নারীর ক্যান্সার যেতে হবে বহুদূর : ডা. মো. হাবিবুল্লাহ তালুকদার

সোমবার, ১৩ জানুয়ারি ২০২০

এক.

কিছুদিন ধরে আবার ব্লিডিং হচ্ছে তার। এসব চুকেবুকে গেছে বেশ কয়েক বছর আগেই। আবার এমন হচ্ছে কেন? কাউকে বলতে পারছেন না। স্বামীর কথা বারবার মনে হচ্ছে তার। ছেলেদের সঙ্গে তো এ কথা কোনোভাবেই বলা সম্ভব না। বউমাদের সঙ্গেও এ নিয়ে কথা বলতে লজ্জা পাচ্ছেন। আবার বিষয়টা গোপন করা ঠিক হবে না, এটা বুঝতে পারছেন। তিনি লেখাপড়া কিছুদূর করেছিলেন। অল্প বয়সে হঠাৎ বিয়ে হয়ে যাওয়ায় তেমন এগুতে পারেননি যদিও। এর মধ্যে টিভিতে একদিন এক ডাক্তার বলছিলেন জরায়ুমুখের ক্যান্সারের কথা। কথাগুলো দাগ কেটে আছে মনে। সংকোচের বিহŸলতা কাটাতে হবে। জননীর কাছে আছে সবার জন্ম ঋণ। জরায়ুমুখের ক্যান্সার সচেতনতায় অংশ নিন। একটা পদযাত্রা নাকি হবে। জননীর জন্য পদযাত্রা। অল্প লেখাপড়া জানা বাষট্টি বছরের নুরজাহান বেগম (ছদ্মনাম) সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। ‘সংকোচের বিহŸলতা নিজেরে অপমান। সংকটের কল্পনাতে হয়ো না ¤্রয়িমাণ। মুক্ত করো ভয়। আপনা মাঝে শক্তি ধরো, নিজেরে করো জয়।’ এই বিহŸলতা কাটাতে হবে। ছেলেমেয়ে ও বৌমাদের ডেকে পাঠালেন। সবাইকে বলবেন সমস্যার কথা। চিকিৎসা নেবেন। বাকি আল্লাহর ইচ্ছা। রেজাল্ট যাই হোক, আরেকটা কাজ করবেন তিনি। জননীর জন্য পদযাত্রায় যোগ দেবেন। নিজের পাশাপাশি অন্যদের সচেতন করবেন।

দুই.

সারাদিনের ক্লান্তি শেষে গোসল করতে গিয়ে হঠাৎ করেই টের পেল শারমিন (ছদ্মনাম)। এমনিতে বাসায় ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। বাসায় ফিরে গোসলে একটু বেশি সময় নেয় সে। মন ভালো থাকলে গুনগুন করে গাইতে থাকে প্রিয় কোনো গানের কলি। আজ গান থেমে গেল, হাতে ছোট একটা চাকার মতো কিছু অনুভব করায়। বাম স্তনের উপরের দিকে। একটা মার্বেলের মতো আকার। ভালো করে ডান হাতের তিন আঙুল দিয়ে বাম স্তনের পুরোটা পরখ করল। সঙ্গে বগলতলা। এবার বাম হাতের মাঝের তিন আঙুলে ভালো করে দেখল ডান স্তন আর বগলতলা। না আর কোথাও কিছু টের পেল না। নিজের ওপর রাগ হলো তার। কিছুদিন আগেই পত্রিকায় একটা লেখায় পড়েছিল স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিং সম্পর্কে। প্রতি মাসে একবার নিজের স্তন নিজে পরীক্ষার নিয়ম দেয়া ছিল। শিক্ষিতা কর্মজীবী নারী হয়ে অবহেলা করা একেবারেই ঠিক হয়নি। যা হওয়ার হয়েছে আর গাফিলতি নয়। শিহাব বাসায় ফিরলে ওর সঙ্গে পরামর্শ করে কালই যেতে হবে ডাক্তারের কাছে।

নুরজাহান বেগম আর শারমিনের গল্পটাই শেষ নয়। বিপরীত চিত্রটাও বিরল নয়। শিক্ষিতা, বিশেষ করে শহরে যারা থাকেন, তথ্যপ্রবাহ যাদের নাগালে, তাদের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। কিছু ক্ষেত্রে অতিসচেতনতাও আছে। কমবয়সী মেয়েরা অনেকেই আসছেন। স্তনে চাকা ভাব, ব্যথা। কথা বলে বুঝতে পারি, পিরিয়ডের সঙ্গে এই উপসর্গের সম্পর্ক। এগুলো হয় মূলত সিস্ট বা থলির মতো কিছু সমস্যার জন্য। বিয়ে ও বাচ্চা হওয়ার সময় এমনিতেই চলে যায়। থাকলেও সমস্যা নেই, হাল্কা ব্যথা ছাড়া। কারো কারো ব্যথা বেশি হতে পারে, তখন চিকিৎসকের পরামর্শ দরকার। অসচেতনতার চেয়ে অতিসচেতনতা ভালো। অসচেতনতা আর অবহেলার কারণে। বহু নারী ক্যান্সারের অগ্রসর পর্যায়ে চলে যাচ্ছেন, যখন আর চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠার সুযোগ থাকে না। বিস্তীর্ণ বাংলার চিত্র এরকমই। অসুখ-বিসুখের বেলায় নারীর অবহেলা দুদিক থেকেই। পরিবারের পুরুষ সদস্যরা নিজের সমস্যায় হাসপাতাল বা ডাক্তারের কাছে ছুটে যাচ্ছেন। কিন্তু পরিবারের নারী সদস্যদের বেলায় নানা ব্যস্ততায় দেরি করে ফেলেন। এর চেয়েও বড় সমস্যা নারীর নিজের অবহেলা। চিরায়ত বাঙালি নারীর আদর্শরূপ তাকে দেরি করিয়ে দেয়। স্বামী-সন্তানের যতœ-আত্তি, সংসারের নানা ঝক্কি সামাল দিতে কখন যে দেরি হয়ে যায়! লজ্জা আর সংকোচের বিহŸলতা নারীর সবচেয়ে বড় বাধা তার স্বাস্থ্য সুরক্ষায়।

স্তনে চাকার অস্তিত্ব টের পেলেন কিংবা মাসিকের রাস্তায় অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণ। চেপে রাখলেন। স্তনের টিউমার বড় হতে থাকলো, এক সময় ঘা হয়ে গেল, দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করল। তারপর জানল পরিবার। এ অবস্থা থেকে বের করে আনতে হবে নারীকে। এগিয়ে আসতে হবে নারীকে যেমন, পরিবারের পুরুষ সদস্যদেরও তার জন্য সাহস জোগাতে হবে। বেশ খানিকটা এগিয়েছি আমরা। যেতে হবে আরো অনেক দূরে। সবাই মিলে।

প্রতি বছর জানুয়ারি মাসের দ্বিতীয় শনিবার বাংলাদেশে পালিত হয় ‘জরায়ুমুখের ক্যান্সার সচেতনতা দিবস’। জানুয়ারি মাস জুড়ে আয়োজন করা হয় ‘জননীর জন্য পদযাত্রা’। নাম আর ¯েøাগানের কারণে ইতোমধ্যে বেশ জনপ্রিয় এই পদযাত্রা। জননীর জরায়ুতে আমাদের জন্ম, তিল তিল করে বেড়ে ওঠা। সেই জরায়ুর সুস্থতার জন্য এই পদযাত্রা। ১৮ জানুয়ারি শনিবার ঢাকাতে এই পদযাত্রা হবে শাহবাগ থেকে মিরপুর। আপনি আসছেন তো?

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj