চলনবিলে নারী শ্রমিকের হাট : মো. মাজেম আলী

সোমবার, ১৩ জানুয়ারি ২০২০

আকাশে তখনো সূর্যের দেখা নেই। শীত আর ঘন কুয়াশাকে উপেক্ষা করে দূরদূরান্ত থেকে হাজারো নারী শ্রমিকের পাশাপাশি পুরুষ শ্রমিকও আসছে প্রতিদিন ট্রাক, বাস, নছিমন, করিমনে চড়ে। হাট তো নয় যেন শ্রমিকের মেলা। কাস্তে, কোদাল, বিভিন্ন প্রকার নিড়ানিসহ যন্ত্র কৃষিকাজের প্রয়োজনীয় উপকরণ হাতে নিয়ে বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষ আসছেন এই শ্রমিকের হাটে। তবে কোনো কেনাকাটা নয়, এসেছেন শ্রম বিক্রি করতে।

পুরুষের পাশাপাশি দিন বদলের সঙ্গে পাল্লা দিয়েই বাড়ছে নারী শ্রমিকের সংখ্যা। জীবনে হার না মানা এসব নারী শ্রমিকরা পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ, হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করছেন দিন রাত । বাসাবাড়ি, মাঠঘাট, এমনকি ফসলের জমিতেও।

এসব শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নাটোরের গুরুদাসপুরের নয়াবাজার, হাজীরহাট, ভিটাবাজার এবং বড়াইগ্রাম উপজেলার মানিকপুর, রওশনপুর, রাজ্জাক মোড় ও থানার মোড়সহ বিভিন্ন জায়গায় বসছে এই শ্রমিকের হাট। শ্রমিকরা শ্রম বিক্রি করতে হাটে হাজির হন ভোর ৫টা থেকে। ধানকাটা, চারা রোপণ, তরমুজ, বাঙ্গি, রসুন লাগানোসহ নানান কাজ করেন তারা।

শ্রমিকের এই হাটে শ্রম বিক্রি করতে আসা নবনিতা ওঁরাও জানান, সিরাজগঞ্জের মেরিগাছা গ্রাম থেকে ১০ টাকা ভাড়ায় ট্রাকে চলে এসেছেন গুরুদাসপুরে ‘শ্রম বাজারে’ শ্রম বিক্রি করতে। শ্রম বিক্রি করেছেন ঠিকই, কিন্তু পাননি ন্যায্য মজুরি। ধারাবাহিক মজুরি বৈষম্যের এ গল্প নবনিতার একার নয়। হাটে আসা হাজারো নারী শ্রমিকের গল্প যেন একই।

সিংড়ার বড়িয়া থেকে আসা চন্দ্রিমা রানী জানান, তাদের এলাকা অপেক্ষাকৃত নিচু। সেখানে ইরি-বোরো আবাদ ছাড়া চলতি মৌসুমে কোনো কাজ নেই। তাই গুরুদাসপুরে কাজ করতে এসেছেন। এই দলের সঙ্গে আসা কলেজ ছাত্রী মায়া টক্কি জানান, তারা নিজের খেয়ে মজুরি পান ২০০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা। অথচ একই কাজে পুরুষ শ্রমিকরা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা মজুরি পান। অভাবের তাড়নায় মজুরি বৈষম্য মেনে নিয়েই প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকার লড়াই করছেন তারা।

খোঁজ জানা যায়, কঠোর পরিশ্রমী আর অপেক্ষাকৃত কম দামে শ্রমিক পাওয়ায় এ অঞ্চলে নারী শ্রমিকদের চাহিদা অনেক বেশি। কম মজুরিতে কৃষি শ্রম বিক্রি করেই তাদের সংসার পরিচালনা করতে হয়। চলনবিলের বিভিন্ন মাঠে ময়দানে কাজ করতে আসা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারী শ্রমিক শ্যামলী রানী ও কুমারী আল্পনা রানী জানায়, সকাল ৮ থেকে ৪টা পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন শ্রম দিয়ে তারাও মজুরি পান ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। তাতে কোনো রকমে চলে যাচ্ছে তাদের সংসার।

সরেজমিন দেখা যায়, গুরুদাসপুর-বড়াইগ্রাম ছাড়াও তাড়াশ, সলঙ্গা, উল্লাপাড়া, বগুড়া শেরপুর উপজেলা এলাকার নারী শ্রমিকরা দল বেঁধে এখানে জমায়েত হয়। কৃষক তাদের চাহিদামতো শ্রমিক দরদাম মিটিয়ে সরাসরি ভ্যান যোগে নিয়ে যাচ্ছেন মাঠে।

আব্দুল মতিনসহ পাঁচজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধান কাটা, বিনা হালে রসুন রোপণ, সেখানে নাড়া (ধানের খড়) বিছানোসহ জমি তৈরির কাজ করানো হয় এসব শ্রমিকদের দিয়ে। এ ছাড়া স্থানীয় শ্রমিকদের তুলনায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নারী শ্রমিকদের কম মজুরিতে পাওয়া যায় বলে এদের কদর বেশি।

নাটোর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সুব্রত কুমার সরকার বলেন, চলনবিলে বসবাসরত আদিবাসীদের ঘরে ঘরে অভাব চলছে। নিরুপায় হয়ে তারা কম মজুরিতে শ্রম বিক্রি করছেন। অনেকে গ্রাম্য মহাজনদের কাছ থেকে অগ্রিম উচ্চ সুদে টাকা নিয়ে সংসার চালান যার ফলে কম মূল্যে শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হন তারা।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj