোম্পানিগুলোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়া সহজতর করবে। ৩৬০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত চীনা পণ্য আমদানিতে শতকরা ২৫ ভাগ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করবে যুক্তরাষ্ট্র। অপরপক্ষে চীন, ১০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত মার্কিন পণ্য আমদানিতে শুল্ক কাঠামো পুনর্বিন্যাস করবে।

দূরের জানালা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj