গণপরিবহনে নারীর নিরাপদ যাতায়াত : আসছে নতুন উদ্যোগ

সোমবার, ১৩ জানুয়ারি ২০২০

সেবিকা দেবনাথ

গণপরিবহনে নারীর বিড়ম্বনার চিত্র নিত্য দিনের। বলা যায়, প্রতিদিন স্কুল, কলেজ, কর্মস্থল কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনে যেসব নারী গণপরিবহনে যাতায়াত করেন তাদের মধ্যে এমন কোনো নারী পাওয়া যাবে না যিনি হেনস্থার শিকার হননি। গবেষণা প্রতিবেদনও বলছে সে কথা। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের এক গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে গণপরিবহনে ৯৪ শতাংশ নারী কোনো না কোনো সময় মৌখিক, শারীরিক এবং অন্যান্যভাবে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

নারীদের এই হেনস্থার বিষয়টি বিবেচনা করে ২০০৮ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে গণপরিবহনে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ৩০ শতাংশ আসন সংরক্ষণের বিধান করা হয়। পরে সিদ্ধান্ত হয়, বড় বাসে ৯টি, মিনিবাসে ছয়টি এবং বিআরটিসি বাসে ১৪টি আসন নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষণ করা হবে। ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৭’-এর খসড়ায়ও বলা হয়েছিল, ‘গণপরিবহনে নারী, শিশু, বয়োজ্যেষ্ঠ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত আসনে তাদের বসতে না দিয়ে অন্য কেউ ওই আসনে বসলে তিনি এক মাসের কারাদণ্ড বা পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’ কিন্তু এসব উদ্যোগের পরও নারীর হেনস্থা কোন অংশে কমেনি। বরং আরো বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ছে। গণপরিবহনে ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন নারীরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. তানিয়া হক মনে করেন, এভাবে হয়রানির শিকার হতে থাকলে তা নারীর ক্ষমতায়নে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বিশিষ্টজনেরা বলছেন, আইনের প্রয়োগ না হওয়া, বাসে অতিরিক্ত ভিড় এবং যানবাহনে পর্যাপ্ত আলো ও সিসি ক্যামেরা না থাকার মতো কারণে হয়রানি ঘটে চলছে। এ সমস্যা সমাধান প্রসঙ্গে তারা বলছেন, গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রয়োজন পর্যাপ্ত পরিবহন ব্যবস্থা, পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা।

এরই প্রেক্ষিতে গণপরিবহনে নারীর যাতায়াত নিরাপদ করতে নতুন এক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার। এই কর্মসূচির আওতায় গণপরিবহনে বসানো হচ্ছে সিসি টিভি ক্যামেরা। এবং বিশেষায়িত রাউটার স্থাপন করে তা মনিটরিং করা হবে। পাইলট আকারে দুই বছর মেয়াদি এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং দিপ্ত ফাউন্ডেশন। সম্প্রতি মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা ‘গণপরিবহনে নারীর নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন’ শীর্ষক এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।

কর্মসূচি প্রসঙ্গে দিপ্ত ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক জাকিয়া হাসান জানান, দেশের সার্বিক উন্নয়ন কর্মকান্ডে পুরুষের পাশাপাশি নারীর অংশগ্রহনের গুরুত্ব জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃত। এর প্রেক্ষিতে আমাদের বর্তমান কর্মসূচী নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে অত্যন্ত জরুরী। এই লক্ষ্যে ‘গণপরিবহনে নারী নিরাপদ যাতায়াত ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন’ সময়োপযোগী একটি কর্মসূচী। এই কর্মসূচীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কর্মকান্ড হচ্ছে গণপরিবহনে সি সি টিভি ক্যামেরা স্থাপন । উদ্ভাবনী কর্মসূচীর বৈশিষ্ট হল, এটি একটি বিশেষায়িত মনিটরিং ব্যবস্থার সূচনা করবে। যার মাধ্যমে মনিটরিং এবং তদারকির কার্যক্রম,কর্মসূচীর প্রধান কার্যালয়ের সাথে সার্বক্ষণিক সমন্বয় এর মাধ্যমে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা গ্রহন করা। পরবর্তিতে পর্যায় ক্রমে মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের সংযোগ করে মনিটরিং এবং তদারকি আরো সুদৃঢ় করা হবে।

তিনি বলেন, বিশেষায়িত অ্যাপসটি আলপিন অ্যাপস বলে আখ্যায়িত হবে। তথ্য আদান প্রদান, মোটরযানের মধ্যে যে কোন ধরনের নির্যাতনমূলক ঘটনা চলাকালিন ছবি তোলা, ভিডিও করা, তাৎক্ষণিক অ্যাপস আলপিনের’ মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট হেল্প লাইনে পাঠিয়ে দেয়া যাবে। এছাড়াও অ্যাপসটি লোকেশন নির্দিষ্টকরণ এবং সচিত্র তথ্য প্রদান করবে। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে সম্প্রতি যেসকল হেল্পলাইনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে, এদের মধ্যে স্ব^রাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের ৯৯৯, তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগের ৩৩৩ এবং নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের ১০৯ গুরুত্ববহ। এর সাথে প্রস্তাবিত কর্মসূচীর আলপিন এ্যাপসটির সংযোজন করা হবে। এটি দ্রুততার সাথে তথ্য সরবরাহে সক্ষম হবে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। চলতি বছর ৫০টি ও পরবর্তীকালে ১৫০টি গণপরিবহনে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। কেন্দ্রীয় সার্ভারের সঙ্গে সংযুক্ত করে মনিটর করা হবে। একইসঙ্গে অ্যাপসের সঙ্গেও যুক্ত থাকবে। কর্মসূচিটি ঢাকা মেট্রোপলিটনের চারটি এলাকায় বাস্তবায়িত হবে।

কর্মসূচি উদ্বোধন অনুষ্ঠানে মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা বলেন, সরকার নারীর ক্ষমতায়ন, বাংলাদেশে নারীর ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু কর্মস্থলে যাতায়াতের পথে নারীরা বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এটা এখনই বন্ধ করতে হবে। পর্যায়ক্রমে সব গণপরিবহনে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। গণপরিবহনে নারীর নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে প্রতিটি রুটে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা দরকার। ভ্রাম্যমাণ আদালতের ফোন নম্বর ও যোগাযোগের ঠিকানা গণপরিবহনের এমন জায়গায় লেখা থাকতে হবে যাতে তা স্পষ্ট দেখা যায়।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj