সেলিম আল দীনের নাট্যতত্ত্ব

শুক্রবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২০

লুৎফর রহমান

নাট্যকার সেলিম আল দীন রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ ও বাঙালি সংস্কৃতির সৃষ্টি। বর্তমান বাংলাদেশ পূর্ববঙ্গ নামে মুসলমানদের জন্য প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের অন্যতম অংশ রূপে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনমুক্ত হলো ১৯৪৭ সালে এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের অধীনে নব্য উপনিবেশে পরিণত হওয়ার অল্পকাল মধ্যে ১৯৪৯ সালে জন্মেছিলেন সেলিম আল দীন। ঐতিহাসিক বিবেচনায় তখনো বাঙালির পরিচয় দুটি- প্রথমত, বাঙালি; দ্বিতীয়ত, বাঙালি মুসলমান। দুটি পরিচয়েই বাঙালি পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর অধিবাসীদের (পাঞ্জাবি, বালুচ, পাঠান, বিহারি) থেকে স্বতন্ত্র। ভিন্ন সংস্কৃতির ও নৃবৈশিষ্ট্যের মানুষের সঙ্গে গোঁজামিলের এক রাষ্ট্রের অধিবাসী অন্য বাঙালির মতো সেলিম আল দীনের চেতনাও গড়ে ওঠে সামন্ত-সা¤্রাজ্যবাদী পাকিস্তানি আধিপত্যবাদী রাষ্ট্রে। প্রতিক্রিয়াশীল ও প্রগতিশীল এই দুটি ধারায় বিভক্ত ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শিল্প-সংস্কৃতি। উপর্যুক্ত ধারাদ্বয়ের অন্যতম প্রগতিশীল ধারার শিল্পীসমাজের পঙ্ক্তির মধ্যে ছিল সেলিমের অবস্থান। প্রথম জীবনে তিনি অগ্রজ শিল্পীদের পদাঙ্ক অনুসারী ছিলেন।

উনিশ শতক থেকে ধ্রæপদী, নব্য ধ্রæপদী ও আধুনিক ঔপনিবেশিক শিল্পতত্ত্বের (বাস্তবতাবাদ, স্বভাববাদ, প্রকাশবাদ ও অধিবাস্তববাদ ইত্যাদি) প্রচণ্ড দাপটের কারণে সমৃদ্ধ ধ্রæপদী ভারতীয় শিল্পনন্দনতত্ত্ব ছিল সম্পূর্ণ নির্বাসিত। মুঘল ও ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনকালেই ধ্রæপদী সংস্কৃত ভাষাও মৃতভাষার ভাণ্ডারে নিক্ষেপিত হয়। সেলিম আল দীন এবং তার সমসময়ের অন্যান্য তরুণ শিল্পীগণের অগ্রজ কবি, ঔপন্যাসিক, নাট্যকারগণ গত শতকের ষাটের প্রারম্ভকাল থেকেই অস্তিত্ববাদের ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে আসেন। সামাজিক অস্তিত্ববাদের সাথে কার্ল মার্ক্সের দ্ব›দ্বতত্ত্বের একটি সম্পর্ক স্থাপন সম্ভবপর বলেই প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মীগণ এই মতবাদ চর্চায় দোষের কিছু দেখেননি। দেখেননি সেলিম ও তার সমবয়স্ক অন্যরাও। সেলিম আল দীনের প্রথম পর্বের নাটকে তাই অস্তিত্ববাদী দর্শনের অসংকোচ প্রয়োগ লক্ষণীয়। অতঃপর বাঙালি সংস্কৃতির মূলানুসন্ধানী অভিপ্রায় ধীরে ধীরে তাকে ঐতিহ্যের ভিতে প্রতিষ্ঠা দেয়। আসে তার পঠন-পাঠন, রচনারীতিতে পরিবর্তন। নাটক রচনার পরীক্ষা-নিরীক্ষার ধারায়ই গবেষকের চারিত্র্য অর্জন করেন তিনি। গবেষণালব্ধ অভিজ্ঞতা, যুক্তি, প্রমাণাদি তাকে একজন তাত্তি¡কের আসনে অধিষ্ঠিত করে। প্রত্যেকটি নাটক তার পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফসল। বলা যায় নাটকগুলোর আঙ্গিকগত বিবর্তন ও তার নাট্যতত্ত্বের পরিণতি সমান্তরাল ধারায় বহমান।

আখ্যান, উপাখ্যানধর্মী ‘কীত্তনখোলা, ‘কেরামতমঙ্গল’ ও ‘হাতহদাই’ নাটকের পর সেলিম আল দীন নতুন নাটক চাকার জন্য নির্বাচন করলেন নতুন আঙ্গিক ‘কথানাট্য’। পাশ্চাত্য অ্যাবসার্ড নাট্যধারার সকীর্ণ পথে ব্যক্তির সংকট ছাপিয়ে সমষ্টির সমস্যার কেন্দ্রে পৌঁছাতে আখ্যান, উপাখ্যানের প্রশস্ত ও বিস্তৃত পরিসরকে সেলিম আল দীন ‘কীত্তনখোলা’, ‘কেরামতমঙ্গল’, ‘হাতহদাই’ নাটকত্রয়ী রচনায় তার বক্তব্যের আধার রূপে নির্বাচন করেন। ধর্ম-বর্ণ, পেশা, গোষ্ঠী-গোত্র, শ্রেণি-বর্গ যেমন এই আধারে একাকার হয়ে যায়, তেমনি কথা, কবিতা, কথাসাহিত্য, নাটক, নৃত্য, সঙ্গীত, চিত্রকলা ইত্যাদি সর্বশিল্পাঙ্গিক একক ও অবিচ্ছিন্ন শিল্পশরীরে জীবদেহের ন্যায় সমবস্থা বা সমস্বামিত্ব লাভ করে। কিংবা বলা যায়, সব শিল্প-আঙ্গিকের সমসূত্রে গাঁথা হলো এই তিনটি নাটকের বিষয় ও বিষয়ীদের জীবনলীলা। শিল্পভুবনে তার এই অবাধ বিচরণ ও একীকরণ নীতির উৎস ঐতিহ্য। স্বজাতির শিল্পভূমি কর্ষণের ঐকান্তিক অভিপ্রায়। সে প্রয়াসকেও ইতিহাসের আলোয় দেখা সম্ভব।

রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা নাটকের ইতিহাসে সর্বাধিক নিরীক্ষাধর্মী নাট্যকার সেলিম আল দীন। বাংলা নাটকের ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এ কথা বলা যায়, ট্র্যাজেডি, কমেডি, প্রহসন ইত্যাদি রসগত বিবেচনা ব্যতিরেকে আঙ্গিকগত পরীক্ষা-নিরীক্ষায় একমাত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন সচেতন ¯্রষ্টা। এ কথা সর্বজনবিদিত যে, ১৯ বছর বয়সে (১২৮৭) রচিত ‘বাল্মীকি-প্রতিভা’ সম্বন্ধে কথিত বক্তব্যে এই নিরীক্ষার স্বরূপ অনুধাবন করা যায়।

ভারত উপমহাদেশে উত্তর-ঔপনিবেশিক নাটক ও থিয়েটার চর্চার ইতিহাস খুব দীর্ঘকালের নয়। সেক্ষেত্রে নাট্য-আঙ্গিক নিরীক্ষায় সেলিম আল দীন অবশ্যই অগ্রগামী। ঔপনিবেশিক নাট্য-আঙ্গিক অগ্রাহ্য করে ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যরীতির বিভিন্ন উপাদান ও অনুষঙ্গ সমন্বয়ে তিনি বাংলা নাটকের উত্তর-আধুনিক আঙ্গিকটি প্রতিষ্ঠা করেন। আমৃত্যু এটিই ছিল তার সাধনা। প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণায় তিনি প্রমাণ করেন ঔপনিবেশিক শিল্পরীতির ও সংস্কৃতির আগ্রাসনের পূর্বে বাংলাদেশে হাজার বছরের প্রবহমান সংস্কৃতির পরিবেশনামূলক অংশ বিচিত্র নাট্যরীতির মধ্যে বিধৃত। এগুলোকে গীতনাট, নাটগীত, লীলানাট, অষ্টক, পালা, গম্ভীরা, আলকাপ, পাঁচালি, কথকতা ইত্যাদি পারিভাষিক শব্দ দ্বারা চিহ্নিত করেছিলেন সেকালের শিল্পীতাত্তি¡কগণ। আমরা রবীন্দ্র-নাটকের তালিকায় ‘গীতনাট’ (প্রাচীন ঐতিহ্য লক্ষণ সেনের সভাকবি জয়দেব মিশ্র রচিত ‘গীতগোবিন্দ’); ‘নাটগীত’ (মধ্যযুগের পাঁচালি আঙ্গিকে পরিবেশিত সব নাট্য, বিজয়গুপ্ত রচিত ‘মনসামঙ্গল’, মুুকুন্দরাম চক্রবর্তী রচিত ‘চণ্ডীমঙ্গল’ উল্লেখ্য); এবং ‘কথকতা’ (শঙ্খমালা, লালমলি-সবুজমণির পালা) রীতির মধ্যকার পার্থক্য সম্বন্ধে ধারণা পাই। রবীন্দ্রনাথ প্রাচীন বাংলার নাট্য ঐতিহ্যের অনুগামী ছিলেন উপর্যুক্ত তথ্য তাই প্রমাণ করে। সেলিম আল দীন তার ‘মধ্যযুগের বাংলা নাট্য’ নামক গবেষণাগ্রন্থে ‘কথকতা’র বিস্তৃত পরিচয় তুলে ধরেন এভাবে-

“মানব সমাজে কাল পরম্পরায় লোকমুখে নানা ধরনের উপকথা, গল্পকথা ও আখ্যান প্রচলিত রয়েছে। প্রাচীনকাল থেকে বাংলাদেশে এই গল্পকথা বা আখ্যান গীত ও বর্ণনার মাধ্যমে সচরাচর অন্তরঙ্গ আসরে পরিবেশিত হতো। আধুনিক কালের নাট্যে এই ধরনের পরিবেশনাকে ‘কথানাট্য’ অভিহিত করা হয়। নানা বিচিত্র ধারার বিপুল সমাবেশে ঘটেছে এই ‘কথানাট্য’ বা গল্পকথা পরিবেশনা। কাল পরম্পরায় উপকথা বা লোককথা, শাস্ত্র বা কিস্সা, লৌকিক-পৌরাণিক ও রোমান্টিক আখ্যান প্রভৃতি নানাধারা এর অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ ধারায় পরিবেশিত ধর্মীয় বা অন্যবিধ আখ্যানকে কথকতা, কিস্সাকথন, শাস্ত্রগান, হাস্তরগান অথবা শুধু হাস্তর বলা হয়। ‘শাস্ত্র’ বা ‘হাস্তর’ হলেও এতে ‘শঙ্খমালা’, ‘শীত-বসন্ত’, ‘লালমণি-সবুজমণির পালা’র পাশাপাশি ‘মনসামঙ্গল’, ‘ফারসি কাব্য’, ‘লাইলীমজনু’, ‘সয়ফুলমূলক’, ‘গুলে-বকৌলি’র প্রেমকথাও গীত হয় (মধ্যযুগের বাংলা নাট্য, সেলিম আল দীন, ১৯৯৬, ৩৭)।”

সেলিম আল দীন প্রদত্ত দ্বৈতাদ্বৈতবাদ শীর্ষক শিল্পতত্ত্ব সম্যক উপলব্ধি করার জন্য ‘অচিন্ত্যদ্বৈতাদ্বৈতবাদ’-এর দার্শনিক মর্মার্থ অনুধাবন করা জরুরি। শঙ্করাচার্য প্রবর্তিত ‘অদ্বৈতবাদ’, “ভাস্কর, রামানুজ, মধ্বাচার্য, নিম্বার্ক, বল্লভাচার্য প্রমুখের দ্বারা চর্চিত হয়ে যথাক্রমে ভেদাভেদবাদ, বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ, দ্বৈতবাদ, দ্বৈতাদ্বৈতবাদ, শুদ্ধাদ্বৈতবাদ ইত্যাদি নামে ভক্তি-পন্থিদের ধর্মমত রূপে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে” (মধ্যযুগের বাংলা গীতিকবিতা, ১৩৭৫, ভূমিকা, খ.)। দ্বাদশ শতকের দার্শনিক রামানুজ কর্তৃক সংস্কৃত হয়ে ‘বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ’ নামে বাংলায় পরিচিতি লাভ করে। দাক্ষিণাত্যে ষোড়শ শতকে রায় রামানন্দ বৈষ্ণবধর্মকে তাত্তি¡ক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে উদ্যোগী হন। শ্রীচৈতন্যদেব ও রায় রামানন্দের দীর্ঘ তাত্তি¡ক আলোচনার পরবর্তী সময়ে চৈতন্যদেব কর্তৃক বৈষ্ণবধর্ম ‘অচিন্ত্যদ্বৈতাদ্বৈতবাদ’ নামে দার্শনিক রূপ পরিগ্রহ করে। গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মবেত্তাগণের কাছে ‘অচিন্ত্য’ শব্দটির অর্থ নি¤œরূপ- “ […] যাহা কিছু দুর্ঘট তাহাকে ঘটাইয়া তুলিবার সামর্থই ত শক্তির ‘অচিন্ত্যিত্ব’; ‘দুর্ঘট-ঘটকত্বং চাচিন্ত্যত্বম্’” (শ্রীরাধার ক্রমবিকাশ দর্শনে ও সাহিত্যে, শশীভূষণ দাশগুপ্ত, ১৯৯৭, ২০৪)। বৈষ্ণবতাত্তি¡কগণ এর ব্যাখ্যায় বলেন-

“[..] একদিক হইতে বিচার করিলে শক্তিমাত্রই ‘অচিন্ত্য’, কারণ শক্তির স্বরূপ কখনই মানুষের জ্ঞানগোচর নহে; সংসারে ‘মণিমন্ত্রাদি’র যে শক্তি- তাহাও ত ‘অচিন্ত্যজ্ঞানগোচর’। ‘অচিন্ত্য’ শব্দের তাৎপর্য হইল, যাহার সম্বন্ধে কোন জ্ঞানই তর্কসহ নহে, শুধু কার্যফলের প্রমাণেই যাহা গোচরীভূত হয়; এইজন্যই বলা হইয়াছে- ‘অচিন্ত্যা ভিন্নাভিন্নত্বাদিবিকল্লৈশ্চিন্তয়িতুমশক্যাঃ সস্তি।’ ভিন্ন অভিন্ন ইত্যাদি বিকল্পের দ্বারা যাহার চিন্তা করা যায় না, কেবল অর্থাপত্তির দ্বারাই যাহা জ্ঞানগোচর হয়, তাহাই হইল ‘অচিন্ত্য’।” (প্রাগুক্ত, ২০৪-৫)

উপরি উদ্ধৃত সংজ্ঞাদৃষ্টে অনুধাবন করতে মোটেই কষ্ট হয় না যে, অত্যন্ত যৌক্তিক কারণেই সেলিম আল দীন তার তত্ত্ব থেকে ‘অচিন্ত্য’ শব্দটি পরিহার করেছেন। মানুষের কোনো কর্মই তর্কাতীত নয়, দুর্ঘট যা তা ঘটাবার ক্ষমতাও লৌকিক জীবনে কোনো মানুষেরই থাকে না। ধর্মতত্ত্বে যা স্বাভাবিক, যৌক্তিক এবং তর্কাতীত বলেই গ্রহণযোগ্য তা সঙ্গত কারণেই শিল্পসাহিত্যের পরিধি বহির্ভূত। অতএব, গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্ম দর্শনের ‘অচিন্ত্যদ্বৈতাদ্বৈতবাদ’ পরিভাষা থেকে ‘অচিন্ত্য’ শব্দটি পরিহারপূর্বক ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদ’ পরিভাষা সৃষ্টি যুক্তিসঙ্গত। পরবর্তী আলোচনায় ‘অচিন্ত্যদ্বৈতাদ্বৈতবাদ’ পরিভাষা দ্বারা শ্রীচৈতন্য এবং বৃন্দাবনের ষড়গোস্বামীগণ প্রকৃতপক্ষে কি বুঝাতে চেয়েছেন তা নিরীক্ষণ করা যেতে পারে। শ্রীকৃষ্ণকে পরমব্রহ্ম জ্ঞান করে জীবাত্মার সঙ্গে তার বিচিত্র লীলা গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের সার কথা।

“জীবাত্মা হচ্ছে পরমাত্মার খণ্ডাংশ। বিন্দু বিন্দু পানি নিয়ে সমুদ্র। কিন্তু বিন্দুর একক শক্তি নিতান্ত তুচ্ছ। তাই তার অস্তিত্ব রক্ষার গরজেই সমুদ্রের জন্য তার ব্যাকুলতা। বিন্দু স্বরূপ জীবাত্মা তাই পরমাত্মার জন্য ব্যাকুল। এই ব্যাকুলতার জন্যই জীবাত্মা প্রেমিক তাই সে রাধা। পরমাত্মারও অবশ্য ব্যাকুলতা আছে, কেননা জীবাত্মাকে বাদ দিয়ে পরমাত্মার লীলাভোগ হয় না। কিন্তু কোনো বিশেষ জীবাত্মার জন্য তার ব্যাকুলতা নেই। এ জন্য একক জীবাত্মা সদা উদ্বিগ্ন, পাছে সে বাদ পড়ে। কৃষ্ণের ষোলোশ গোপিনী আছে, রাধার কৃষ্ণ ছাড়া কেউ নেই (প্রাগুক্ত, ঙ.)।”

সেলিম আল দীন তার শিল্পতত্ত্ব নির্মাণকালে ‘অচিন্ত্যদ্বৈতাদ্বৈতবাদে’র নির্যাসটুকু গ্রহণ করেন। দীর্ঘদিনের সাধনায় বিভিন্ন যৌক্তিক তর্ক-বিতর্কের ফলরূপে তিনি তার প্রদত্ত তত্ত্বকে গ্রহণযোগ্য একটা রূপদানে উদ্যোগী হন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, অন্যান্য শিল্পতত্ত্বের মতো উপর্যুক্ত তত্ত্বটাও সৃষ্ট শিল্পকর্মের পরিপ্রেক্ষিতে নির্ধারিত আদল পায়। অনেকের মনে এমন প্রত্যয় রয়েছে যে, কোনো আখ্যানের মাঝে মাঝে কিছু বর্ণনা থাকলে এবং দ্ব›দ্ব, সংঘাতে পরিপূর্ণ আখ্যানটি সংলাপ পরম্পরায় সমাপ্ত হলে তবেই বর্ণনাত্মক বাংলা নাটক সৃষ্টি হলো। অনেকে এমত ধারণায় বদ্ধমূল যে, কিছু উপন্যাসের গুণ, কিছু নাটকের ধর্ম, কতকটা নৃত্য, এক-দুটো সঙ্গীত কোনো আখ্যানে থাকলে সেই খিচুড়ি সৃষ্টিকর্মটাই ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী’ শিল্পতত্ত্বাশ্রয়ী নাটক হবে। এসব ধারণা সম্পর্কিত পর্যাপ্ত দৃষ্টান্ত নিশ্চয়ই আপনাদের অনেকেরই অভিজ্ঞতার খাতায় লিপিবদ্ধ আছে। অন্য একটি ধারণার প্রসঙ্গও এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, তাতে আখ্যানের সূচনায় কোনো একজন চরিত্রের উচ্চারণে খানিকটা বর্ণনার পর সংলাপ পরম্পরায় আখ্যান পরিসমাপ্তি-পথে অগ্রসর হয়ে শেষ হলো একটা ছোট্ট বর্ণনাংশ দিয়ে এবং ¯্রষ্টার স্থির বিশ্বাস নাটকটি ‘বর্ণনাত্মক’ ও ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী’ শিল্পরীতি আশ্রয়ী। সেলিম আল দীনের মৃত্যুর একযুগ অতিক্রান্ত হওয়ার মধ্যেই তার তত্ত্বটা পর্যাপ্ত গোঁজামিলের মধ্যদিয়ে চর্চিত হচ্ছে, এ সত্য আমাদের মনোকষ্টের কারণ হতে পারে। শুদ্ধভাবে চর্চা করতে অপারগ হলে তা পরিত্যাগ করাই সমীচীন- তাতে অন্তত তত্ত্বটা বাঁচে। একথা সত্য যে, বাঙালির মন সহজিয়া রাগে রঞ্জিত হয় বটে কিন্তু যুদ্ধ-বিদ্রোহ, তত্ত্বসাধনা এবং বিজ্ঞান, দর্শন নিশ্চয়ই সহজিয়া ভঙ্গিতে পাবার বস্তু নয়, পেতে চাইলেও তার জন্য গভীর নিষ্ঠা ও আত্মনিমগ্ন অনুসন্ধিৎসা আবশ্যক।

‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদ’ নামক শিল্পতত্ত্ব এমন একটা আখ্যান-ভ্রƒণ দাবি করে শিল্পীর চৈতন্য-গর্ভে নিষেক ঘটবার পর অভিন্ন সময়ে যার সব অঙ্গই উদ্গম হয়। একই সঙ্গে প্রতিটি অঙ্গের স্বতঃস্ফ‚র্ত সুসামঞ্জস্য বিকাশ প্রত্যাশী। মাতৃগর্ভস্থ শিশুর অঙ্গসমূহের অসমবিকাশ যেমন শিশুটিকে বিকলাঙ্গ করে, তেমনি উল্লিখিত আখ্যান-ভ্রƒণের অঙ্গসমূহের অসম ও কষ্টকর বিকাশও হয়ে থাকে সৃজ্যমান শিল্পকর্মের প্রতিবন্ধিত্বের কারণ। আখ্যান পরিকল্পনা ও বিন্যাস কালেই আঙ্গিকগুলোর সঙ্গতি বিধান জরুরি। দেশ-কাল, পরিবেশ-পরিস্থিতি, গুরুত্ব অনুযায়ী যখন যে অঙ্গ যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই তার ব্যবহার করণীয়। শিল্পীর মাত্রাজ্ঞান ও তার সচেতন প্রয়োগ অতীব জরুরি এক্ষেত্রে। শ্রমবিভাজনের নীতি-আশ্রয়ী বিভাজন রেখা দ্বারা চিহ্নিত উত্তর-আধুনিককালে প্রচল শিল্প আঙ্গিকসমূহের সবগুলোকে অভিন্ন আখ্যানভুক্ত করবার উল্লিখিত প্রক্রিয়াটি অবশ্যই শ্রমসাধ্য কিন্তু অসম্ভব নয়। আমাদের বক্তব্যের সপক্ষে সেলিম আল দীন কৃত এতদবিষয়ক সংজ্ঞাটি উপস্থাপন করা যেতে পারে-

“কোনো সৃষ্টিকর্মের মধ্যে আমরা যখন সমকালে আধুনিক শিল্প সংজ্ঞায় শ্রেণিকৃত গল্প, কবিতা, সঙ্গীত, রাগরাগিনী, চিত্রকলা, উপন্যাস এর সবগুলো বৈশিষ্ট্য আনুপাতিক অবস্থানের পরিবর্তে নৈসর্গিকতায় সাঙ্গীকৃত হতে দেখি তাকে তখন দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পরীতি নামে অভিহিত করা যায়। উপর্যুক্ত বাক্যটি দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্বের আঙ্গিক লক্ষণের সংজ্ঞা রূপে গৃহীত হতে পারে।” (সেলিম আল দীন রচনা সমগ্র ৬,২০১১, ৫৪৫)

উপরি উদ্ধৃত সংজ্ঞা নিরীক্ষকের দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, আঙ্গিকসমূহের স্বতঃস্ফ‚র্ত সাঙ্গীকরণ ঘটাতে হবে। নৈসর্গিক নিয়মে যদি কথার পরে সঙ্গীত না আসে তবে তা হবে আরোপিত ও কৃত্রিম। একইভাবে ‘নৃত্যে’র পর আখ্যানস্থ পরিবেশ-পরিস্থিতি ‘সংলাপ’ না অন্য কিছুর প্রত্যাশী তা রচয়িতাকে বিচক্ষণতার সঙ্গে নির্ধারণ করতে হবে। এ সত্যও বিস্মৃত হলে চলবে না যে, ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী’ শিল্পরীতির আশ্রয়ে রচিত শিল্পকর্ম ঘটনা প্রধান নয় আখ্যান প্রধান, আখ্যানের প্রাধান্যের কারণে অন্তর্গত স্বভাবেই শিল্পশরীর বর্ণনাত্মক রূপ পরিগ্রহ করে, চিত্রময় মনোজ্ঞ বর্ণনাই বর্ণনাধর্মিতার একমাত্র উপায় নয়। দ্ব›েদ্বর চাইতে বৈপরীত্য সৃষ্টির প্রতিই এ ধরনের আখ্যানের ঝোঁক অধিক। খুবই সত্য কথা, ভারতীয় শিল্পনন্দনশাস্ত্রে উল্লিখিত চৌষট্টিকলা না হোক নিদেনপক্ষে ষোলোকলার পরিষ্কার জ্ঞান ব্যতিরেকে ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদ’ নামক শিল্পরীতি মাফিক সৃষ্টি সম্ভব নয়।

রচয়িতার অসংস্কৃত কথা কোনো সুধী বন্ধুকে আহত করতেই পারে- কিন্তু এও তো সত্য যে, মধ্যযুগীয় বাঙালি যেমনভাবে জীবনের প্রয়োজনে অপরিহার্য যাবতীয় পণ্য স্বয়ং উৎপাদন করেছে, তেমনি সব শিল্পের নাচঘরেও অবলীলায় প্রবেশ করেছে। একক হয়ে, এককে দিয়ে তার জীবন চলে না। চললেও মন ভরে না। তবে মানব ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা উৎকর্ষকালের বাঙালি শিল্প-প্রেয়সীর একমাত্র ভ্রƒভঙ্গিতে পরিতৃপ্ত হয় কি করে! সূত্রবদ্ধ রূপ দিতে না পারলেও বাংলার লোকায়ত শিল্পীগণই ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদী’ শিল্পরীতির উদ্ভাবক- লোকায়ত শিল্পী, সাধক, দার্শনিকদের একনিষ্ঠ ও কঠোর সাধনার প্রত্যক্ষ দৃষ্টান্ত আমাদের সম্মুখে লালন, হাছন, পাগলা কানাই, আরজ আলী মাতুব্বর এবং সদ্যপ্রয়াত বাউল সাধক আব্দুল করিম। বাঙালি মানসের সঙ্গে তাদের চৈতন্যের যে যোগ স্থাপিত হয়েছিল তাকেই রচনার ভাঁজ-ভঙ্গি-চলন ও শোভায় অনন্য করে তুলে দিয়েছেন সাধারণের রুচির পেয়ালায়। যে রসিক তাদের সৃষ্টির রসসুধা পান করেন তিনি কখনো শিল্পী নামক হিফাস্টাসের কামারশালার অগ্নির খরতাপে আপনাকে দগ্ধ করেন না। শিল্পসমুন্নতির প্রশ্নটি ‘দ্বৈতদ্বৈতবাদ’ কখনো অগ্রাহ্য করে না। তাই সমুন্নতির শিখরস্পর্শী বিশ^ শিল্পকলার গঠনরূপের বিষয়টি সজাগ চেতনায় বিদ্যমান রেখেই সেলিম তার তত্ত্বের অনুগামী রচকের জন্য কতিপয় কর্তব্য স্থির করে দেন এভাবে-

[…] [..] “ বর্ণনাত্মক রীতি কখনো বহিরঙ্গ ও অন্তরঙ্গ অর্থেও গ্রাহ্য। অখণ্ড রীতিতে কাহিনী উপস্থাপনায়, দর্শক বা পাঠককে নাট্যমূলক সংঘাত দ্বারা আকৃষ্ট করা সেখানকার শাস্ত্রানুমোদিত। প্রথমত কাহিনী কৌশল তা থেকে ভিন্ন- যেমন মহাকবি ফেরদৌসীর শাহানামা। মানবাত্মা যেখানে শিল্পের মূল অন্বিষ্ট সেখানে সাসপেন্স রচনার অবকাশ বোঝা যায়। তার মূলই বা কী? পাশ্চাত্যের নি¤œশ্রেণির চলচ্চিত্র বা বেস্ট সেলারও ওই একই পদ্ধতি অর্থাৎ এ ঘটনার পর কি হবে, তারপর? এ সব উদ্বেগ সৃষ্টির শিল্পমূল্য অকিঞ্চিৎকর। এই নাট্য কৌত‚হলকে কেন্দ্র করে ভ্রম করেছেন। তার মতে, ওদিসি রচনাকালে হোমার বৃদ্ধ হয়েছিলেন, সুতরাং নাট্য কৌত‚হল ইলিয়ড-এর তুলনায় নেই।

অন্যদিকে প্রণম্যবাদী গ্যেটে তাঁর আয়ুষ্কালের প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে ফাউস্ত রচনা করেছেন। ফিরদৌস শাহানামার সমাপ্তির পর জীবনের পরিণাম সংগ্রথিত করে যা বলেছেন, তার মর্মার্থ এই যে, আমি যখন এই কাব্য রচনা করি তখন যৌবনের গৌরব ছিল আজ রচনার সমাপ্তির পর দেখতে পাই আমার মাথায় সুপক্ক কেশ।

শাহানামা বর্ণনাত্মক রীতির অথচ তার মধ্যেই সংস্থান করা হয়েছে- ‘সোহরাব রুস্তমের’ মতো মর্মস্পর্শী কাহিনী। কাজেই দ্বৈতাদ্বৈত শিল্পতত্ত্বাশ্রয়ী রচনায়, নাট্যমূলক ঘটনাকে বর্ণনার ¯্রােতে পাল তুলতে হবে। শিল্পপ্রণোদিত করে, প্ররোচিত করা তার কাজ নয়। অভেদাত্মক দৃষ্টিভঙ্গির ফলে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বিষয় রূপের চেয়ে তিনি শিল্পের অন্তর্গত কেন্দ্রবিন্দু প্রত্যক্ষ করবেন।

কেন্দ্রবিন্দু থেকে তিনি ধীরে তার বিষয় বিস্তার ঘটাবেন। তবে সেক্ষেত্রে সংজ্ঞাভুক্ত প্রচলে গদ্য ও পদ্যের ভেদজ্ঞান ও পরিহার করা চাই।

গদ্য ও পদ্যভেদে অবলুপ্ত হলে তিনি নির্বাচিত বিষয়কে সেই অবলুপ্ত পথেই বিস্তারিত করবেন। রচনাকালে গদ্য, পদ্য, গীত, নৃত্য, সংলাপ বর্ণনা যা কিছুর প্রয়োজন তিনি তাঁর রচনায় গ্রহণ করবেন।

এর ফলে তাঁর রচনায় মাধ্যমভেদ বিলুপ্ত হবে, তাঁর কল্পনা একখাত প্রবাহী না হয়ে বহুধারায় ব্যাপ্ত হবে। বহুধারার ব্যাপ্তি তাঁর রচনাকে পরিণামে বিস্তারিত অথচ সংহত ঐক্যে পরিণতি দান করবে।

নানা মাধ্যমে কৌশল একটি রচনায় সংহত হলে তা প্রচলিত লেখ্য শিল্প শ্রেণিবিভাজনের কোনো সংজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত হবে না।” (প্রাগুক্ত, ৫৫৫)

উপরোক্ত আলোচনান্তে আশা করি এমত সিদ্ধান্ত গ্রহণ অসমীচীন নয় যে, ব্যক্তিজীবনে ব্যবহারিক আচরণে কতকটা অগোছালো থাকলেও সেলিম আল দীন তার শিল্পতত্ত্ব এবং সৃষ্টিশীল কর্মে এতটুকু অসচেতন ও অগোছালো ছিলেন না। দুটি ক্ষেত্রেই অনুসন্ধিৎসা ও ঐকান্তিক চেষ্টার সর্বাধিক ব্যয় করেছেন তিনি। পরিশেষে বলা যায়, সেলিম আল দীনের দ্বৈতাদ্বৈতবাদ অ-এরিস্টটলীয় শিল্পতত্ত্ব। একই সঙ্গে তা বি-ঔপনিবেশিক সমাজের অভিব্যক্তি এবং উত্তর-আধুনিক শিল্পতত্ত্ব। একটি ধর্মীয় দর্শনে নিহিত নির্যাস নিংড়ে তাকে নতুন সাংগঠনিক কাঠামোদানের মধ্য দিয়ে যে নির্মিতি আলোচ্য তত্ত্বে লক্ষণীয় তাকে বিনির্মাণবাদের ধারায় দেখাও সম্ভব। মূর্খের উচ্চারণে এরূপ উক্তি অবশ্যই যুক্তিপূর্ণ বিশ্লেষণ দাবি করে। অনুচ্চারিত এবং বিবিধ প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান সেলিম আল দীন গবেষকের অবশ্যই অনুসন্ধেয় বিষয়- এবং ত্রুটি যদি কিছু থাকে তা প্রদর্শনও তাদেরই দায়। আর এর প্রয়োগ নিশ্চিত করা না করা নাট্যকার, থিয়েটার কর্মীর চিন্তার স্বাধীনতার ওপর বর্তায়। ইতিহাসের সত্য এই যে, সেলিম আল দীন বাংলা নাটকের এক বিশেষ কালকে স্বয়ং নিয়ন্ত্রণ করেছেন আপন সৃষ্টির রসধারায়।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj