সেলিম আল দীনের রবীন্দ্রনাথ এবং তারপর…

শুক্রবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২০

কাজী শুসমিন আফসানা

নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের সরাসরি শিক্ষার্থী হওয়াতে যেমন প্রগাঢ় গর্ব অনুভব করি একইসাথে তুমুল বেদনাও বহন করতে হয় এই ভেবে যে, তার দেয়া শিক্ষার কিছুই কি আমি যাপিত জীবন অথবা কর্মে প্রয়োগ করি বা করতে পেরেছি!! এই লেখায় প্রকৃতপক্ষে আমার শিক্ষাগুরু সেলিম আল দীন জীবনবোধের যে দার্শনিক পাঠ শিখিয়েছেন তা স্মরণ করে বেদনা লাঘব করার প্রক্রিয়াতে নিবিষ্ট হতে চেয়েছি মাত্র।

সেলিম আল দীন আমাদের জাতিগত অস্তিত্বের সাংস্কৃতিক পরিচয় আবিষ্কারের অন্যতম অধিকর্তা। ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণ কীভাবে একটি জাতির আত্মপরিচয়কে বিলীন করে দিতে পারে এই উপমহাদেশের মানুষের সাথে সাথে পৃথিবীর আরো অনেক দেশ ও জাতি হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে এবং এখনো পাচ্ছে। ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের গভীর ও বিস্তারিত ছায়াঘন জনপদের মধ্য থেকে জাতীয় সংস্কৃতির আলোর সন্ধান ও সবার মধ্যে সে আলো ছড়িয়ে দিতে যারা চেয়েছিলেন, স্বাধীনতা পরবর্তীকালে সেসব পথিকৃতদের মধ্যে সেলিম আল দীন অন্যতম; যিনি বাংলা নাটকের আদীরূপের সন্ধান ও পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন বাঙালি জাতিসত্তার সাথে।

সেলিম আল দীন বলতেন, স্বাধীন বাংলাদেশ ও বাঙালিসত্তা তাকে বাংলা নাটকের আত্মপরিচয় অনুসন্ধানে একদিকে যেমন অন্তরাত্মার মধ্যে তাগিদ দিত, অপরদিকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাকে নিয়ত অনুপ্রাণিত করতেন বিশ্বমানবতার সাথে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মেলবন্ধন সৃষ্টিতে। তারই উদাহরণ হিসেবে দেখতে পাই সেলিম আল দীনের চাকা, হরগজ, বনপাংশুল, নিমজ্জন প্রভৃতি নাটকের বিষয় নির্বাচন, নির্ধারণ, গঠন ও বিন্যাসে। সেলিম আল দীনের রবীন্দ্র নাটক পাঠদানকালে, বিভিন্ন সভা, সেমিনার এবং আড্ডা থেকে জেনেছি প্রতিনিয়ত সৃষ্টিশীল এই শিক্ষক, নাট্যকার, লেখক সর্বোপরি শিল্পীমানসের দার্শনিক নির্মাণ ঘটেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিল্পদর্শনের সংস্পর্শে। তিনি বলতেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটকে তিনি আসলে একটা বিশেষ বার্তা দিয়ে গেছেন আর তা হলো, বন্ধন বা দ্বা›িদ্বকতা থেকে মুক্তি, আর মুক্তি মানেই তো শান্তি। গোরা উপন্যাসে গোরা চরিত্রের মাধ্যমে জাত নিয়ে যে আত্মরম্ভ এবং শ্রেণিঘৃণা প্রকাশ পেয়েছে; পৈতৃক পরিচয় উদ্ঘাটনের মধ্য দিয়ে তার উপলব্ধি বিশ্বমানবতায় লীন হয়ে গোরার চিন্তার মুক্তি ঘটেছে। আবার রক্তকরবী নাটকে যে যক্ষপুরী সেটা তো আসলে এই পৃথিবীই, যা কিনা পুঁজিবাদী রাষ্ট্র দ্বারা প্রতিনিয়ত নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। দিনে দিনে এরাই পৃথিবীটাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে নিজের অজান্তেই। এভাবে চলতে থাকলে মানুষের অস্তিত্বই হুমকির মুখে পড়বে তখন হয়তো রক্তকরবীর রাজার মতো পুঁজিবাদীরা নিজের তৈরি করা পুঁজির অট্টালিকা নিজেই ভাঙতে বেরুবে, যখন আর একেবারেই সময় থাকবে না। অথবা এক একটি শিল্পকারখানা বা এসব গার্মেন্টস এক একটি যক্ষপুরী; যেখানে মানুষের মূল্য নির্ধারণ করা হয় টাকার মূল্যমানে, জীবনের মূল্য টাকা দিয়ে কিনে ফেলা যায় খুব সহজেই। এই রক্তকরবীর যে যক্ষপুরী তার সোনার আগল ভাঙতে তাই নন্দিনীর প্রয়োজন হয়; যে কিনা প্রাণের প্রতীক, প্রেমের শক্তি নিয়ে হাজির হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘আনন্দ থেকেই এই যা কিছু সমস্ত সৃষ্টি হচ্ছে, দায়ে পড়ে কিছুই হচ্ছে না সেই স্বয়ম্ভূ সেই স্বতঃউৎসারিত প্রেমই সমস্ত সৃষ্টির মূল’। তাই পুঁজি যখন নিজেকে নিজে বেঁধে ফেলে তখন সেই বন্ধন মুক্ত করতে পারে একমাত্র প্রেম; বৈশ্বিক প্রেম, মানব প্রেম। যে প্রেম শ্রেণিহীন, সমগ্রের। আবার যখন গানের মধ্য দিয়ে বলেন রবীন্দ্রনাথ, ‘আকাশভরা সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ, তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান, বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান’ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের এত প্রাণের মধ্যে নিজেকে আবিষ্কার প্রকৃতির সাথে এক কাতারে দাঁড়িয়ে যান তিনি, যেখানে কোনো শ্রেণি নেই, ধনী-গরিব নেই- সবাই এক প্রেমের আনন্দে সৃষ্টি; তাহলে কেনো মানুষে মানুষে এত দ্ব›দ্ব!!

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন সৃষ্টির উৎস হিসেবে প্রেমকে অনুভব করেছেন, বন্ধন থেকে মুক্তির হাতিয়ার হিসেবে প্রেমকে উপলব্ধি করেছেন, তখন সেলিম আল দীন বলছেন, এই সৃষ্টিকে রক্ষার জন্যও প্রেমই একমাত্র শক্তি। চাকা নাটকে সেলিম আল দীন দেখিয়েছেন, নাম পরিচয়হীন অথবা ভুল নামের [হোসেন আলী] ভুল ঠিকানায় পৌঁছে যাওয়া লাশকে যখন সবাই অস্বীকার করছে তখন লাশ বহনকারী গাড়োয়ানের জলিধানের স্বপ্ন ভুলিয়ে দেয় মানবপ্রেম, সেই প্রেমই ঠিকানাহীন হোসেন আলীর ঠিকানা করে দেয়, সেই ঠিকানা এই মাটি, এই ধরিত্রী। এখানে সেলিম আল দীন বুঝিয়েছেন, পুঁজিবাদী রাষ্ট্র প্রেমহীন, যেখানে মানুষের লাশের ঠিকানা মেলে না কোথাও, তখন মাটি তথা প্রকৃতি তাকে স্থান দেয় বুকে মানবতার হাত ধরেই। মানবতাই শ্রেষ্ঠ প্রেম, প্রকৃতি তার ঠিকানা।

রবীন্দ্রনাথের কথা বলতে বলতে সেলিম আল দীন স্যার কখনো শেষ করতেন না অথবা সেলিম আল দীনের রবীন্দ্র-উপলব্ধির শেষ ছিল না। তার মতে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অসীমের সন্ধান পেয়েছেন, সসীম মানুষ কীভাবে তার কথা শেষ করতে পারে!! সেলিম আল দীনের আক্ষেপও ছিল তাকে [রবীন্দ্রনাথকে] নিয়ে; রবীন্দ্রানাথের মতো তিনি সৃষ্টির মধ্য দিয়ে অসীমের সন্ধান পাননি বলে। কিন্তু যার সৃষ্টি মানব জাতির আগামী দেখেছিল, মানবতার ক্ষয়িষ্ণু রূপ দেখে আতংকিত হয়ে বারবার প্রেমে ফিরতে বলেছিল, মানুষের চেতনার, বিবেকের, প্রেমের নিমজ্জন থেকে মুক্তির কথা বলেছিল; সেই শিল্পস্রষ্টা সেলিম আল দীন অসীমের সন্ধান পেয়েছিলেন বৈকি!!

শুধু তিনি জানলেন না!! এখন নিশ্চয়ই জেনে গিয়েছেন। এখন তার আক্ষেপ বোধকরি পরবর্তীকালের শিল্পস্রষ্টাদের নিয়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন সেলিম আল দীনের দার্শনিক গুরু তথাপি সেলিম আল দীন ও তার পথ ছিল স্বতন্ত্র। কিন্তু তার পরবর্তী বাংলা নাট্যশিল্পের আগামী রচনা করবে কে? এই নিয়ে নিশ্চয়ই খুব একটা অভিমান ও ভালোবাসা নিয়ে আশীর্বাদ করছেন, মঙ্গল কামনা বাংলা নাটকের, বাংলাদেশের, শান্তি কামনা করছেন সব প্রাণের আর বিশ্বের।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj