মনের মিটার

বুধবার, ১৫ জানুয়ারি ২০২০

আহাদ আদনান

– এই যে দেখছো ল্যাপটপ, এটাতে সফটওয়্যার ইন্সটল করা আছে। আর এই তারের মাথায় লাগানো আছে সেন্সর। এটা মাথার চারদিকে লাগিয়ে রাখব। তোমার মনের সব কথা তখন মনিটরে ভাসতে থাকবে।

– ও আচ্ছা, এটা তাহলে লাই ডিটেক্টর মেশিনের মতো। বিদেশের পুলিশরা প্রায়ই ব্যবহার করে। কোনো অপরাধী এটা লাগিয়ে মিথ্যা বললে সঙ্গে সঙ্গে লাই ডিটেকশন, মানে মিথ্যা ধরা পড়ে যায়।

– উঁহু, ঠিক তা না। এটা মনের কথা বলে দিবে। তুমি কি ভাবছো সেটা প্রকাশ করে দিবে। কি নাম যে দেই এটার?

– থট ডেভেলপার? কিংবা মাইন্ড রিডার? অথবা মনের মিটার?

– বাংলাটাই তো ভালো শোনাচ্ছে। মনের মিটার।

– এটা রেজাল্ট কীভাবে দেখাবে স্যার? কোনো গ্রাফ বা ভাইব্রেশন, নাকি অন্য কোনো উপায়?

– এটাই মজা। এটা কথা বলবে। অনেকটা রোবটের মতো করে। সব শক্তির খেলা। মনে কর, তোমার মন বলছে এক কাপ চা খাওয়া দরকার। এই ভাবনাগুলো নিউরনে যখন খেলা করে তখন মস্তিষ্ক কিছু তরল দিয়ে এগুলো ঝালিয়ে নেয়। এদের বলি নিউরোট্রান্সমিটার। মস্তিষ্কের ভাঁজে ভাঁজে, আমরা যাদের বলি সাল্কাস আর জাইরাস, নিঃশব্দে এগুলোর খেলা চলে। রাসায়নিক শক্তিকে আমি প্রথমে বিদ্যুৎ শক্তি, পরে একে শব্দ শক্তিতে পাল্টে দেব। মনিটর তখন বলবে, ‘চা চাই, চা চাই’। বুঝেছো বিজ্ঞানী।

– মজা তো। দিন স্যার আমার মাথায় সেন্সরগুলো লাগিয়ে। একটা পরীক্ষা হয়ে যাক।

– তাতো বটেই। আমার যন্ত্র মোটামুটি দাঁড়িয়ে গেছে, কিন্তু এর পরীক্ষা এখনো হয়নি। পরীক্ষা করে ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরা পড়তে পারে। তখন এগুলো সারাতে হবে। নিখুঁত ছাড়া কি আর পেটেন্টের আবেদন করা যায়? আচ্ছা, এখন তুমি এই চেয়ারে বস। মোবাইলটা বন্ধ কর। স্বাভাবিক নিশ^াস নিতে থাক। সামনে এই সাদা দেয়ালটার সামনে তাকিয়ে থাক। এই যে একটা সেন্সর লাগিয়ে দিলাম মাথার বাম দিকে, প্যারাইটাল হাড়ের ওপর, আরেকটা ডান দিকে, একটা পেছনে অক্সিপিটালের ওপর আর সামনে একটা ফ্রন্টালে, ব্যাস। এবার চোখ বন্ধ করে ফেল।

৫ মিনিট সব চুপচাপ। সফটওয়্যার চালু করা হয়েছে। মনিটরে বিভিন্ন তরঙ্গ ভাসছে। সেই তরঙ্গ শব্দে রূপ নিবে এখনই।

– এবার আমরা শুনতে পাব, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বিজ্ঞানী দিলওয়ার মনে মনে কি ভাবছে।

রোবটের মতো কণ্ঠে মনিটর থেকে শব্দ বের হচ্ছে- গাধা, তুই একটা গাধা, মস্ত বড় গাধা।

– স্টপ ইট। আমি তোমার সিনিয়র দিলওয়ার। হাও ডেয়ার ইউ টু থিঙ্ক মি অ্যান অ্যাস। আমাকে তোমার গাধা মনে হয়?

– কি বলছেন স্যার, আমি এসব কিছুই ভাবিনি। আমি আপনাকে শ্রদ্ধা করি। এসব ভাবার প্রশ্নই আসে না।

– তুমি আমাকে গাধা পেয়েছো? হ্যাঁ গাধাই তো ভাবলে। বাই দ্য ওয়ে, আমার পরীক্ষা তাহলে সফল।

– কখনোই না। আমি মোটেও এসব ভাবছিলাম না। আপনার যন্ত্র ঠিক না। এটা ব্যবহার করলে মস্ত বিপদে পড়বেন। হয়তো কোনো চোরের মাথায় লাগিয়ে তার মনের কথা জানতে চাইছেন, আর যন্ত্র বলছে- তুই একটা গাধা। কি কেলেঙ্কারি হবে ভাবতে পারছেন?

– তাই? কি ভাবছিলে তুমি?

– সত্যি বলছি, শুনে রাগ করবেন না প্লিজ। কাল রাতে বাসায় পিৎজা খেয়েছিলাম, সঙ্গে সস আর মেয়নিজ। এখন খুব এসিডিটি হচ্ছে। সস আর মেয়নিজের ডেইট এক্সপায়ার করেছে কিনা সেটাই ভাবছিলাম।

– তাহলে গাধা এলো কোথা থেকে? আমি তো ভেবেছিলাম আমার বাবার মতো তুমিও আমাকে বকাবকি করছ।

– আপনার বাবার মতো মানে?

– আমার বাবা ছিলেন স্কুল শিক্ষক। আমাদের বাড়ি ছিল গ্রামে। মাদারীপুরের কালকিনি গ্রাম। সন্ধ্যায় বিদ্যুৎ চলে গেলে আমরা পড়তাম হারিকেন জ্বেলে। আমার প্রিয় একটা কাজ ছিল খাতার কাগজ ছোট ছোট করে ছিঁড়ে পানিতে ভিজিয়ে সেটা হারিকেনের কাচের ওপর শুকাতে দেয়া। সেই ভেজা কাগজ শুকিয়ে গেলে কড়কড় করত। এটা করতে গিয়ে প্রায়ই ধরা পড়তাম বাবার হাতে। বেত হাতে গর্জন করতেন বাবা- ‘গাধা, তুই একটা গাধা, মস্ত বড় গাধা।’ আজ কয়েকদিন ধরেই খুব বাবার কথা মনে পড়ছে। তুমি তো জানোই, বলার মতো কোনো বড় আবিষ্কার বা অর্জন আমার নেই। এই যন্ত্রটা পেটেন্ট পেয়ে গেলে কত বড় স্বীকৃতি পাব ভাবতে পারো! তারচেয়ে বড় কথা দেশের কত উপকারে আসতে পারে এই মনের মিটার। প্রমাণের অভাব, মিথ্যা সাক্ষী এসব থাকবে না তখন। দেশের বিচারব্যবস্থাই পাল্টে যাবে। মানুষ পাবে সুবিচার। আজ যদি বাবা থাকতেন…।

– স্যার, আপনার চোখে জল। আমি কোনো বিজ্ঞানীকে কোনোদিন কাঁদতে দেখিনি। আমাদের বাঙালিদের এই আবেগটাই একটা সমস্যা। কিংবা শক্তি…।

– দিলওয়ার, তুমি খেয়াল করেছো ব্যাপারটা? আমার মন কয়েকদিন ধরে ভাবছে বাবার কথা। বাবার বকুনির কথা। বাবার মুখে কতদিন ‘গাধা’ ডাকটা শুনিনি। এই যন্ত্র কি কোনোভাবে আমার মনের কথা বলছে?

– তার মানে যন্ত্র আমার না, আপনার মনের কথা বলছে। কিন্তু কীভাবে?

– এই তার, সেন্সর কোনো কাজ করছে না। খুলে ফেল এসব। আবার যন্ত্রটা চালু করছি আমি।

সেন্সরগুলো খোলা হয়ে গেছে। মনিটরে ভাসছে তবু চলমান তরঙ্গ। মনিটর আবার বলছে- গাধা, তুই একটা গাধা, মস্ত বড় গাধা।

– ইউরেকা, দিলওয়ার ইউরেকা। সফটওয়্যারে এখনো আমার তথ্যগুলো সেইভ করা আছে। আর আমার মনে হয় আমার হাতে রাখা এই ডিভাইসের মাধ্যমে যন্ত্র ব্লুæটুথ দিয়ে আমার ব্রেইনের সঙ্গে কানেক্ট করছে। আমি এক্ষুনি পারটিকুলারস পাল্টে তোমার নামে করছি। এই ডিভাইসটা তোমার হাতে রাখ। এবার দেখি যন্ত্র তোমার মনের কথা ধরতে পারে কিনা। দিলওয়ার, বি রেডি।

আবার নিস্তব্ধতা। মনিটরে তরঙ্গের চলাচল। আবার সেই রোবটিক কণ্ঠ- জিনিয়াস, আপনি একটা জিনিয়াস, মস্ত বড় জিনিয়াস।

ইষ্টিকুটুম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj