মুশাররাফ করিম, চিরনিদ্রার পর

শুক্রবার, ১৭ জানুয়ারি ২০২০

ফরিদ আহমদ দুলাল

গত ১১ জানুয়ারি অগণন অনুসারী, আত্মীয়-পরিজন ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন ষাটের অন্যতম কবি-কথাসাহিত্যিক মুশাররাফ করিম। তাঁর এ বিদায় আমাদের সাহিত্যাঙ্গনে যে শূন্যতার সৃষ্টি করবে তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। তবুও বাস্তবতাকে মেনে বলতেই হয়, বিদায় হে স্বপ্ন সারথী, চিরবিদায়। তাঁর প্রয়াণের অনেক আগে থেকেই নানা কারণে তিনি বারবার আলোচিত-সমালোচিত হয়েছেন; তাঁকে নিয়ে সমস্ত আলোচনা-সমালোচনার পরও তাঁর প্রতি একান্ত এক পক্ষপাত কাজ করে; কেন সেটা বলার জন্যই আজকের আলোচনা।

স্বাধীনতা-উত্তর ময়মনসিংহকেন্দ্রিক কাব্যান্দোলনের পুরোধাপুরুষ মুশাররাফ করিমের কাব্যজীবন শুরু ষাটের দশকের প্রথমার্ধে। এ সময় তিনি বামপন্থি ছাত্র আন্দোলনেও নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। মুশাররাফ করিমের কাব্যচর্চার ইতিবৃত্ত খুঁজতে ময়মনসিংহের কাব্যান্দোলন সম্পর্কে অবহিতি প্রয়োজন। ষাটের শেষ প্রান্তে হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অমৃত পলির নোনাস্বাদ’; যদিও গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় মোশাররফ হোসেন মঞ্জুর নামে; পরবর্তীতে সত্তরের দশকের মাঝামাঝি তিনি মুশাররাফ করিম নামে লিখতে শুরু করেন এবং প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থটিকে অস্বীকার করেন। মুশাররাফ করিমের প্রথম গ্রন্থ ‘পাথরের সাথে কথা’ প্রকাশিত হয় ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে। ১৯৮০-তে তাঁর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদ’, যে সংগঠন দীর্ঘ চৌত্রিশ বছর ধরে ময়মনসিংহে কাব্যান্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে। ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদ-পাঠচক্র ‘বীক্ষণ’ ইতোমধ্যেই তার ১৮৫০টি অধিবেশনের মাইলফলক স্পর্শ করেছে।

মুশাররাফ করিমের জন্ম ১৯৪৬-এর ৯ জানুয়ারি ময়মনসিংহে; কাব্যগ্রন্থ ছাড়াও প্রকাশিত হয়েছে তাঁর বেশ কিছু কিশোর উপন্যাস, গল্প এবং উপন্যাস। কাব্যগ্রন্থসমূহের মধ্যে, ‘পাথরের সাথে কথা’, ‘অন্য এক আদিবাসে’, ‘সে নয় সুন্দরী শীরিণ’, ‘কোথায় সেই দীর্ঘ দেবদারু’, ‘নিবেদনের গন্ধঢালা’, ‘অন্তরের ব্যাকুল ব্যাধি’, ‘কে আছে, কেউ কি আছে’, ‘বিরিশিরি গীতিকা’, ‘যদি একবর্ণও মিথ্যে বলি’, ‘বর্তমানে আছি একাকী, বান্ধবহীন’, ‘কোন গাছ নেই নিকট সন্নিধানে’, ‘সকল বাড়ি তোমার জন্যে আকুল’, ‘বিরিশিরি, তোমার লাবণ্যে’, ‘রমণীর সৌন্দর্যের থেকেও আরও দুর্নিবার’, ‘সুদূর সুন্দরে’, ‘অরণ্যের সেরেনাদ’ ‘তপতী সিরিজ’ ইত্যাদি। এ ছাড়াও প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ‘নির্বাচিত কবিতা’, ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ এবং ‘কবিতা সমগ্র’।

ময়মনসিংহের কাব্যাঙ্গনে মুশাররাফ করিম সয়ম্ভু এবং সর্বব্যাপী হলেও বাংলাদেশের কাব্যাঙ্গনে প্রায় নিঃশব্দ; যে কারণে মুশাররাফ করিম প্রথমত এবং প্রধানত কবি হলেও বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান তিনি শিশুসাহিত্যে। বেশ কিছু কিশোর উপন্যাস লিখলেও কবিতায় বিস্তৃতি তাঁর বহুদূর; বিশেষত একই বছর তাঁর সাথে যিনি কবিতার জন্য পুরস্কারপ্রাপ্ত হন তাঁর তুলনায় তো বটেই। মুশাররাফ করিম-এর কবিতায় সমাজ সচেতনতা এবং রাজনীতিমনস্কতা প্রধান উপজীব্য।

মুশাররাফ করিমের রাজনৈতিক পালা বদল তাঁর কবিতার বিষয়েও কিছু কিছু ক্ষেত্রে পালা বদল ঘটিয়েছে, দৃষ্টিভঙ্গিতে তাঁর এই পালাবদল তাঁর কবিতায় মাঝে মাঝেই খুঁজে পাওয়া যাবে। কবিতায় রাজনীতি অপরাধ নয় কিছুতে, কিন্তু রাজনীতির সাথে যখন স্বার্থচিন্তা যুক্ত হয়ে যায় তখনই ঘটে বিপর্যয়। তাঁর কবিতায় যখনই দলীয় রাজনীতি উচ্চকিত হয় তখনই তিনি হয়ে ওঠেন মাওলানার শিষ্য; হয়ে যান ‘একচক্ষু হরিণ’। ব্যক্তিগত স্তুতি কবিতার শিল্প সুষমায় বিপর্যয় ঘটায়। এসব কারণ তো বটেই, সাংগঠনিক মতদ্বৈধতার কারণেও তিনি কারো কারো কাছে সমালোচিত হয়েছেন। অন্যথায় তাঁর কবিতার বিষয়-উপস্থাপনশৈলী অসাধারণ। যেহেতু মুশাররাফ করিমকে পাশ কেটে যেতে পারি না, সেহেতু বর্তমান নিবন্ধে আমি তাঁর দলীয় রাজনীতি সংশ্লিষ্টতার কথা মনে রেখেও ব্যক্তিগত সম্পর্কের জায়গা থেকে একটি সত্য উচ্চারণ করতে চাই। কেবল আমাদের কাব্যসারথী বলে নয়, একজন কবি হিসেবে মুশাররাফ করিম আগাগোড়াই অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং স্পর্শকাতর।

মুশাররাফ করিমের কবিতায় যেমন গ্রামীণ জীবনের কাদামাখা শব্দের সফল ব্যবহার দেখি, তেমনি তাঁর কবিতায় বিষয় হয়ে উঠে আসে যে কোনো সাধারণ অনুষঙ্গ। ‘নিকারী মারে খেছ’ \ ‘হাঙ্গামা-হুজ্জুতের চেয়ে শান্তি মিছিল’ \ ‘দেখবে মুহূর্তে সব লণ্ডভণ্ড, মিসমার’ \ ‘হিজড়ের সাথে নিতম্ব দুলিয়ে করে উলুম্বুস নৃত্য’ \

লোকশব্দের এমন যুৎসই প্রয়োগ যে কোন পাঠককে চমকিত করে। ব্যক্তিজীবনে মুশাররাফ করিম স্বল্পে তুষ্ট একজন মানুষ, তাঁর এ ‘স্বল্পে তুষ্টিতা’ তাঁর কবি চরিত্রেও বিস্তৃত; কবির স্বল্পে তুষ্টিতার অনুষঙ্গটি তাঁর কবিতায়ও উঠে এসেছে বারবার। এসব সত্যের পাশাপাশি তাঁর স্বল্পে তুষ্টিতা তাঁকে বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে; ষাটের দশকে যিনি বাম ছাত্র রাজনীতির প্রতিনিধি হয়েও ১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে যখন তাঁর সতীর্থদের অনেকেই নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন, তিনিও কোনো দুর্বল মুহূর্তে ঝুঁকে যান সেদিকেই; রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার পরও আমি লক্ষ করেছি, সাহিত্য সংগঠনের কর্মকাণ্ড পরিচালনায় তিনি বিপক্ষ চিন্তাকে বাতিল করতে চেষ্টা করেননি। যখন তিনি ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ নিয়ে উচ্চকিত, একই সময়ে আমরা একই সংগঠনের কর্মী হয়েও ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অনড়; এবং আমরা সংখ্যাগুরু; কখনো তিনি বিরোধিতা করেননি আমাদের। তিনি একাই তাঁর অবস্থানের কথা উচ্চারণ করেছেন। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে কিছু সুবিধাও লাভ করেছেন মুশাররাফ করিম। তাঁর যৌবনে যে আদর্শে দীক্ষিত ছিলেন তিনি, তা-কি তাঁকে লজ্জিত করতো? হয়তো তিনি ভাবতেন পুনর্বার নিজের অবস্থান বদল করলে, বিশেষ সুবিধা তিনি পাবে না; কিন্তু যদি তাঁর দল পুনর্বার ক্ষমতায় যায়, তাহলে হয়তো কিছু সুবিধা নিশ্চয়ই পাবেন। ব্যক্তিগতভাবে তাঁর ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, শেষ জীবনে তাঁর মধ্যে অনুশোচনা ছিল; কেউ হয়তো বলতে পারেন, স্বজন হিসেবে আমি তাঁর ভুলকে খণ্ডন করতে চাইছি; কিন্তু আমি নিশ্চিত জানি অনুশোচনা ছিল; কারণ শেষ সময়ে এসে তিনি ‘ব্যাঙ্কার’ নামে মুক্তিযুদ্ধের কাহিনীনির্ভর একটা উপন্যাস লেখেন, যেটি এখনো প্রকাশিত হয়নি; তাঁর লেখা সেই উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি আমায় তিনি দিয়েছিলেন দেখার জন্য; তাঁর সেই উপন্যাস পড়ে আমার প্রতীতি জন্মেছে; কবি মুশাররাফ করিম ভেতরে ভেতরে লালন করতেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। আমার বিশ্বাস উপন্যাসটি প্রকাশিত হলে, তাঁর সম্পর্কে আমার চিন্তার সত্যতা সবার কাছেই প্রমাণিত হবে।

প্রয়াণের পর মুশাররাফ করিম সব চাওয়া-পাওয়া আর স্বার্থের ঊর্ধ্বে চলে গেছেন; তাঁর জীবনে আর রাজনৈতিক অবস্থান প্রদর্শন করে স্বার্থ উদ্ধারের সুযোগ নেই; কিন্তু জীবনের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে তিনি তাঁর লেখায় যে বিশ্বাসে কথা উচ্চারণ করে গেছেন তার প্রতি আমরা যেন আস্থা না হারাই। আর মুশাররাফ করিম মানুষ হিসেবে সজ্জন ছিলেন, সব মহলে গ্রহণীয়-আদরনীয় ছিলেন সে কথা সর্বজনস্বীকৃত। সদ্য প্রয়াত কবি মুশাররাফ করিমের একজন ঘনিষ্ঠজন হিসেবে তাঁর সম্পর্কে এ কথাটি জনসমক্ষে উচ্চারণ করাটা আমি দায় মনে করলাম। ‘বাঙ্কার’ লিখে তিনি প্রমাণ করে গেছেন, সত্যের পথে তাঁর ফেরার আকুতির কথা। তাঁর চিরনিদ্রার পর এ সত্য উচ্চারণ করে আমি কেবল নিজের দায় থেকে মুক্তি পেতে চাইলাম।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj